ক্রিকেটখেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

কেন উইলিয়ামসন: অন্যরকম এক ক্রিকেটার

বোরহান উদ্দিন জাবেদ: জীবনের মায়াজালে আপনার মনটা সামান্যতেই অশান্ত হয়ে পড়ে। দিকবিদিকশুন্য হয়ে শূন্যতার দোলাচালে দুলতে থাকে আপনার মনোজগৎ। দিশাহীন অস্থিরতা বিরাজ করে আপনার মাঝে। ঠিক এই দৃশ্যপটগুলোয় একজন কেন উইলিয়ামসনকে ভাবুন তো? জীবনের প্রকম্পিত ঝড়-ঝঞ্ঝার মাঝে তিনি এক নিভৃত পথচারী। কোন কিছুতে যার এতটুকুন ভ্রুক্ষেপ নেই। কখনোবা বাইশ গজে কখনোবা মাঠের মধ্যিখানে কখনোবা প্রেস কনফারেন্সে ভেসে আসা প্রশ্নগুলোয় তিনি যেন, তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে গানের লাইনটার মতোই প্রবাহমান।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা অপূর্ব দ্বীপরাষ্ট্র নিউজিল্যান্ডের বুক ছিড়ে এসেছে এমনই এক শান্তশিষ্ট প্রাণী। নামটা তো এতক্ষণে জেনেই গিয়েছেন। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে এবং তাউরাঙ্গা এই নিউজিল্যান্ডেরই যমজ শহর। দুটো শহরের মাঝে এতোটাই সাদৃশ্য যে, প্রতিবার গুগল ম্যাপ ব্যবহার ব্যতিরেকে আপনি গোলকধাঁধায় পড়তে বাধ্য। কিন্তু তাউরাঙ্গা শহর থেকেই বেড়ে ওঠা আজকের কেন স্টুয়ার্ট উইলিয়ামসনের জীবনের মাঝে কোন ধাঁধা নেই। এ নিতান্তই এক সাধারণে মিশ্রিত অসাধারণ মানুষের এবং একই সাথে ক্রিকেটারের গল্প। যাঁর প্রতিটা আবরণে আবরণে সুপ্ত-সহজলভ্যতা। এতটাই সাধারণ যে, মানবসভ্যতার অপার বিস্তৃতির মাঝে তিনি আজ-ও নিদেনপক্ষে ফেসবুক জগতটায় নিজেকে আবিস্কার করতে পারেননি।

কেন উইলিয়ামসনের মাঝে আপনি চাইলেই রহস্যের খোঁজ করতে পারেন। কিন্তু দিনশেষে উইলিয়ামসনের কাছে আপনি হেরে যাবেন এটা বলাবাহুল্য। সব রহস্যের বেড়াজালের মাঝে তিনিই পৃথিবীর সবচেয়ে ‘শান্ত’ প্রাণী কিনা সেটা নিয়েও একদণ্ড রহস্যে হতে পারে! এমনই শান্ত যে, শৈশবের ভরা উচ্ছ্বলতায়ও তিনি আনন্দ-হুল্লোড়ে ফেটে পড়েন না। বয়সের দিনলিপি সবে বারো কি চৌদ্দ ছুঁয়েছে। এতবেশী রান করেছেন যে, অন্যদের সুযোগ দিতে সেদিন ব্যাটিং অর্ডারে সাতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল উইলিয়ামসনকে। ইনিংসের ‘পেন্টালিমেট’ বলে শেষ ব্যাটসম্যানকে সাথে নিয়ে শতক পূর্ণ করেন। জয়সূচক রানটাও আসে কেনের ব্যাট থেকেই। সৌহার্দ্যতার খাতিরে হোক কিংবা ক্রিকেটের সৌন্দর্যবর্ধনের নিমিত্ত- আম্পায়ার আর প্রতিপক্ষের প্লেয়ারদের সাথে ‘হ্যান্ডশেক’ সেরে নিলেন। ব্যস, উদযাপন বলতে এইটুকুই।

ওদিকে সতীর্থ ক্রিকেটার মাঠের আনুষ্ঠানিকতার পূর্বে মুষ্টিবদ্ধ ছোড়াছুড়িতে একধাপ উদযাপন সেরে নিয়েছেন। জুটিতে যার অবদান মোটে তিন রান। বিজয়ের উৎফুল্লতা নিয়ে ড্রেসিংরুমের উদ্দেশ্য বাউন্ডারি লাইন অতিক্রম করার প্রথম সুযোগটা সেই সতীর্থকে দিয়ে বুঝিয়ে দেন, এই জয়ে তার অবদানও যথেষ্ট পরিমাণ। ওয়ান ম্যান শো-র রূপে জয়ের কৃতিত্ব স্বীয় কাঁধে নিতে বরাবরি তাঁর বড্ড অনীহা। জীবনের মাঝে ‘অসমতা’ যার রাগের একমাত্র কারণ তাঁর চালচিত্র তো এমনই নির্মোহ হবে। এ আর আশ্চর্য কি। কেন উইলিয়ামসন আপনার সেই বন্ধুটি যে বন্ধুদের তুমুল আড্ডাগুলি ভাবলেশহীন দৃষ্টিপাতে পার করে দেন। যাঁর মাঝে এইটুকুন উচ্ছ্বাসার আনাগোনা টের পাওয়া যায় না।

সফলতা-ব্যর্থতা যাঁকে একই আঙ্গিকে উপস্থাপন করে। টান টান উত্তেজনার ম্যাচটা জিতে কোথায় উদযাপনে মাতোয়ারা হবেন; তা না। তিনি চিন্তা করেন প্রতিপক্ষের দর্শকদের কথা! আর্জিতে প্রতিপক্ষের দর্শকদের কাছে ক্ষুব্ধ না হওয়ার বাণী ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আবার পরতে পরতে রহস্যের উদ্রেক ঘটানো ম্যাচটা বাউন্ডারি সংখ্যায় হেরে বিশ্বকাপ ট্রফিটা খুইয়েও তাঁর মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠে। তিনি কেন স্টুয়ার্ট উইলিয়ামসন; তিনি এমনই। সতীর্থ জিতান প্যাটেলের তালে বললে, এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলিই কেন উইলিয়ামসন। কেন উইলিয়ামসন এমনই এক চরিত্র রোমাঞ্চও যাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। সেটার উপস্থিতিতেও তিনি বেছে নেন সহজ-সরল পাহাড়ি রাস্তাটা।

সেটা এমনই যে, ট্রান্স-তাসমান মর্যাদার লড়াইয়ে সটান বেগে ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচটা জিতিয়েও তিনি যেন হিমশীতল হিমালয়। হ্যাঁ, ২০১৫ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচটার কথাই বলছি। তাসমান সাগর পাড়ের এপার-ওপার। দুই প্রতিবেশী – অহমে ভরপুর অস্ট্রেলিয়া আর নিপাট ভদ্রলোকের নিউজিল্যান্ড। দু’দলের লো স্কোরিং ম্যাচে অজিদের ১৫১ লক্ষ্য সহজেই অতিক্রমের পথে ছিল ব্ল্যাক ক্যাপসরা। কিন্তু ১৩১/৪ থেকে মুহুর্তেই কিউইরা পরিণত হয় ১৪৬/৯ এ। টপাটপ একেকটা উইকেট পড়েছে অপরপ্রান্তে তিনি ওই একই শান্তশিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যে ওভারে মিচলে স্টার্ক হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে ম্যাচে রোমাঞ্চের আগমন ঘটিয়েছিলেন। সেই ওভারেই স্টার্কের শেষ দুটো গোলা সামলাচ্ছেন নয় নাম্বার ব্যাটসম্যান ট্রেন্ট বোল্ট। জয়ের পথে দূরত্বটা তখনও পাঁচ রানের। উইকেট ওই একটিই। কিন্তু তিনি এমনই মনোভঙ্গিতে আছেন যেন কিছুই হচ্ছে না। ঠিক যেমন পেট কামিন্সের পরের ওভারের প্রথম বলটাই উড়াল পথে লং অন দিয়ে উপড়ে ফেলেও কোন ভাবাবেগ হয় না তাঁর। উদযাপনের বদলে তিনি যেন আরো নিঃস্তব্ধতার আবেশে আবৃত হয়ে যান।

এই নিঃস্তব্ধতার ব্যাকরণ আপনি খুঁজে পান ইডেন পার্কের উত্তাল গ্যালারীর গর্জনের মাঝে। কিউইদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান প্রয়াত মার্টিন ক্রো স্কুল ক্রিকেটে প্রথম দেখায় উইলিয়ামসন সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, সে শুধু রান করবে না; তাঁর ইনিংসগুলো হবে মাস্টারপিস। পরপারে পাড়ি জমানোর আগে শেষ সাক্ষাৎকারে ক্রো বলেছিলেন, কেন সম্ভবত নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান। যে মানদণ্ডে ক্রো কথাটা বলেছিলেন। টেস্ট ক্রিকেটে উইলিয়ামসন তখনও ক্রোর থেকে ৩৪২২ রান এবং স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের থেকে ৪১৩৮ রান পেছনে। উইলিয়ামসনের ভেতরে সেই রসদ ছিল বিধায় ক্রো সাহস করেছিলেন এমন বাণী করতে। আর তিনি বিশ্বাসের ‘প্রতিদান’ দিয়ে কি দারুণভাবেই না প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাচ্ছেন অন্যদের। প্রতিদান শব্দটায় কেন নিশ্চিতভাবেই অনাগ্রহ দেখাতেন। এ-সব নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ তো দূরে থাক, এড়িয়ে যেতে পারলেই যেন তিনি বাঁচেন! ‘স্টারডম’ তার কাছে কেবলই একটা শব্দ! তাঁকে ‘সুপারস্টার’ সম্বোধনে উচ্ছ্বাসের বদলে দেখিয়ে দেন এবি ডি ভিলিয়ার্স কিংবা বিরাট কোহলিকে। কি অবলীলায় বলে দেন, তাঁরা সুপারস্টার; তাঁদের থেকে দারুণ কিছু আশা করতে পারেন। কিংবা ‘ফ্যাবুলাস ফোরের’ আলোচনায় নিজেকে দূরে সরিয়ে বাহবাটা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এতটুকু কার্পন্য হয় না তাঁর।

ভারতে বিরাট কোহলির এই যে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। মানুষের এতবেশী আগ্রহ। এসব তাঁর কাছে ভীষণরকম চ্যালেঞ্জিং লাগে। তিনি যে চিন্তাধারার, এসব তাঁর কাছে বরং অগ্রাহ্যই ঠেকার কথা! ক্রিকেটের তীর্থস্থান লর্ডসে ১৩২ রানের ইনিংসের মাধ্যমে পঁচিশের আগে দশ সেঞ্চুরিতে উইলিয়ামসন পাশে বসেন ডন ব্রাডম্যান, নেইল হার্ভি, গ্যারি সোবার্স, শচীন টেন্ডুলকার, গ্রায়েম স্মিথদের। অনুভূতির উত্তর দিয়েছিলেন ‘ওকে’ বলে। শুধু ‘ওকে’ দিয়ে তো আর পাঠকের পেট পুরবে না; কাগজও ভরবে না। সেই দরুন চাপাচাপিতে উত্তরটা আরেকটুখানি বেড়ে হয়, উন্নতি করছি; আরো ভালো করতে চাই। আপনার মনে হতে পারে ইন্টারভিউয়ে উইলিয়ামসন বুঝি নার্ভাস ফিল করছেন বা করেন। আপনার মতো আরো অনেকেরই মনে হয়েছিল। উত্তরটা জানতে চাওয়া হয়েছিল বেন্ডন ম্যাককালামের কাছে। ম্যাককালাম জানিয়েছিলেন, মানুষ কেনো তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে চায়, জানতে চায় উইলিয়ামসন সেটাই বোঝেন না। এতটাই সাধারণ তাঁর জীবনদর্শন। রঙ্গিন আলোর তারকাখ্যাতির এই যুগে উইলিয়ামসনের পছন্দ পর্দার আড়ালটা। আলোর ঝলকানিতে যাঁর প্রচন্ড অনীহা। তাইতো নিউজিল্যান্ডের সেরা স্পোর্টসম্যানের পুরস্কার নিতে গিয়ে বলে ফেলেন, দর্শক সারিতে বসে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটা দেখতে না পারা তাঁর জন্য দুর্ভাগ্য। কারোপ্রতি অভিযোগের কোন অধ্যায় উইলিয়ামসনের জীবনে লেখা হয়নি! এমনই যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তুলনামূলক কম টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়া নিয়ে জিজ্ঞেস করলেও একটু অনুযোগ বেরোয়না। টেস্ট খেলাটা উপভোগ করেন, যতবেশি সম্ভব খেলতে চান।

ব্যস, এইটুকুই। উইলিয়ামসনের উদযাপনের মতোই সীমিত তাঁর উত্তর। রাগবির জনপদে ক্রিকেটের কেউ যদি বিশ্বকাপ ট্রফিটা নিয়ে আসতে পারে, সেটা কেন উইলিয়ামসন। এমনই আশা করেছিলেন মার্টিন ক্রো। শেষবেলায় মননে তিনি এই ছবিটাই এঁকেছিলেন। ভাগ্যের হেরফেরে হাতছোঁয়া দূরত্ব থেকে সেই ছবিটা বিলীন হতে দেখেও উইলিয়ামসন হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যাননা। হয়তো এভাবেই তিনি একদিন বিশ্ব জয় করবেন! শুভ জন্মদিন কেন স্টুয়ার্ট উইলিয়ামসন!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker