ট্রেন্ডিং খবরবিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

জর্জিয়ার তিন নারী গায়িকার হৃদয় জয় করার গল্প

ব্রত রায়: ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা তিনটি মেয়ে তাদের নিজস্ব ভাষায় লোকগানের সুরে হেসে হেসে গান গাইছে এরকম ভিডিও আপনারা ইউটিউবে দেখেছেন। এদের গাওয়া একটি গান ‘কাখুর’ ইতোমধ্যে ৪২ লক্ষ বার ইউটিউবে দেখা হয়েছে। অন্য গানগুলোও দারুণ পছন্দ করেছে নেটিজেনরা। কারা এরা? এটি একটি জর্জিয়ান ব্যান্ড। নাম ‘মান্দিলি’।

ব্যান্ডের সদস্য তিনজন—তাতুলি মেলাদজে, তাকো সিক্লাউরি এবং মারিয়াম কুরাসবেদিয়ানি যাঁদের একসঙ্গে ত্রায়ো মান্দিলি বলা হয়। এই তরুণীরা জর্জিয়ার রাজধানী তিবিলিসিতে থাকেন। একটি মাত্র যন্ত্র বাজিয়ে গাওয়া তাদের এইগানগুলোতে প্রকৃতির সহজাত মেঠো সুর ভেসে ওঠে। পান্ডুরি নামের ঐতিহ্যবাহী জর্জিয়ান স্ট্রিং ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে গাওয়া তাদের গানগুলো জর্জিয়ার সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।

মান্দিলি জর্জিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন তারা জর্জিয়ান লোক সংগীত “অপারেকা” গেয়ে একটি মিউজিক ভিডিও আপলোড করেন। অনলাইনে পোস্ট করা এই ভিডিওটি পাঁচ মিলিয়নের বেশি ভিউ পায়। মান্দিলি বা ত্রায়ো মান্দিলি অন্য ভাষাতেও ভাষায় গান গেয়েছে, যেমন হিন্দি গান ‘গোরোঁ কি না কলোঁ কি দুনিয়া হ্যায় দিলওয়ালোঁ কি’ গেয়েছেন তাঁরা। মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ ছবির এই গানটির শিল্পী ছিলেন সুরেশ ওয়াড়কর এবং উষা মঙ্গেশকর। পাশাপাশি পোলিশ গান ‘লিপকা’ গেয়েছেন তাঁরা। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত তিনটি এলবাম বেরিয়েছে মান্দিলির।

ব্যান্ডের প্রধান তাতুলি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাঁরা তিনজনই শৈশব থেকে গানের চর্চা করেন। গত চার বছর ধরে তারা ফোক মিউজিক নিয়ে কাজ করছেন। গ্রুপের বাকি দুই সদস্য সোরেনা এবং আনি ছিলেন স্কুলের বন্ধু, পরে তাতুলি তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা এক সঙ্গে স্কুলে পরীক্ষাও দেন। এরপর তাঁরা একসঙ্গে পারফর্ম করা শুরু করেন। প্রথমে এক কন্সার্টে তাঁরা চারটি গান করেন। তবে তখনো তাঁরা তাঁদের ব্যান্ডের কোনো নাম দেননি। তাঁদের তিনজনের নামেই তারা পারফর্ম করতেন। পরে এই নামটি রাখা হয়। মান্দিলি শব্দের অর্থ মাথার স্কার্ফ, যা তাঁদের পরনে দেখা যায় প্রায়ই। সে সময় মান্দিলির বেশিরভাগ পরিবেশনাই ছিল চ্যারিটি শোতে। সেজন্য তাঁরা কোনো অর্থই নিতেন না অথবা প্রাপ্ত অর্থের পুরোটাই দান করতেন। তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল জর্জিয়ার লোক সংগীতকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে মানুষকে সাহায্য করা। তাঁদের গাওয়া গানগুলোর বেশিরভাগেরই কথা সংগৃহীত, কিছু তাঁদের লেখা।।

তাতুলির শখ মিমিক করা (অন্যকে নকল করা বা ভ্যাঙানো)। প্রিয় রঙ কালো, গোলাপি এবং ধূসর। নিজেকে সুখী মানুষ মনে করেন কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে তাতুলি বলেন, ‘আমি যখন রাস্তায় বের হই এবং অভাবী মানুষদের দেখি, আমার নিজেকে অনেক সুখী মনে হয়’। উল্লেখ্য, জর্জিয়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হওয়া একটি দেশ যার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো নয়। মজাটা হচ্ছে, তাতুলিদের নিয়ে তাদের দেশের মিডিয়া কোনো উচ্ছ্বাস দেখায়নি যতদিন না আমেরিকান জার্নালে তাঁদের নিয়ে আর্টিকেল ছাপা না হয়েছে। এবং জর্জিয়ার পত্রপত্রিকা মান্দিলিকে নিয়ে নয়, নিউজ করেছিল আমেরিকান পত্রিকায় তাঁদের নিয়ে যে নিউজ বেরিয়েছে সেটা নিয়ে।

তাতুলি বলেন, ‘বিখ্যাত হওয়ার কোনো ইচ্ছেই আমাদের ছিল না। আমার বন্ধুরা যাতে ডাউনলোড করতে পারে সেজন্যই আমি ইউটিউবে পোস্ট করেছিলাম। এর তিনদিন পর দেখলাম এটা তিন লক্ষ ভিউ হয়ে গেছে।’ অন্য সবার মতো মান্দালিকে নিয়েও প্রচুর সমালোচনা করেছে লোকজন। তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাঁদের গানের মান শিল্পোত্তীর্ণ নয়—এরকম বলা হয়েছে। তাতুলি বিবাহিত, তাঁর সন্তান আছে—এমনও বলেছে লোকজন। যেগুলো পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তাতুলি বলেছেন মান্দিলি শুধু এই ফোক ধারাতেই গান করবে। অন্য কিছু গাইবে না। মান্দিলির গানগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো বাহুল্যহীন, সরল, আন্তরিক। শিল্পীত্রয় গাওয়ার সময় হাস্যঠাট্টা করেন। গানগুলো খুব সাধারণভাবে মোবাইলে ধারণকৃত এবং স্টুডিওর কৃত্রিম পরিবেশে নয়, প্রকৃতির মাঝে। পুরো পরিবেশনের সঙ্গেই এমন এক অনাড়ম্বর অকৃত্রিমতা আছে যা মানুষকে ছুঁয়ে যেতে বাধ্য।

এই গানগুলো প্রমাণ করে মানুষের কাছে নিজের কৃষ্টিকে পৌঁছে দিতে টিকটকের মতো বিকৃত অঙ্গভঙ্গি বা অন্যের গান বা সস্তা কৌতুকের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। যদি আপনার প্রতিভা এবং প্রচেষ্টা থাকে এবং সেটি যদি জেনুইন হয়, আপনার সাফল্য আসতে বাধ্য।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker