জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

আলো দিয়ে উদ্ভাসিত করেছেন যিনি একটি জাতিসত্ত্বাকে

আরিফুল আলম জুয়েল: আজ ১৫ই আগষ্ট। জাতীর জন্য এক কলঙ্কময় দিন। জাতীয় শোক দিবস। ৪৫ বছর আগে ১৯৭৫ সালের এই দিনে একদল বিপদগামী পাক হায়েনাদের প্রেতাত্মা তথা সেনাবাহিনীর একটি চক্রান্তকারী চক্র সপরিবারে হত্যা করে বাঙালী জাতীর জনক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালী জাতীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

তবে কেন জানি আজকে আমার বঙ্গবন্ধু’র ফিরে আসার ঘটনা খুব মনে পড়ছে, বৃষ্টির দিনে চারিদিকের মানুষের চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে গিয়েছিল! শনিবার! বিলেতের শীতের সকাল! বাইরে বৃষ্টি, কিন্তু ব্রিটেন প্রবাসী হাজার হাজার বাংলাদেশি কিছুই তোয়াক্কা করছেন না। ছুটে চলছেন, গন্তব্য সেন্ট্রাল লন্ডনের ক্ল্যারেজ হোটেল। শুধুমাত্র লন্ডন নয় বার্মিংহ্যাম, ম্যানচেস্টার থেকেও লোকজন ছুটে আসছেন।

বৃষ্টির জল আর চোখের জল সেদিন একাকার হয়ে গিয়েছে সবার! বেদনার অশ্রু নয় সেই চোখের অশ্রু ছিল আনন্দের আর বিজয়য়ের। কণ্ঠে জয়বাংলা। কারণ, বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছেন, জাতির জনক ফিরে এসেছেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। কেউ জানতো না বঙ্গবন্ধু ফিরছেন কিনা। ২৯ ডিসেম্বর প্রথম বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছেন ভুট্টো।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যখন ব্রিটেনে বাঙালীদের দেখা হয়, পা ছুঁয়ে সালাম করার পর তিনি জড়িয়ে ধরে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেন, তোমার বাপ-মা কি জীবিত আছেন? ওরা কি আমার দেশের সব মানুষ মেরে ফেলেছে? সকাল ৭টায় বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে অবতরণ করবে। সেই সংবাদটি সাথে সাথে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতা ফোন করে জানিয়েছিলেন।

রয়টার্স সেদিন শিরোনাম করেছিল লন্ডনে শেখ মুজিব। হিথ্রো বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে বৈদেশিক দপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁকে স্বাগত জানান। সেখানে ছুটে আসেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানান, ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে নিতে এসেছেন তাঁকে।

সকালবেলা বিখ্যাত ক্ল্যারেজ হোটেলের রাজকীয় স্যুইটে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ!
তখনো খুব বেশি মানুষের ভিড় হয়নি, বঙ্গবন্ধু সবার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। দেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। বঙ্গবন্ধু বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন শহীদদের কথা, দেশের কথা, ধ্বংসের কথা, সেখানে উপস্থিত কেউ আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু উদগ্রীব ছিলেন কখন বাংলাদেশে ফিরবেন। সেখান থেকেই দেশে টেলিফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন।

রাস্তায় তখন শত শত মানুষ। এক নজর তাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেখতে চান। হোটেল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়েছে সেই ভিড় সামলাতে। সবাইকে হোটেলে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু জানালায় এসে বারবার হাত নাড়ছেন, বাইরে শ্লোগান হচ্ছে জয়বাংলা জয়বঙ্গবন্ধু! হোটেলে অবস্থানকালেই আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সেই সাত সকালেই সেখানে ছুটে এসেছিলেন সেই সময়ের ব্রিটেনের বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলিয়াম যিনি পরবর্তীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেখানে এসে বঙ্গবন্ধুকে প্রথম মি. প্রেসিডেন্ট বলে সম্বোধন করেছিলেন তিনি।

হোটেলের বাইরে শত শত মানুষের চোখে সেদিন আনন্দে অশ্রু ঝরছে, বৃষ্টি উপেক্ষা করেই শ্লোগান দিচ্ছে জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। সেদিন হোটেল লবিতেই সবাই গিজগিজ করছিলো, তখন ঢাকা বা দিল্লি থেকে একটা ফোন আসল এবং বঙ্গবন্ধু হোটেলের বলরুমে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রেস কনফারেন্সে বসেন।

কনফারেন্স শেষ করে ফিরে আসার সময় বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিলেন হোটেলে, বঙ্গবন্ধু রাজি হলেন না, বললেন তুমি বাংলাদেশে আসো। সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারটি পরে ডেভিড ফ্রস্ট বাংলাদেশে গিয়ে নিয়েছিলেন। শুধু কি বাঙালিরাই ছুটে এসেছিলেন সেদিন! ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তাঁর সরকারি সফর সংক্ষিপ্ত করে ফিরে এসেছিলেন লন্ডনে। শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে।

সেদিন বিকেল ৫টায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। যাবতীয় রীতি উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে বহন করা গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন যতক্ষণ না বঙ্গবন্ধু গাড়িতে ওঠেন। উল্লেখ্য, ব্রিটেন তখনো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার প্রায় এক মাস পর ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

যদিও এডওয়ার্ড হিথের বঙ্গবন্ধুকে দে‌ওয়া সম্মান নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন, উত্তরে হিথ বলেছিলেন, আমি জানি কাকে সম্মান জানাচ্ছি, তিনি হচ্ছেন একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর। তাঁকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে সেদিন ছুটে এসেছিলেন ব্রিটেনের সেই সময়ের ফরেন মিনিস্টার অ্যালেকডক্লাস হিউ।

দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি! ৮ তারিখ সকালে হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পাকিস্তানি একটি বিশেষ ফ্লাইট ৬৩৫এ অবতরণ করার আগে সকালের বিবিসি মর্নিং সার্ভিসে প্রথম ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে লন্ডনে আসছেন। ৯ জানুয়ারি ‘সানডে টাইমস’ ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ মুজিবের বৈঠক শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে।

৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ বিমানটি হিথ্রো বিমান বন্দর ছাড়ার পর বিবিসি ঘোষণা দেয় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন।
সেই বিশেষ বিমানে ভারতে যাত্রা বিরতি করে ১০ জানুয়ারি বিজয়ের দেশে, বিজয়ীর বেশে, স্বপ্নের সোনার বাংলার মাটিতে পা রাখেন জাতির জনক। ২৮৯ দিন বন্দি থাকার পর পাকিস্তান কারাগার থেকে বেরিয়ে এই দিনে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।

যে স্বপ্নের জন্য জীবনের ১৩টি বছর কাটিয়েছেন পাকিস্তানিদের জেলে, সহ্য করেছিলেন নির্যাতন নিপীড়ন। কেন তিনি সরাসরি না এসে ব্রিটেন হয়ে এদেশে এসেছিলেন? সেদিন মুক্তি পাওয়ার পরই তিনি যেতে চেয়েছেন সদ্য স্বাধীন দেশ তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে। কিন্তু জেনেভা কনভেশন অনুযায়ী সেটা সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করা।

বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা অনুযায়ী এই সংবাদ পাকিস্থান প্রচার করেনি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি নিজেই বিশ্বকে জানাতে চাই আমার মুক্তির বার্তা। বঙ্গবন্ধু মাত্র একদিনের যাত্রা বিরতি করেছিলেন লন্ডনে। সেখান থেকেই বিশ্বকে জানিয়েছিলেন তাঁর বিজয়ের বার্তা, মুক্তির বার্তা। সারা পৃথিবীর রাজনীতি সেদিন চোখ রাখছিল ইতিহাসের মহানায়কের প্রতি, লন্ডনের প্রতি।করতলে সূর্য ধরা যায় না। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সেই স্বাধীনতার সূর্য যাকে জেল, ফাঁসির মঞ্চ কিছুই পিছু হটাতে পারেনি। আলো দিয়ে উদ্ভাসিত করে গেছেন একটি জাতিসত্ত্বাকে। একটি স্বাধীন ভূখণ্ডকে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker