বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

একজন মুসলিম বিজ্ঞানীর অজানা অধ্যায়!

আবু রায়হান আল বেরুনী ছিলেন মধ্যযুগের একজন বিশ্বখ্যাত মুসলিম শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন মধ্য এশিয়া ও ভারতে। তিনি একাধারে গণিত, জ্যােতির্বিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান, রাসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। এর বাইরেও তিনি পঞ্জিকা গণনা, ভূগোল, ইতিহাস ,দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।

তিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি নিজের মাতৃভাষা খোরেজামী (প্রাচীন ইরানি ভাষার একটি আঞ্চলিক শাখা) ছাড়াও সংস্কৃত, ফার্সি, গ্রিক, হিব্রু এবং আরামিয় ভাষাতে দক্ষ ছিলেন। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই জ্ঞানসাধক জন্মগ্রহণ করেন ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের উত্তরাঞ্চলের খাওয়ারিজম রাজ্যের রাজধানী খাতে। তাঁর বাল্যজীবন, শিক্ষা জীবন, দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। তাঁর বাল্যকাল অতিবাহিত হয়েছিল আল ইরাক বংশীয় রাজপতি বিশেষ করে আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরাকের তত্ত্বাবধানে।

এখানে তিনি জীবেনর প্রায় ২২ বছর কাটিয়েছিলেন। এখানে অবস্থানকালেই তাঁর নানা প্রতিভা বিকশিত হওয়া শুরু করে। তিনি গণিতশাস্ত্র নিয়ে ‘আবু নাসর ইবনে ইরাক জিলানি এবং তদ্রুপ আরো কিছু বিদ্বান ব্যক্তির কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তাঁর পরিচয় হয় প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনা (৮৯০-১০৩৭) এর সাথে। সে সময় আব্বাসীয় বংশের খলিফাদের অযোগ্যতা ও দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বহু স্বাধীন রাজবংশের উদ্ভব ঘটে। এ সময় খাওয়ারিজম প্রদেশেও দু’টি রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই প্রদেশের দক্ষিণাংশে রাজত্ব করতেন আল বেরুনীর শাসনকর্তা আল ইরাক বংশীয় আবু আবদুল্লাহ এবং উত্তরাংশে রাজত্ব করতেন মামুন বিন মাহমুদ।

(৯৯৪-৯৫) খ্রিষ্টাব্দে মামুন বিন মাহমুদ আবু আবদুল্লাহকে হত্যা করে রাজ্য দখল করে নেয়। এরপরই আল বেরুনীর জীবনে নেমে আসে দুঃখ দুর্দশা। যাদের তত্ত্বাধধানে তিনি এতোদিন ছিলেন তাদের হারিয়ে বেরুনী খাওয়ারিজম ছেড়ে লক্ষ্যহীন পথে বের হয়ে পড়েন। অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটাতে লাগলেন। এ সময় জুরাজানের (উত্তর ইরানের একটি শহর) রাজা শামস আল মা’আলি কাবুসের সুনজের পড়েন তিনি। রাজা কাবুস জ্ঞানী ব্যক্তিদের খুব ভালবাসতেন। তিনি ইতিপূর্বে আল বেরুনীর সুনাম শুনেছিলেন। কাবুস আল বেরুনীকে তাঁর রাজ্যে চাকুরী দিলেন। এখানে অবস্থানকালে (১০০১-১০০২) খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘আসারুল বাকিয়া’ এবং ‘তাজরী দুশ শুয়াত’ নামক দু’টি গ্রন্থ রচনা করেন।

কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি ‘আসারুল বাকিয়া’ গ্রন্থটি রাজা কাবুসের নামে উৎস্বর্গ করেন। খাওয়ারিজমের রাজা সুলতান মামুন বিন মাহমুদ ও জ্ঞানানুরাগ ছিলেন এবং তিনি আল বেরুনীর জ্ঞানে ও গুণে মুগ্ধ ছিলেন। একসময় সুলতান মামুন এক পত্রে আল বেরুনীকে দেশে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। তিনিও সুলতানের অনুরোধে ১০১১ খ্রিস্টাব্দে মাতৃভূমি খাওয়ারিজমে ফিরে আসেন এবং সুলতানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনার সাথে সাথে তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার কাজও চালিয়ে যেতে থাকেন। মানমন্দির নির্মাণ করে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ চালান এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন।

অপরদিকে আফগানিস্তানের গজনীর দিগ্বিজয়ী সুলতান মাহমুদ জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের খুব সম্মান করতেন। তাঁর শাহী দরবারে প্রায় প্রতিদিন দেশ বিদেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে সমকালীন জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চা নিয়ে আলোচনা হত। সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম অধিপতি সুলতান মামুনের দরবারস্থ জ্ঞানী ব্যক্তিদের গজনীতে পাঠানোর জন্যে একটি নির্দেশপত্র লিখে পাঠান। পত্র পাবার পর আল বেরুনী কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ১০১৬ খ্রিঃ গজনীতে সুলতান মাহমুদের দরবারে উপস্থিত হন। কিন্তু মামুনের দরবারের অন্যতম বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে সিনা এই প্রস্তাব ত্যাগ করেন। ফলে সুলতান মাহমুদ ইবনে সিনাকে না পাওয়ার অভিযোগে (১০১৬ – ১০১৭) খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মামুনকে হত্যা করে খাওয়ারিজম রাজ্য দখল করে নেন। তখন আল বেরুনী গজনীতে সুলতান মাহমুদের দরবারে চলে যান। তিনি সুলতান মাহমুদের একান্ত সঙ্গী হিসেবে ১০১৬ হতে ১০১৯ খ্রিঃ পর্যন্ত গজনীতে অবস্থান করেন। সে সময় সুলতান মাহমুদ ভারতবর্ষে বিভিন্ন অভিযান চালাচ্ছিলেন।

ধারণা করা হয়-সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং আল বেরুনী কয়েকবার সুলতানের সাথে ভারত এসেছিলেন। তিনি তৎকালীন ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি দেখে বিস্মিত হন। পরবর্তীতে (১০১৯-১০২৯) খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ভারতের পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থান করেন। এবং সেখানকার জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা করেন এবং তাঁদের সঙ্গে ভূগোল, গণিত ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ মত বিনিময়ের মাধ্যমে সেখানকার জ্ঞান বিজ্ঞানসমৃদ্ধ গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করেন। আর ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল হিন্দ’। তৎকালীন সময়ের ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে বইটি লেখা। আল বেরুনীর গজনীতে ফেরার কিছুদিন পরই সুলতান মাহমুদ মৃত্যুবরণ করেন। তখন সিংহাসনে ছিলেন মাহমুদের পুত্র মাসউদ (১০৩০-১০৪১)। তখন আল বেরুনী সুলতান মাসউদ এর পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন।

বিজ্ঞানী আল বেরুনী বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। মৃত্যুর ১৩ বছর পূর্বে তিনি তাঁর রচিত গ্রন্থের যে তালিকা দিয়েছেন সে অনুযায়ী তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪টি। পরবর্তী ১৩ বছরেও তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থ হলো – কিতাবুত তাফহিম (গণিত,জ্যামিতি ও বিশ্বের গঠন), আসারুল বাকিয়া (সময় নির্ণয় নিয়ে), কিতাব কানুন আল মাসুদী কি হাইওআল নজুম(গণিতশাস্ত্র ও জ্যামিতি বিষয়ক), কিতাবুল জামাহীর ফি মারেফাতুল জওয়াহীর (ধাতুবিদ্যা), কিতাব আল সায়দানা ফিল তিব্ব্ ( চিকিৎসা শাস্ত্র), তাহদীদ ফি নেহায়াতুল আমাকিন (ভৌগোলিক বিষয়), আলাল ফি যিজে খাওয়ারিজম (যুক্তিবিদ্যা) ইত্যাদি।

বিভিন্ন বিষয়ে আল বেরুনীর গবেষণায় উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ –

# কিভাবে পৃথিবীর এর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান।

# কিভাবে কুয়া এবং ঝর্ণা থেকে পানি ভূ-পৃষ্ঠে প্রবাহিত হয়।

# স্থিতিবিদ্যা (Statics) এবং গতিবিদ্যা (Dynamics) কে একীভূত করে বলবিদ্যা (Mechanics) নামক গবেষণার নতুন ক্ষেত্রের প্রবর্তন। (Mechanics এর উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক Mechanical Engineering, Civil Engineering, Structural Engineering, Aerospace Engineering, Automotive Engineering, Naval Architecture, Astronomy ,Geophysical Science, Biophysics সহ গবেষণা ও কাজের হরেক রকমের ক্ষেত্র)।

# সহস্রাধিক শহরের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়, এবং এর সাহায্যে তিনি প্রত্যেক শহর থেকে মক্কার দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

# ‘ছায়া’-র অপটিক্যাল (আলোকবিদ্যা বিষয়ক) গবেষণা, এবং এর মাধ্যমে নামাজের সময় নির্ধারণ করেন।

# মানুষের মাঝে জোতির্বিদ্যা (Astronomy)-র ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ ধ্যান-ধারণা দূর করেন।

# তিনিই আবিষ্কার করেন যে, বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা হয় ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হবে কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না।

অধ্যাপক মাপা বলেন- “আল বেরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন,বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন। ” অধ্যাপক হামারনেহ বলেছেন, “শুধু মুসলিম জগতেই নয় পৃথিবীর সমস্ত সভ্য জগতের মধ্যে আল বেরুনীই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি খ্রিস্টপূর্বকাল থেকে তাঁর সময়কাল পর্যন্ত ঔষধ তৈরী করার পদ্ধতি ও এর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন।” আল বেরুনী ছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। আল বেরুনী আজ বেঁচে নেই; কিন্তু তাঁর নাম জেগে থাকবে উজ্জ্বল তারকার ন্যায়। দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে তাঁর একান্ত সাধনায় জ্ঞান বিজ্ঞানের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক।

এ মহান মনীষী ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয়ে আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়েন। কোন চিকিৎসাতেই তাঁকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ৭৫ বছর বয়সে আবু রায়হান মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র: মুসলিম হেরিটেজ. কম, ব্রিটানিকা.কম, উইকিপিডিয়া

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker