চলতি হাওয়াহোমপেজ স্লাইড ছবি

আমেরিকার নির্বাচন: পদ্ধতি ও ইতিহাস

নবাব আবদুর রহিম: ১৭৮৩ সালে ব্রিটেনের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে গঠিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States of America)। এরপর থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল গণতন্ত্রের এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম সফল গণতন্ত্রের উদাহরণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিশ্বের অন্য যেকোন রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ে বহুগুণ ক্ষমতার অধিকারী। এছাড়া এই নির্বাচন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুলও। তবে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি নির্বাচনের কারণেই সারাবিশ্ব মুখিয়ে থাকে এই নির্বাচনের প্রতি। এই নির্বাচন অনেক জটিল প্রক্রিয়াও বটে। তাই আমরা এটি সহজেই বুঝে উঠতে পারি না। এই নিবন্ধে সহজেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়া আলোচনার চেষ্টা করব।

রাজনৈতিক দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন সাধারণত দ্বিদলীয় নির্বাচন। এখানে প্রধান দুটো দল নির্বাচনে অংশ নেয়। সেগুলো হচ্ছে ‘রিপাবলিকান পার্টি’ ও ‘ডেমোক্রেটিক পার্টি’। তবে ক্ষুদ্র কিছু রাজনৈতিক দলও রয়েছে যারা কখনও কখনও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করে থাকে। এগুলোর মধ্যে গ্রীন পার্টি, লিবার্টারিয়ান পার্টি ও ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টি উল্লেখযোগ্য।

১. রিপাবলিকান পার্টি: এটি Grand Old Party (GOP) হিসেবেও পরিচিত। ঐতিহাসিক এ দলটি থেকে এ পর্যন্ত ১৯ জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই দলের প্রার্থী। রাজনীতিতে রিপাবলিকান পার্টি রক্ষণশীল ধ্যানধারণা লালন করে। এই দলটি অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপের পক্ষে। এই পার্টির প্রতীক হলো হাতি।

২. ডেমোক্র্যাটিক পার্টি: দেশটির উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল হচ্ছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। বহুত্ববাদ, অভিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগুলোর প্রতি এই দলটি সহানুভূতিশীল। এই দল থেকে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন দেশটির ৭ম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকশন। এই দলটির প্রতীক গাধা।

প্রতীক কেন গাধা-হাতি দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রতীক নির্বাচন বেশ মজার। ১৮২৮ সালে নির্বাচনকালে ডেমোক্র‍্যাট প্রেসিডেন্টপ্রার্থী অ্যান্ড্রু জ্যাকশনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ‘জ্যাক‌অ্যাস’ বা গাধা নামে ডাকতে শুরু করে। পরে একজন কার্টুনিস্ট জ্যাকের চেহারা সম্বলিত এক গাধার ছবি আঁকেন। যা অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের পছন্দ হয়ে যায়। তিনি গাধাকে নিজের দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তখন থেকেই ডেমোক্র‍্যাটদের প্রতীক হয় গাধা।

পরবর্তীতে ১৮৭৪ সালে থমাস নেস্ট নামক এক কার্টুনিস্ট একটি কার্টুন আঁকেন। যাতে দেখা যায় পিঠে চামড়া চাপিয়ে এক গাধা বনের সব প্রাণীকে ভয় দেখাচ্ছে। সবাই ভয় পেলেও একটি হাতি স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে তিনি হাতি দ্বারা রিপাবলিকানদের শৌর্যের বিষয়টি উপস্থাপন করেন। এটি লুফে নেয় রিপাবলিকানরা। এখান থেকে হাতি ও গাধার অর্থও দাঁড়িয়ে গেছে। গাধা হচ্ছে সহনশীল ও সহিষ্ণুতার প্রতীক, আর হাতি শৌর্যবীর্যের।

রেড, ব্লু ও সুইং স্টেট যুক্তরাষ্ট্রে বেশকিছু চিহ্নিত অঙ্গরাজ্য রয়েছে যারা নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে থাকে। এজন্য প্রার্থীরা বড় বড় স্টেটগুলোর চেয়ে ছোট স্টেটগুলোতেই বেশি প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। নির্দিষ্টভাবে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে থাকে রাজ্যগুলো ‘রেড স্টেট’ ও ডেমোক্রেটদেরগুলো ‘ব্লু স্টেট’ নামে চিহ্নিত হয়। আবার যেগুলোতে চিহ্নিত ভোটার নেই বা যে কাউকে ভোট দিতে পারে সেগুলোকে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’ বলা হয়। এগুলোকে ‘সুইং স্টেট’ও বলা হয়।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের যোগ্যতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২ নম্বর ধারায় বর্ণিত যোগ্য ব্যক্তিরাই প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতা করতে পারবে। সংবিধান অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৩৫ বছর বয়সী হওয়া, জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হওয়া, কমপক্ষে ১৪ বছর আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার শর্ত আরোপিত হয়েছে। এছাড়া দেশটিতে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত কোনো বিদেশি অথবা দুইবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।

প্রার্থী মনোনয়ন পদ্ধতি ‌ ‌জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই আরেকটি জটিল পদ্ধতির মধ্য দিয়ে প্রার্থীদের মনোনয়ন নিতে হয়। প্রথমে প্রতিটি দল থেকে আগ্রহী প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আবেদন জানায়। এরপর বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা মনোনয়ন পেয়ে থাকে। পদ্ধতিগুলো নিম্নরূপ- • ককাস: ‌রাজনৈতিক দল আয়োজিত অভ্যন্তরীন নির্বাচন পদ্ধতি হচ্ছে ককাস। এতে দলের নির্ধারিত ডেলিগেটরা তাদের প্রার্থী বাছাই করে। ‌• প্রাইমারি: ককাসের আরেকটি রূপ হচ্ছে প্রাইমারি। তবে এটি আয়োজিত হয় অঙ্গরাজ্য সরকার কর্তৃক। এই প্রক্রিয়ায় চার উপায়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়। ‌১. ক্লোজড প্রাইমারি: শুধুমাত্র দলের নিবন্ধিত ভোটাররা দলীয় প্রার্থীকে মনোনীত করে। ‌২.সেমি-ক্লোজড প্রাইমারি: দলের নিবন্ধিত ভোটার ও সমর্থকরা ভোট দেয়। ৩. ওপেন প্রাইমারি: যেকোন দলের নিবন্ধিত ভোটার যেকোন দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। ৪. সেমি-ওপেন প্রাইমারি: যেকোন দলের নিবন্ধিত ভোটাররা যেকোন প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। তবে ভোটাররা ভোট দেওয়ার সময় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে দলীয় পরিচয় প্রদর্শন করতে হবে। • সুপার টিউসডে বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যে একই দিনে প্রাইমারি ও ককাস অনুষ্ঠিত হয়। এদিনটি সুপার টিউসটে হিসেবে পরিচিত।

প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট: প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের মধ্যে বেশকিছু বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ৩টি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ১টি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মূলত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বিচক্ষণতা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা হয় এই ডিবেটে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই ডিবেট বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নির্বাচন পদ্ধতি দেশটিতে বেশ জটিল প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে পরোক্ষ গণতন্ত্রের চর্চা হয়ে থাকে। ফলে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা ভোট প্রয়োগ করে থাকলেও ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

পপুলার ভোট ও ইলেক্টোরাল কলেজ: যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। তাই প্রতি চার বছর পরপর নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার পপুলার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। আর ডিসেম্বরের তৃতীয় সোমবার ইলেক্টোরাল কলেজ সদস্যরা প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন।

পপুলার ভোট: পপুলার ভোট ওই ভোটকেই বলে যেটাতে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা ভোট প্রদান করে থাকে। ভোট প্রয়োগ করতেও কিছু যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। তার মধ্যে ১৮ বছর বয়সী হওয়াও একটি বিষয়। মূলত ওই নির্বাচনের দিন সাধারণ নাগরিকরা মনে করে থাকেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় না। বরং প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের দলীয় ইলেক্টোরাল কলেজ নির্বাচিত হয়।

পপুলার ভোট কেন নভেম্বরে এবং মঙ্গলবারে হয়– বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাধিকার প্রয়োগের হার সর্বনিম্ন। মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ কেবল ভোট দিয়ে থাকে। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার শুরুর দিকে ছুটির দিনকে বাছাই করা হয়েছিল। কিন্তু এতে ভালো কোন ফল মেলেনি। পরে ১৮৪৫ সাল থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়ম চলে আসছে। তখন আমেরিকা ছিল কৃষিপ্রধান দেশ। ঘোড়াগাড়িতে করেও দূরের ভোটকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় লেগে যেত কৃষকদের। এর মধ্যে শনিবার ছিল কাজের দিন। রবিবারে সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান নাগরিকদের ধর্মকর্মের দিন। আর বুধবার ছিল বাজারের দিন। ফলে সোমবারকে যাতায়াতের সুবিধার্থে রেখে মঙ্গলবারকেই বেছে নেওয়া হয়।

ইলেক্টোরাল কলেজ সদস্যদের ভোট: নভেম্বরের মঙ্গলবারে অনুষ্ঠিত ভোটে নির্বাচিত ইলেক্টোরাল কলেজ সদস্যরা ডিসেম্বরের তৃতীয় সোমবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের ভোট দেন। • ইলেক্টোরাল কলেজ: পপুলার ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই দলগুলো কংগ্রেসের ৫৩৫ জন সদস্যর সমান্তরালে ৫৩৫ ও ওয়াশিংটন ডিসি থেকে অতিরিক্ত ৩ জন সদস্যকে বাছাই করে ৫৩৮ জনের একটি প্যানেল দেন। প্রতি অঙ্গরাজ্যে কংগ্রেসম্যানদের অনুপাতে এই কলেজ দেওয়া হয়।

কংগ্রেস ‌মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন সভার নাম কংগ্রেস। এটি মূলত দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট। এর উচ্চকক্ষ সিনেট। ৫০ অঙ্গরাজ্য থেকে এখানে দুইজন করে প্রতিনিধি হিসেবে ১০০ জন নির্বাচিত সদস্য থাকেন। আর নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদে অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচিত সদস্য থাকে। এখানে সদস্য রয়েছে ৪৩৫ জন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ৫৩৫ ও ওয়াশিংটন ডিসি থেকে তিনজন, মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টোরাল কলেজ নির্বাচিত হয়। এরা কংগ্রেসের কেউ নয়। এটি সম্পূর্ণ দলীয় মনোনয়ন।

প্রবীন ও দলের প্রতি আনুগত্যশীল কর্মীদেরই সাধারণত বাছাই করা হয়। পপুলার ভোটে অঙ্গরাজ্যে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, ওই দলের মনোনীত সকল প্রার্থী ইলেক্টোরাল কলেজ নির্বাচিত হবে। এভাবে সারাদেশে নির্বাচিত ইলেক্টোরাল কলেজ সদস্যরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে। প্রেসিডেন্ট হতে প্রার্থীকে ইলেক্টোরাল কলেজের অন্তত ২৭০ ভোট পেতে হবে।

ফলাফল ঘোষণা ও নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেক দুই দফা নির্বাচনের পর মোটামুটি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। পরে ২০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট শপথগ্রহণ করে থাকেন।

তথ্যসূত্র: ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার রাজনীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থা’ -নেসার আমিন।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker