ট্রেন্ডিং খবরপ্রযুক্তিহোমপেজ স্লাইড ছবি

কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি নতুন ধরণের হেজিমনির জন্ম দেবে?

হিমাংশু কর: সম্প্রতি গুগল তাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সফলতার একটি খবর প্রকাশ করেছে। সেখানে তাঁরা দেখিয়েছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে ভাল সুপার কম্পিউটারের যে সমস্যাটি সমাধান করতে প্রায় দশ হাজার বছর লাগবে, সেটা তাঁরা তাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে মাত্র ৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডেই সমাধান করেছে। অবশ্য আইবিএম গুগলের এই দাবীকে মেনে নেয় নাই। তাদের দাবী এই সমস্যাটা সমাধান করতে সুপার কম্পিউটারের আড়াই দিন লাগবে। কিন্তু গুগল নেচার জার্নালে তাদের গবেষণাপত্রে সিমুলেসনের সাহায্যে এটা দেখিয়েছে যে সমস্যাটা সমাধান করতে বর্তমান সময়ের সবচেয় শক্তিশালী কম্পিউটারেরও ১০ হাজার বছর সময় লাগবে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার আর সাধারণ কম্পিউটারের গঠনের মধ্যে অনেক বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে। আর কাজ করার পদ্ধতিতেও(এ্যালগরিদম) রয়েছে অনেক তফাৎ। কোয়ান্টাম এ্যালগরিদম ব্যবহার করে কিছু কিছু সমস্যা খুব কম সময়ে সমাধান করা যাবে, যেগুলো করতে ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের হয়তো দুই চার বিলিয়ন বছর লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সিমুলেসন ও মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ। প্রথমটা করা গেলে ঔষধ ও রোগ নিয়ে গবেষণায় এক ধরনের মারাত্মক অগ্রগতি হবে, আর দ্বিতীয়টা করা গেলে যেকোনো সার্ভার বা কম্পিউটারের সিকিউরিটি খুব সহজেই ভেঙ্গে ফেলা যাবে। শুনতে খুব সাধারণ শোনালেও একটি বিশাল সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করতে গেলে সুপার কম্পিউটাররও অনেক সময় লাগে। যদি অনেক বিশাল কোন সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করতে দেওয়া হয়, তবে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগেও তা শেষ হবে না। আর এই বিষয়টা ধরে নিয়েই বেশিরভাগ কম্পিউটার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ডিজাইন করা হয়। যদি কেউ বড় কোন সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করার কোন সহজ উপায় বের করতে পারে, তবে সহজেই কম্পিউটার নিরপত্তা ব্রেক করা যাবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই কাজটা খুব দ্রুত করে ফেলতে পারবে। এজন্য চায়না আর আমেরিকার কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির জন্য খুব চেষ্টা-চরিত করছে। কিন্তু বাস্তবে একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করার বেশ বড় কিছু বাধা রয়েছে।

সাধারণ কম্পিউটার মূলত লজিক গেটের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে। আর তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোল্টেজ। ভোল্টেজ থাকলে সেটাকে ১, আর না থাকলে সেটাকে ০ হিসেবে ধরা হয়। বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতিতে এই ০ আর ১ দিয়েই যেকোনো সংখ্যা প্রকাশ করা যায়। এই ০ আর ১ কে বলা হয় বিট। এরাই কম্পিউটারের তথ্যের একক। শুধুমাত্র এই একটি বিষয়ের সুবিধা নিয়ে মানুষ লজিক গেট দিয়ে এমন সব সার্কিট তৈরি করেছে যেগুলো হিসেব করতে পারে, বিশ্লেষণ করতে পারে।

এইসব হিসেব আর বিশ্লেষণ করতে হলে ধাপে ধাপে কাজ করতে হয়। এই স্টেপ বাই স্টেপ কাজ করার পদ্ধতিকে বলা হয় এ্যালগরিদম। আমরা এখন যে ধরণের কম্পিউটার ব্যবহার করি সেগুলোতে অর্ধপরিবাহী পদার্থ দিয়ে সার্কিট তৈরি করা হয়। বর্তমান সময়ে সার্টিককে অনেক জটিল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এগুলোকে এখন প্রসেসর বলা হয়। এই প্রসেসরের জন্য যে ধরণের এ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয় সেগুলো কিছু কিছু সমস্যা সমাধান করতে গেলে বিপদে পড়ে যায়। আসলে কিছু সমস্যা ধরন এমনই যে, সেই সমস্যাগুলো সমাধান করতে অনেক ধাপ পার হতে হয়। এ্যালগরিদমে যত বেশি ধাপ থাকবে, কম্পিউটারের সেই সমস্যাটা সমাধান করতে তত বেশি সময় লাগবে। কিছু কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য সিলিকনের প্রসেসর ভিত্তিক কম্পিউটারের প্রচুর সময় লাগে। কারণ এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যে এ্যালগরিদম রয়েছে সেগুলো অনেক ধাপের।

কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারের পদার্থের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে তথ্য জমা ও বিশ্লেষণ করা যায়। একটি ইলেকট্রনকে চাইলে তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এই তথ্যকে বিট না বলে বলা হয় কিউবিট। কিউবিট ব্যবহার করে হিসেব করতে হলে কিউবিটগুলোকে এন্ট্যাঙ্গেল্ড করা লাগে (দুইটা ইলেকট্রনের স্পিন যেমন এন্ট্যাঙ্গেল্ড থাকে ঠিক তেমন)। তখন এগুলো কিছুটা সার্কিটের মত কাজ করে। তখন কোয়ান্টাম এ্যালগরিদম ব্যবহার করে এটাকে একটা কম্পিউটার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। অনেকগুলো কিউবিটকে এল্ট্যাঙ্গেল্ড করা খুবই কঠিন। গুগলের মূল সাফল্য হলো তাঁরা ৫৪ টা কিউবিটকে এন্ট্যাঙ্গেল্ড করে একটি প্রসেসর তৈরি করেছে এবং সেটাকে দিয়ে তাঁরা তথ্য প্রসেসও করেছে। এই প্রসেসর দিয়ে গুগুল যে সমস্যাটা সমাধান করেছে সেটার কোন বাস্তব ব্যবহার নাই। কিন্তু এই কাজটা করে তারা মূলত এমন একটা আশা দেখিয়েছে যে, বাস্তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা সম্ভব! তার মানে, সামনে হয়ত কোয়ান্টাম কম্পিউটারের যুগ আসতে চলেছে। তখন আমাদের দেখতে হবে নতুন ধরণের হেজিমনি! কারণ পারমাণবিক বোমা তৈরি করে সেটা প্রয়োগ করতে না পারলেও, কোয়ান্টাম কম্পিউটার যে দেশগুলোর দখলে থাকবে তাঁরা ঠিকই সেটাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন গ্রুপ তৈরি করবে, তৈরি করবে নতুন পোলারিটি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker