ক্রিকেটখেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

ডেল স্টেইন – ভীতি জাগানিয়া এক পেস বোলার

বোরহান উদ্দিন জাবেদ : স্টেইন – নামটা মস্তিষ্কে প্রবাহিত হতেই ফুটে উঠে বোলিং ধারাবাহিকতার অপরূপ ক্লাসিকাল সৌন্দর্যের ভীতি জাগানিয়া এক ফাস্ট বোলারের ছবি। ‘স্টেইন গান’ নামকরণে সেই ছবিটা আরেকটু আলোকিত দেখায়। আরেকটা ছবি নিশ্চয়ই উপলব্ধি হচ্ছে? আমরা যারা নব্বই দশকের বা তারও পূর্বের বোলারদের বোলিং সরাসরি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তখনকার বোলারদের নিয়ে স্মৃতিচারণা শোনার মাঝে ডেল স্টেইনের মাধ্যমে সেই স্মৃতির একধরনের আবহ খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি।

ক্রিকেট নব্বই দশক গড়িয়ে পা মাড়িয়েছে একুশ শতকে। সময়ের পরিক্রমায় একুশ শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি থেকে ক্রিকেটের গায়ে সেঁটতে
শুরু করে ‘আধুনিক ক্রিকেট’ তকমা। সেই আধুনিক ক্রিকেটের আলোচনায় যে নামটি অবশ্যম্ভাবী ভাবেই উচ্চারিত হয় সেটিই ডেল স্টেইন। টেস্ট ক্যারিয়ার শুরুর প্রথম সিরিজেই বাদ পড়েন দল থেকে। একই পথ অনুসরণ করেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারেও। বাদ পড়েন প্রথম সিরিজেই। কারণ অবশ্যই খারাপ পারফরম্যান্স।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন হয় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ দিয়ে। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেই ২.৭৬ গড়ে নেন পাঁচ উইকেট। তিন টেস্টের সিরিজে ২৬.০০ গড়ে শিকার করেন ১৬ উইকেট। পরবর্তী ৯২ ম্যাচে পাঁচ উইকেটের এই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন আরো ২৫ বার। ম্যাচে দশ উইকেট নিয়েছেন পাঁচ বার। প্রতি তিন ম্যাচ অন্তর নিয়েছেন পাঁচ উইকেট। ফাস্ট বোলারদের মধ্যে এই রেকর্ডে স্টেইনের উপরে আর মাত্র চারটি নাম। রিচার্ড হেডলি (১.৯১), ডেনিস লিলি(২.৩৩), অ্যালস বেডজার(২.৫৫), টেরি অল্ডারম্যান (২.৭৩), অ্যালান ডেভিডসন (২.৭৫)। তবে এখানে একটা বিষয় বলা রাখা ভালো। স্টেইন যে সময়ে খেলেছেন ‘ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি’ উইকেটে ব্যাটসম্যানের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছে, হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ২০১৫ সালে Is Dale Steyn the greatest fast bowler post WWII? নামক এক আর্টিকেলে গ্লেন ম্যাকগ্রা বলেন,

“One could make a very strong case for Steyn being best fast bowler post the Second World War, especially when you consider the abundant advantages afforded to batsmen in recent times.”

নিজেকে রূপান্তরিত করেছেন অভিজাত ফরম্যাটের আভিজাত্যপূর্ণ পরিসংখ্যানের রূপায়ণে। বাইশ গজে ব্যাটসম্যানের নাভিশ্বাস তুলে ব্যাটসম্যান স্বত্বার পরীক্ষা নিয়েছেন প্রতিনিয়ত। ৪৩৯ টেস্ট উইকেট সেটারই একটা প্রতিফলন। যে সংখ্যার সৌজন্য সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় ডেল স্টেইনের অবস্থান আট নাম্বারে। নিদিষ্ট করে ফাস্ট বোলারদের কথা বললে তিনধাপ উপরে উঠে অবস্থান পাঁচ নাম্বারে। প্রতি উইকেটের জন্য স্টেইনকে অপেক্ষা করতে হয়েছে মাত্র সাত ওভার অর্থাৎ ৪২ ডেলিভারি। এই পরিসংখ্যানের ৪২.৩ স্ট্রাইক রেট হিসেবে ডেল স্টেইন টেস্ট ইতিহাসের
সেরা( কমপক্ষে ৪০ টেস্ট এবং ১৫০ উইকেট)।

উপমহাদেশের উইকেটে কঠিন সময় পার করতে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলারদের। সেখানেও স্টেইন অনন্য। অক্টোবর ২০০৭ থেকে জুলাই ২০১৫ এই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘরের বাইরে টানা চৌদ্দটি সিরিজ জিতে। এর সাতটাতেই সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বোলারের নাম ডেল স্টেইন। পরিসংখ্যান বলে উপমহাদেশে ২২ টেস্টে ২৪.১১ গড়ে ৪২.৯ স্ট্রাইক রেটে স্টেইন নিয়েছেন ৯২ উইকেট। ইনিংস পাঁচ উইকেট পাঁচ বার। দশ উইকেট নিয়েছেন একবার। দ্বিতীয় স্থানে কোর্টনি ওয়ালশ ১৭ ম্যাচে ২০.৫৩ গড়ে ৪৫.২ স্ট্রাইক রেটে নিয়েছেন ৭২ উইকেট। ইনিংস পাঁচ উইকেট পাঁচ বার। তৃতীয় স্থানে থাকা গ্লেন ম্যাকগ্রা ১৯ ম্যাচে ২৩.০২ গড়ে ৫৪.৮ স্ট্রাইক রেটে নিয়েছেন ৭২ উইকেট। ইনিংসে পাঁচ উইকেট একবার।

একই পরিসংখ্যানের স্টেইনের সময়ের বোলারদের বিবেচনায় আনলে কেমন দেখা যায়? চলুন দেখা যাক। উপমহাদেশের উইকেটে স্টুয়ার্ট ব্রডের বোলিং গড় ৩৮.১৪ স্টাইক রেট ৮১.৬। মিচেল জনসনের বোলিং গড় ৪০.৩৬ স্ট্রাইক রেট ৮০। ক্যারিয়ার জুড়ে স্টেইনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী জিমি অ্যান্ডারসনের বোলিং গড় ৩১.২৫ স্ট্রাইক রেট ৭০.২।

স্টেইনকে বলা হয়ে থাকে জাত ম্যাচ উইনার। দলের জয়ে স্টেইনের ১৬.৬০ বোলিং গড় টেস্ট ইতিহাসের পঞ্চম সেরা (কমপক্ষে পঞ্চাশ উইকেট এবং বিশ জয়)।
সর্বপ্রথমে অবস্থান করছেন রিচার্ড হেডলি (১৩.০৬), দ্বিতীয়তে আছেন ইমরান খান (১৪.৫০), তৃতীয় ডার্ক আন্ডারউড (১৫.১৮) এবং চতুর্থ মুরালিধরন (১৬.১৮)।

যদি স্ট্রাইক রেটের প্রসঙ্গে আসি। তাহলে দলের জয়ে ডেল স্টেইনের ৩২.১ স্ট্রাইক রেট টেস্ট ইতিহাসের সেরা। পেছনে আছেন ওয়াকার ইউনুস(৩৫), অ্যালান ডোনাল্ড(৩৫.৫) এবং ইমরান খানের ৩৮.৩।

ডেল স্টেইন সেরার ছাপ রেখেছেন বোলিং র‍্যাঙ্কিংয়েও। ২০০৮ থেকে ২০১৪ এই সময়ে ২৬৩ সপ্তাহ টেস্ট বোলিং র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ছিলেন স্টেইন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মুত্তিয়া মুরালিধরন শীর্ষে ছিলেন ২১৪ সপ্তাহ। দিনের হিসেবে ২৩৫৬ দিন শীর্ষে অবস্থান করেছেন স্টেইন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে কোন বোলারের কাটানো সবচেয়ে বেশী সময়।

বিভিন্ন দশকের বোলারদের সাথে তুলনায় আমরা বর্তমান সময়ের বোলারদের একটু পিছিয়েই রাখি! কিন্তু পরিসংখ্যান পরিস্কার সাক্ষ্য দেয় এই সময়ের বোলার স্টেইনকে কেনো সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচনায় রাখতে বাধ্য! এই প্রসঙ্গে হার্শা ভোগলের একটা কথা মনে পড়ে,

“It is human nature to underrate the present and grossly overrate the past, but if you outlaw that trait, time has come to place Steyn among the greatest fast bowlers of the game.”

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker