বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

আমার অর্থহীন স্করসেজি প্রেম

সাজ্জাদ বিন জাহিদ: আমেরিকায় তখন ষাটের দশক। হলিউড মারাত্মক ভাবে ব্যবসায় লোকসান খেয়েছে। ফরাসি নিউ ওয়েভ, স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন, ইতালিয়ান কমেডি আর জাপানিজ সিনেমা দখল করে নিচ্ছে তাদের বাজার। আমেরিকার বাঘা বাঘা সব স্টুডিও বুঝতে পারে যে তাদের স্টুডিও বা প্রযোজক কেন্দ্রিক সিনেমার দিন শেষ হয়ে আসছে। আর এ সময়ই পটভূমিতে আসেন কিছু তরুণ পরিচালক। যাদের চোখে তখন বিশ্ব সিনেমার রং লেগে আছে, যারা বলতে চায় বাস্তব গল্প।

যারা চায় হলিউডের দীর্ঘদিনের চলে আসা সব প্রথা ভেঙে ফেলে নানা রকমের নীরিক্ষাধর্মী গল্প সেলুলয়েডের পাতায় তুলে ধরতে। ব্যস, শুরু হয়ে যায় চলচ্চিত্র ইতিহাসেরই এক অন্যতম সেরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার নাম New Hollywood বা American New Wave. আর এই আন্দোলনের সেনাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন Steven Spielberg, George Lucas, Brian De Palma, Robert Altman, James Cameron, Francis Ford Coppola, Stanley Kubrick, David Lynch এবং পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতা আর বিশাল দুই ভ্রু সম্বলিত ইতালিয়ান আমেরিকান পরিবারে জন্ম নেওয়া Martin Charles Scorsese.

নিউ হলিউডের যাদের নাম উল্লেখ করলাম সবাই সফলতার সাথে নিজেদের লিগ্যাসি তৈরি করে গেছেন। উপহার দিয়েছেন চলচ্চিত্র ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা কিছু সিনেমা। কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ বিদায় নিয়েছেন সিনেমার জগৎ থেকে, অনেকে এখনো সিনেমা বানিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মার্টিন স্করসেজির বিশেষত্ব হলো যে দুর্দান্ত প্রতাপ নিয়ে তিনি সিনেমার জগতে এসেছিলেন, সেটা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং এখনো তিনি একের পর এক মাস্টারপিস উপহার দিয়ে যাচ্ছেন।

আর সেই স্করসেজির প্রেমে কীভাবে পড়লাম সেজন্যই এই লেখা। সঠিক দিনতারিখ মনে নেই। কিন্তু তখন আমার কেবল সিনেমা দেখার শখটা জন্ম নিচ্ছে। আর সবার মত আমিও শুরু করেছিলাম হলিউড আর বলিউডের মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা দেখে। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু সিনেমা হাতে আসলো যেগুলো দেখে একটু অবাক হলাম। মনে হলো যে এগুলো কোনো এক কারণে মূলধারা থেকে আলাদা। আগ্রহ জাগলো সেসব সিনেমার প্রতি। আর ঠিক তখনই দেখলাম Taxi Driver. পুরো থ হয়ে গেলাম! এরকম সিনেমাও হয়? তার উপর জানলাম সত্যজিৎ রায়ের “অভিযান” থেকে অনুপ্রেরণা এসেছে ট্যাক্সি ড্রাইভারের। আরো মুগ্ধ হলাম! ডি নিরোর অভিনয় আর দুর্দান্ত একটি গল্প ভাসিয়ে নিয়ে গেল আমাকে। ট্যাক্সি ড্রাইভার (এবং সে সময় দেখা একই রকম কিছু সিনেমা) যেন আমাকে জানিয়ে গেল সিনেমা আসলে বানাতে হয়। সিনেমার একজন পরিচালক থাকে।

ঝটপট দেখে ফেললাম Raging Bull. আরো একবার মুগ্ধ হওয়ার পালা। স্করসেজি-ডি নিরো-জো পেশি ত্রয়ী মিলে পল শ্রেডারের চিত্রনাট্য থেকে বললেন অসাধারণ এক গল্প। না, তখনো আমি তার মহাভক্ত হয়ে উঠিনি।একটু এগোই। ডি ক্যাপ্রিওর সুবাদে দেখলাম The Wolf of Wall Street. প্রথম দেখায় নগ্নতায় ভরা এক কমেডি মনে হলো। কিছুদিন গেল, আবার দেখলাম। সাঁই সাঁই করে সিনেমাটি আমার খুব প্রিয় সিনেমার তালিকায় উঠে গেল। নৈতিকতা বিবর্জিত জর্ডান বেলফোর্ট নামক এক নেকড়ের গল্প প্রচন্ড ভাবে ছুঁয়ে গেল আমাকে। এরপর দেখেছিলাম Shutter Island, অসাধারণ মেকিং থাকলেও কেন জানি মনে দাগ কাটতে পারেনি। এরপর দেখলাম Hugo. মারাত্মকভাবে আন্ডাররেটেড এই শিশুতোষ সিনেমা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল।

স্করসেজি যেন সিনেমার প্রতি লিখলেন প্রচন্ড মায়াবী এক চিঠি। তাঁর এই সিনেমা দিয়েই অবশেষে চিনলাম সিনেমার গ্র্যান্ডফাদার জর্জ মেলিয়েসকে। এরপর দেখা হলো After Hours. আহা! এত অসাধারণ ব্ল্যাক কমেডিও যে আসতে পারে স্করসেজির হাত থেকে কে জানতো! আরো একবার মুগ্ধ হলাম। এরই মাঝে দেখে ফেলেছিলাম Gangs of New York, খারাপ লাগেনি, তবে ড্যানিয়েল ডে লুইসের অভিনয়টাই আর সব কিছু ছাপিয়ে বেশি ভালো লেগেছিল, বাকি সবাই যেন ছিল তাঁর ছায়ায়। এরপর সময় হলো The Irishman মুক্তির। প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় রইলাম। নেটফ্লিক্সে মুক্তির সাথে সাথে দেখে ফেললাম এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সিনেমার শেষে আমার চোখ প্রায় অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে। ফ্র্যাংক শিরানরূপী ডি নিরোর পরিণতি তো আছেই, সেই সাথে বারবার মাথায় খেলছিল এখন আর এরকম সিনেমা কে বানাতে পারে? স্করসেজির দক্ষতা যে বিন্দুমাত্র বুড়িয়ে যায় নি তার চাক্ষুষ প্রমাণ যেন দ্য আইরিশম্যান।

দুর্দান্ত মহাকাব্যিক এই মাফিয়ার গল্পে স্করসেজি যেন আরো একবার হুংকার দিলেন যে তিনি এখনো আছেন। ততদিনে আমার সিনেমা বানানোর ইচ্ছাটাও জেগে উঠেছে। বন্ধুদের সাথে মিলে বানিয়ে ফেলেছি বেশ কটি শর্টফিল্ম। আর যেসব পরিচালক প্রচন্ড ভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন তাঁদের একজন এই ভদ্রলোক। স্করসেজির ২৫টি সিনেমার মধ্যে দেখেছি কেবল ৯টি। অনেক ক্লাসিকই এখনো দেখা বাকি। কিন্তু তবু যখন বং জুন হো অস্কার হাতে নিয়ে স্করসেজির প্রতি তার সম্মান প্রদর্শন করলেন, আমি বুঝতে পারলাম আমিও তাঁর মতই স্করসেজির প্রেমে পড়ে আছি অনেকদিন হলো। হেরে গিয়েও যেন সেদিন বিজয়ীর হাসি হেসেছিলেন মার্টিন স্করসেজি। আর আমার মত অসংখ্য সিনেমাপ্রেমীর মুখেও ফুটে উঠেছিল এক চিলতে হাসি।

স্করসেজি এখনো ফুরিয়ে যাননি। প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের Killers of the Flower Moon এর কাজ শুরু করবেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই। তাঁর সাক্ষাৎকারগুলো খুবই আনন্দ নিয়ে দেখি। সিনেমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ফুটে ওঠে তাঁর প্রতিটি শব্দে। সিনেমার এক দূত হয়ে গেছেন বহু আগেই। কোরিয়ান সিনেমাকে প্রোমোট করেছিলেন বাকি সবার আগেই। সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজি নিয়েও বারবার কথা বলেছেন। পাম ডি’অর, অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা, সিলভার বিয়ার সহ জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। বিশ্বজুড়ে শত শত পরিচালককে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং করে যাচ্ছেন।প্রিয় স্করসেজি, কোনোদিন হয়তো আপনাকে কথাগুলো বলতে পারব না।

কোনোদিন এই লেখাও আপনার কাছে পৌঁছাবে না। কিন্তু তবুও জানাই, আরো অনেক বসন্ত আসুক আপনার জীবনে। আরো অনেকগুলো গল্প উঠে আসুক বড় পর্দায় আপনার হাত ধরে। আপনার হাত ধরেই চিনেছি সিনেমার বিশুদ্ধ এক পথ। আপনার গল্পগুলো রূঢ় বাস্তবতার কথা বলে, কখনো দুর্দান্ত এক ফ্যান্টাসির দুনিয়ায় নিয়ে যায়।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker