বিনোদনসিনেমা ও টেলিভিশনহোমপেজ স্লাইড ছবি

আকিরা কুরোসাওয়ার অজানা অধ্যায়

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী: আমেরিকান নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গ বলেছেন, “কুরোসাওয়া হচ্ছেন আমাদের সময়ের চলচ্চিত্রের শেক্‌সপিয়ার”। কুরোসাওয়ার মাত্র একটি ছবি দেখেছিলেন ইতালীয় নির্মাতা ফেদেরিকো ফেলিনি। ‘সেভেন সামুরাই’ দেখে তিনি বলেছিলেন, “একজন চলচ্চিত্রস্রষ্টা কেমন হওয়া উচিত, কুরোসাওয়া তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত।”
আরেক ইতালীয় নির্মাতা বার্নার্দো বার্তুলিসি বলেছিলেন, “কুরোসাওয়ার ছবি ও ফেলিনির ‘লা ডলসে ভিটা’ আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে অনুপ্রেরনা দান করেছে”। ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’ চলচ্চিত্রখ্যাত মার্কিন নির্মাতা সিডনি লুমেট একধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, “চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে কুরোসাওয়া কখনোই আমাকে অনুপ্রাণিত করেন নি, কেননা আমি তাঁর মতো বোধ ও দর্শন ধারণ করার যোগ্যতা কখনোই রাখি নি।” কিংবদন্তি নির্মাতা সুইডেনের ইঙ্গমার বার্গম্যান নিজের ছবি ‘দ্য ভার্জিন স্প্রিং’ নিয়ে বলেছিলেন, “আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার সিনেমাটি কুরোসাওয়ার চলচ্চিত্রের একটি অন্ধ অনুকরণ।”

আমেরিকান নির্মাতা মার্টিন স্করসেস বলেছেন, “সারা দুনিয়ার চিত্রনির্মাতাদের ওপর তাঁর (কুরোসাওয়ার) প্রভাব এতই গভীর যে তাঁর সঙ্গে আর কারও তুলনা চলে না।” আমেরিকান নির্মাতা ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা বলেছেন, “একটি ব্যাপার কুরোসাওয়াকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। তিনি একটি বা দুটি মাস্টারপিস বানাননি। তিনি বানিয়েছেন আটটি মাস্টারপিস”। বিংশ শতাব্দীর সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে একজন তিনি। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ১৯৪৩ সালের সানশিরো সুগাতা এবং শেষ চলচ্চিত্র ছিল ১৯৯৩ সালের মাদাদাইয়ো। তার দুটি চলচ্চিত্র সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কার লাভ করে। তিনি একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার, লেজিওঁ দনর সহ বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

আকিরা কুরোসাওয়া ১৯১০ সালের ২৩শে মার্চ জাপানের রাজধানী টোকিওর শিনাগাওয়া উপশহর অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৬ সালে কুরোসাওয়া জাপানের একটি মূলধারার চলচ্চিত্র স্টুডিওতে পরিচালনার জন্য আয়োজিত একটি শিক্ষানবিশ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। পিসিএল নামের এই স্টুডিওটি পরবর্তীতে তোহো নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।পরিচালক কাজিরো ইয়ামামোতো তাকে সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় আকিরা তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যার নাম ছিল সানশিরো সুগাতা। এর পর তার করা সব ছবিই যুদ্ধকালীন জাপানি সরকার খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত। এ কারণে এ সময়ের ছবিগুলোতে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা উঠে এসেছে। যেমন তার ‘দ্য মোস্ট বিউটিফুল’ নামের ছবিটি সামরিক অপটিক্সের কারখানায় কাজ করে এমন এক নারীর জীবন নিয়ে করা। ‘জুডো সাগা ২’ ছবিতে জাপানি জুডোকে পশ্চিমা তথা মার্কিন বক্সিং থেকে উত্তম হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

যুদ্ধের পর তার করা প্রথম ছবিতে এ ধরনের কোনও প্রভাব ছিল না, বরং এতে পূর্বতন জাপান রাজতন্ত্রকে কটাক্ষ করা হয়েছে। No Regrets for Our Youth নামের এই সিনেমাটি বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত এক ব্যক্তির স্ত্রীকে নিয়ে করা। এই বামপন্থী রাজনীতিবিদ পুলিশের হাতে আটক হওয়া থেকেই কাহিনীর শুরু। সমসাময়িক জাপান নিয়ে কুরোসাওয়া আরও কিছু ছবি করেছেন যার মধ্যে আছে ‘স্ট্রে ডগ’। কিন্তু তার পিরিয়ড চলচ্চিত্র ‘রাশোমোন’ তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এই ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার অর্জন করে এবং পরবর্তীতে একাডেমি পুরস্কার ও লাভ করে। ১৯৫০-এর দশকের মধ্যে কুরোসাওয়া এমন কিছু কৌশল রপ্ত করেছিলেন যা তার চলচ্চিত্রগুলোকে অনন্য করে তুলতো। ছবির শুটিংয়ের সময় তিনি ‘টেলিফটো লেন্স’ ব্যবহার করতেন কারণ তার বিশ্বাস ছিল অভিনেতার কাছ থেকে ক্যামেরা দূরে রাখলে অভিনয় ভাল হয়। এছাড়া তিনি একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন। একাধিক ক্যামেরা ব্যবহারের জন্যই অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বিভিন্ন কোণ থেকে দেখানো সম্ভব হতো। কুরোসাওয়ার ছবির আরেকটি বড় ট্রেডমার্ক হল ভাব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য আবহাওয়ার সাহায্য নেয়া।

একনায়কসুলভ পরিচালনার জন্য আকিরা চলচ্চিত্র মহলে ‘টেনো’ বা ‘সম্রাট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কাঙ্ক্ষিত ভিজুয়াল ইফেক্ট তৈরির জন্য তিনি বিপুল সময় ও শ্রম ব্যয় করতেন। এক্ষেত্রে তাকে পারফেকশনিস্ট বলা চলে। রশোমনের শুরুর দৃশ্যে ভারী বৃষ্টিপাতকে ফুটিয়ে তোলার জন্য শুটিং এলাকার স্থানীয় পানির পুরো সাপ্লাই শেষ করে ফেলেছিলেন। আর এই পানির সাথে ক্যালিগ্রাফির কালি মিশিয়ে কালো রঙের সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ কালো রঙে বৃষ্টির গাঢ়তা বোঝা যায়। রান ছবির একটি দৃশ্যে বিশাল দুর্গ প্রাসাদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। এজন্য মাউন্ট ফুজির উপরে একটি আলাদা দুর্গ সেট তৈরি করিয়েছিলেন তিনি। এই দুর্গটি তৈরিই করা হয়েছিল পুড়িয়ে দেবার জন্য। তার পরিচালনার আরও কিছু কাহিনী আছে। যেমন, সামনের অতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এই ভিজুয়াল ইফেক্ট আনার জন্য তিনি উল্টো দিক থেকে ঝোড়ো হাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ছবির একটি দৃশ্যে ট্রেন থেকে বাড়ির শট নেয়া হচ্ছিল। আকিরা মনে করেছিলেন সেই বাড়ির ছাদ থাকার কারণে শটটা দেখতে ভালো লাগছে না। এজন্য তিনি বাড়ির পুরো ছাদ সরিয়ে ফেলেছিলেন। পরে বাড়ির ছাদ অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।

পোশাক সজ্জার ব্যাপারেও তার পারফেকশনিস্ট চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছিল। তিনি মনে করতেন অভিনেতাকে সিনেমার শটের জন্য সম্পূর্ণ নতুন পোশাক দিলে বিষয়টা বাস্তবসম্মত হয় না। এজন্য অনেক সময় তিনি অভিনেতাদেরকে শুটিংয়ের এক সপ্তাহ আগে পোশাক দিয়ে দিতেন। অভিনেতাদের প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই পোশাক পরতে হত এবং পোশাকের সাথে নিজের বন্ধন বাড়িয়ে তুলতে হত। বিশেষ সেভেন সামুরাই ছবিতে এটার দরকার পড়েছিল। কারণ এ ছবির লোকজন অধিকাংশই ছিল গরিব কৃষক। এ কারণে অভিনেতাদেরকে বারবার বলে দেয়া হয়েছিল, তারা যেন কাপড় এমনভাবে পরে যে শুটিঙের সময় বোঝাই যায় সেটার অবস্থা ভালো না।
পরিপূর্ণ সঙ্গীত চলচ্চিত্রের সাথে যায় না বলে বিশ্বাস করতেন তিনি।

এ কারণে চলচ্চিত্রের জন্য গান ও সুর নির্বাচনের বেলায় তিনি সেটাকে একটি মাত্র বাদ্যযন্ত্রে নামিয়ে আনতেন। অর্থাৎ একটি সুরের জন্য কেবল একটি সুরই ব্যবহার করতেন। চলচ্চিত্রের শেষের দিকে পরিপূর্ণ সঙ্গীতের ব্যবহার বাড়িয়ে দিতেন তিনি।কুরোসাওয়া বলতেন, সভ্যতা মানবতাকে বিষিয়ে তুলেছে। নির্মাতার মানবিক চরিত্র হচ্ছে একটা ভালো চলচ্চিত্রের মেরুদণ্ড। আমরা যদি নিজেদের কাছেই সৎ না থাকতে পারি তাহলে কখনোই একটা ভালো চলচ্চিত্র বানাতে পারবো না। তার মানে এই নয়, একটা দেশ যদি ভালো হয় তাহলে সেখানকার নির্মাতারা অনিবার্যভাবেই ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। যে ব্যক্তি ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সক্ষম সে জানে দর্শকের মনের মধ্য থেকে কীভাবে তার উপায় খুঁজে বের করতে হয়। ১৯৯৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পৃথিবীতে রেখে গিয়েছেন এমন অনেকগুলো মনোমুগ্ধকর মাস্টারপিস চলচ্চিত্র যা তাকে বিংশ শতাব্দীর সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন করে তুলেছে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker