লাইফস্টাইলস্বাস্থ্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

ডিজাইনার বেবির আদ্যোপান্ত

এফ শাহজাহান: জেনেটিক্যালি মোডিফাইড হিউম্যান বা জিএম মানুষ তৈরির কারিগররা এখন বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছামত সৃষ্ট মানুষের গুন-বৈশিষ্ট্য চাল-চরিত্র পাল্টে দিয়ে মানুষের খেয়াল-খুশি মত আরেক মানুষ বানানোর এই খামখেয়ালিপনার বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয়েছে “ইউজেনিক্স”। মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটার আশংকায় ডিজাইনার বেবি জন্মানো নিষিদ্ধ হলেও এর কারিকুরি থেমে নেই। সম্প্রতি ভারতে প্রথম ডিজাইনার বেবি কাভ্যিয়া সোলাঙ্কিকে নিয়ে এই বিতর্ক আবার জমে উঠেছে। সেই সঙ্গে এই আশংকাও তৈরি হচ্ছে যে ডিজাইনার বেবি তৈরির এই অনৈতিক প্রবণতা শীঘ্রই মানবজাতির ধ্বংস ডেকে আনবে কি না ?

ডিজাইনার বেবি কী? সৃষ্টিকর্তার নিয়ম পাল্টে দিয়ে মানুষের ইচ্ছা অনুয়ায়ী খামখেয়ালিপনায় জন্মানো শিশুকে বলা হচ্ছে ডিজাইনার বেবি। সাহিত্যের ভাষায় এই বিষয়কে বুঝানোর জন্য আমি ‘ম্যানমেইড হিউম্যান’ টার্মটি ব্যবহার করি। এর সোজা বাংলা হচ্ছে মানুষের বানানো মানুষ। এর সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা হচ্ছে, প্রকৃতিগত গুণ-বৈশিষ্ট্য নিয়ে মানব শিশু জন্মানোর চিরাচরিত নিয়ম পাল্টে দিয়ে মানুষের প্রয়োজন ও ইচ্ছামত গুণ-বৈশিষ্ঠ্যের শিশু জন্মানো। এরকম শিশুকে জেনেটিক ইঞিনিয়ারিং এর ভাষায় বলা হচ্ছে ‌’ডিজাইনার বেবি’। এটার রিলিজিয়াস ব্যাখ্যা হিসেবে সোজা কথায় বলা যায় সীমা লঙ্ঘন।

ডিজাইনার বেবি কেনো? বংশ পরম্পরায় যেসব রোগ আমরা বহন করে থাকি ভ্রূণের জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে তা ঠেকানোর জন্য ডিজাইনার বেবি জন্মানোর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি ভারতে এরকম একটি মেয়ে শিশু জন্মানো নিয়ে বেশ বিতর্ক জমে উঠেছে। মরণব্যাধি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বড় ভাইয়ের জীবন বাঁচানোর জন্য বোনম্যারো প্রতিষ্থাপনের লক্ষ্যে পরিকল্পিত উপায়ে মায়ের পেটে ভ্রূণের জিনোম সিকোয়েন্স এডিট করে আরেকটি নতুন শিশু জন্মানো হয়েছে। তার নাম কাভ্যিয়া সোলাঙ্কি। তাকে বলা হচ্ছে ভাইয়ের জীবন রক্ষাকরী বোন। সেই জিএম শিশু বা ডিজাইনার বেবি কাভ্যিয়া সোলাঙ্কির জন্ম হয়েছে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে। এবছরের মার্চ মাসে, তার বয়স যখন দেড় বছর, তার দেহ থেকে অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করে সেটা তার সাত বছর বয়সী বড় ভাই অভিজিৎ-এর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। এরফলে অভিজিত সুস্থ হয়ে ওঠে। যে যুক্তিতে চলছে এই ভয়ংকর কারবার একজনকে বাঁচাতে আরেকজনকে পরিকল্পিতভাবে জন্মানোর একটি যুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দাঁড় করানো হচ্ছে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এটাকে অনৈতিক এবং মানব জাতির জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর বলছেন । কেন না, এটা যে কোন সময় মানবজাতি ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর আগে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম একটি মানব-সন্তান জন্মানোর দাবি করেছিলেন চীনা বিজ্ঞানী অধ্যাপক হি। সে সময় তার এই কাজ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। অধ্যাপক হি’র কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে লন্ডনের কিংস কলেজের স্টেম সেল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. ডুস্কো ইলিক বলেছিলেন, ‘এই ধরণের কাজকে যদি নৈতিক বলে আখ্যা দেয়া হয়, তাহলে তা হবে সারা দুনিয়ার প্রচলিত নৈতিক ধারণা থেকে একেবারেই ভিন্ন’।

মানব জাতির শেষ পরিণতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানব-ভ্রূণের জেনেটিক পরিবর্তন আনার এই বিষয়টি ব্যক্তি তথা মানব জাতির পুরো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর নানা দেশে ‘জেনেটিকেলি মডিফায়েড’ শিশু জন্ম দেয়াকে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। তারপরেও এই নিষিদ্ধ কাজ থেমে নেই। তলে তলে যা হচ্ছে ডিজাইনার বেবির প্রোজেক্ট বা সৃষ্টিকতার সৃষ্টি রহস্যের বিকৃতি ঘটানোর বিদ্যাটা তলে তলে অনেকদুর এগিয়েছে। আর সে কারণেই মায়ের জরায়ুতে ভ্রূণের জিনোম এডিট করে নিজেদের ইচ্ছামত গুন-বৈশিষ্ঠ্যের শিশু জন্মানোর প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

এবছর রসায়নে নোবেল প্রাইজও দেওয়া হয়েছে জিন সম্পাদনার ক্রিসপার-ক্যাস নাইন আনবিক কাঁচি আবিষ্কারক দুইজন বিজ্ঞানীকে। রসায়নে নোবেল প্রাইজের এই ঘটনাটিও প্রমাণ করছে যে, তলে তলে ম্যানমেইড মানুষ বানানোর নিষিদ্ধ কারবারকে আড়ালে আবডালে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি রহস্যের দিকে হাত বাড়ানো মানুষের এইসব বাড়াবাড়ি দেখে ভাবতেই হচ্ছে, মানব জাতির শেষ পরিণতি আর কতদুর?

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker