স্বাস্থ্যহেলথ টিপসহোমপেজ স্লাইড ছবি

ঘুমের ইতিবৃত্ত

ইয়াসিন আরাফাত: ভারতের পশ্চিমঙ্গের দার্জিলিং এ একটি পাহাড় আছে তার নাম ‘ঘুম’ পাহাড়। এখনেই বিশ্বের অন্যতম উচুঁ একটা রেল ষ্টেশন আছে যার নাম হলো ‘ঘুম রেল ষ্টেশন’। জানি না সেখানে গিয়ে সবার বেশি বেশি ঘুম পায় কি না? আজকে কিন্তু কোনো ভ্রমণ কাহিনী বলব না। আজ কথা বলব ‘ঘুম’ নিয়ে। এটা খুবই বিস্ময়কর একটা ব্যাপার। প্রতি দিনই আমরা ঘুমাই কিন্তু আমরা কি প্রশ্ন করি কেনো ঘুমাই? একটি শিশু মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় ৯৫% সময়ই ঘুমিয়ে কাটায়।

গড়ে একজন মানুষ তার জীবনকালের এক তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে অতিবাহিত করে। আবার ঘুম নিয়ে আমাদের কত মজার মজার গল্প থাকে। একেক জনের ঘুমের ধরণ একেক রকম। কেউ ঘুমের মাঝে সারা বিছানায় গরাগরি করে। এমনও হয় মাথার বালিশ পায়ে চলে যায়। আবার কেউ ঘুমানোর সাথে সাথেই নাক ডাকা শুরু করে বিচিত্র শব্দে। আর অন্ধকারের ঘুমকে রঙ্গিন করে হরেক রকম স্বপ্ন। কিন্তু মুশকিল হলো, জেগে উঠার পরে আমরা অধিকাংশ স্বপ্নই ভুলে যাই। অনেকে আবার ভয়ানক স্বপ্ন দেখে ভয়ও পায়। আবার ছোটবেলায় ঘুমের মধ্যে বিছানা নষ্ট করার অভিযোগ কম বেশি সবার বিরুদ্ধেই থাকে যদিও এখন আমরা কেউই স্বীকার করব না।

আজকের এই আধুনিক যুগে মানব সভ্যতা এক ভয়াবহ সংটের মুখোমুখি হয়েছে, তা হলো ‘ঘুমের বিপর্যয়’। আজকাল আমাদের জীবনাচরণ প্রকৃতিক নিয়মের বাইরে চলে যাচ্ছে। দ্বিজেন্দ্রনাল রায় বলেছিলেন, ‘ও তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পরে, পাখির ডাকে জাগে’। কিন্তু আমরা এখন আর পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পরি না, আবার পাখির ডাকে ঘুম থেকে জাগিয়ো না। আমরা দিবাকালীন (Durinal) প্রাণী থেকে হুতুম পেঁচার মতো নিশাচর (Nocturnal) হয়ে গিয়েছি।

বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। আমরা রাতে ঘুমাচ্ছি না কিন্তু সারা দিনই তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে কাটাচ্ছি। চোখ থেকে ঘুম ঘুম ভাব সারাদিন যেনো কাটছেই না। ক্লাশে ঘুমাচ্ছি, পড়তে বসলে ঘুম এমনকি যানবাহনে উঠেও ঘুমায় পড়ছি যার কারণে বিভিন্ন দূর্ঘটনাও ঘটছে। গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বের ১০% তরু্ণ নিদ্রাহীনতায় ভুগছে। ১৮-৩৫ বছরের মানুষরা রাতে ৬ ঘন্টার কম ঘুমাচ্ছে। গত ৫০ বছরে আমাদের রাতের ঘুম কমে গিয়েছে গড়ে প্রায় ১.৫ ঘন্টা। এটি খুবই উদ্বেগজনক। এই বিপর্যয়ের কারনে দ্রুত গতিতে বেরে চলছে হতাশা, মেজাজের ভারসম্যহীনতা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া সহ নানাবিধ মানুষিক সমস্যা।

এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিক, হার্টের সমস্যা, ক্যান্সার, স্থুলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, আয়ু কমে যাওয়া সহ অনেক শারীরিক সমস্যা। কিন্তু কেনো ঘুমের প্রকৃতিক নিয়ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? আমাদের দৈনন্দিন রুটিন আমাদের খেয়াল খুশিতে প্রাকৃতির বাইরে চলে গেলেও আমাদের দেহ-ঘড়ি (Biological clock) কিন্তু পুরোপুরি প্রাকৃতিক নিয়ম কে মেনে চলে। আমাদের বাহ্যিক এলো মেলো কর্মকান্ডের জন্য প্রতিনিয়তেই দেহ-ঘড়ির সাথে বাধছে সংঘাত।

অনেকেই হয়তো অবাক হচ্ছেন যে, দেহ ঘড়ি আবার কি? আমরা যেমন আমাদের দৈনন্দিন কাজ কর্ম ঘড়ি দেখে দেখে করি, তেমনি আমাদের দেহের প্রত্যেকটি কাজও দেহ-ঘড়ি (Biological clock) অনুযায়ী হয়। বরং আমদের বাহ্যিক ঘড়ি ও সময় কৃত্রিম কিন্তু আমাদের দেহ ঘড়ি পুরোপুরি প্রকৃতিক। Biological clock অনুযায়ী আমরা ঘুমাই যা আলো ও অন্ধকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ঘুমের জন্য প্রয়জন হচ্ছে মেলাটোনিন হরমন যা নিঃসৃত হয় Pinal gland থেকে। কিন্তু, সূর্যের আলো চোখের রেটিনার (Retina) মধ্যদিয়ে Pinal gland এ প্রবেশ করলে এই হরমন নিঃসরন বন্ধ হয়ে যায়।

এজন্যই আমরা রাতের অন্ধকারে ঘুমাবো আর দিনের আলোতে জেগে থাকব, এটাই প্রকৃতিক নিয়ম। ২৪ ঘন্টার এই দেহ-ঘড়ির প্রক্রিয়াকে medical science এ বলে ‘সার্কাডিয়ান রিদম'(Circadian rhythm)। আমাদের দেহে এরুপ আরো কিছু রিদম (Rhythm) আছে যার সবগুলিই নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিস্কের(Brain) থ্যালামাস এর Suprachasmatic nucleus (SCN) থেকে যাকে Master Clock বলা হয়। এই Master Clock আলো এবং অন্ধকার (light&dark) থেকে সিগনাল (Signals) নেয়।

বৈদ্যতিক বাতির যে সাদা আলো তাতে থাকে Blue light যা সুর্যের আলোর মতোই। বিশেষ করে শক্তি সঞ্চায়কারী (Energy Saving LED bulb) বাতি বা Digital Devise এর স্ক্রিনের আলো। রাতে এই বাতির Blue light আমাদের মস্তিস্ককে নির্দেশনা দেয় যে, ‘এখন মধ্য দুপুর’। কেনোনা এই বৈদ্যতিক বাতি ও সুর্যের আলোর প্রকৃতি একই। তাই মেলাটোনিন হরমন নিঃসরন বাধাগ্রস্ত হয় এর ফলে আমরা অনিদ্রায় ভুগি। বিজ্ঞানিরা বলেছেন ঘুমের আদর্শ সময় রাত ৯.০০ টা থেকে রাত ৩.০০ টা পর্যন্ত। কিন্তু আমরা এই সমায়টাতেই অতিমাত্রায় বৈদ্যুতিক বাতি ও ডিজিটাল স্ক্রিন (Mobile, Computer, Tv) ব্যবহার করি। এজন্যই ঘটছে ঘুমের এই বিপর্যয়।

গবেষণা বলছে, ‘ গত ৫০ বছরের তুলুনায় আমরা এখন গড়ে ১০ গু্ণ বেশি blue light ব্যবহার করছি।’ গবেষণা বলেছে, ‘রাতে না ঘুমিয়ে দিনে কয়েক গুন বেশি ঘুমালেও তা রাতের ঘুমের সমান হবে না। রাতে আমাদেরকে ৬-৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে।

ঘুমের উপকারিতা কি কি? আমাদের শরীর ও পেশি গঠন হয় ঘুমের মধ্যে। আমরা যাই পড়ি তা মস্তিস্কে অস্থায়ী ভাবে থাকে, ঘুমালেই কেবল তা স্থায়ী হয়। হরমোন নিঃসরন হয়। পরিপাকে সাহায্য করে। খাবার চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

ভালো ঘুমের জন্য কি কি প্রয়োজন? অনেক সময় ৮/১০ ঘন্টা ঘুমিয়েও আমাদের ঘুমের তৃপ্তি আসে না। তখন বুঝতে হবে আমাদের ভালো ঘুম হচ্ছে না। এজন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। ডিজিটাল স্ক্রীন ও Blue light (Light pollution) থেকে দূরে থাকা।

রাত ৯-১০ টার মধ্যেই ঘুমিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা।তাই ঘুমানোর প্রস্ততির জন্য আগে থেকেই ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যাবহার বন্ধ করা। খুব প্রয়োজনে ব্যাবহার করতে হলেও Blue light filter mood এবং Blue light নিরোধক চশমা ব্যবহার করা। Digital devise ব্যবহারের এর বদলে রাত ৮ টার পর হালকা মেজাজের বই পড়ার অভ্যাস করা।

শোয়ার ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক হতে হবে। শব্দবিহীন এবং অন্ধকার হতে হবে। সকল ধরনের আলোর উৎস এমনকি ডিম লাইটও (dim light) বন্ধ রাখতে হবে। এতে মস্তিষ্ক বুঝবে এখন রাত হয়েছে তাই ঘুমাতে হবে। ঘমানোর কমপক্ষে ২ ঘন্টা আগে রাতের প্রধান খাবার গ্রহণ করা। রাত ৮.০০ টার মধ্যে খাবার গ্রহণ করা। কারণ খাওয়ার পর আমাদের দেহে সুগারের মাত্রা(Sugar level) বেড়ে যায়। এটা মস্তিস্ককে বার্তা দেয় আপনি জেগে আছেন। তাই, খাওয়ার সাথে সাথে ঘমালে গভীর ঘুম (Deep sleep) হয় না।

সকল প্রকার এলকোহল(Alcohol) গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। বিশেষত সন্ধার পর চা/কফি পরিহার করা। ঘমানোর আগে দুশ্চিন্তা না করা। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা বিশেষত সকাল ও বিকেলে। সকালে গায়ে রোদ বা সুর্যের আলো লাগানো এবং নীল আকাশের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকা। এতে সার্কাডিয়ান ছন্দ ( Circadian Rhythm) আবার ফিরে আসবে। মস্তিস্ক বুঝবে এখন দিন হয়েছে।

পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা, ভাঁজা পোড়া এবং প্রসেস ফুড (সফট ড্রিংকস সহ) এড়িয়ে চলা। রাত জেগে পড়া বা কাজের অভ্যাস বাদ দেওয়া। নিজের সুস্বাস্থের কথা চিন্তা করেই এটা অবশ্যই করতে হবে। আমাদের জীবনাচরণের পরিবর্তনের বিষয়গুলোতে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। আমাদের কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ‘আমরা কি প্রকৃতিক নিয়েমের বাইরে গিয়ে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করব নাকি প্রকৃতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করব।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker