বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

দাসপ্রথা ও মার্কিন গৃহযুদ্ধ!

আহমেদ রফিক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছিল তাদের গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধে অন্তত সাড়ে ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দুই বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ মিলিয়েও এত মার্কিন প্রাণ হারাননি।

দাসপ্রথার বিলুপ্তিকে কেন্দ্র করে ১৮৬১-১৮৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরদিকের ২১টি ও দক্ষিণদিকের ১১টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সংঘটিত হয় এই গৃহযুদ্ধ। দক্ষিণদিকে অবস্থিত দাসনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়ে আলাদা কনফেডারেট রাষ্ট্র তৈরি করলে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। 

দক্ষিণের এই অঙ্গরাজ্যগুলো ছিল মূলত কৃষিপ্রধান ও দাসনির্ভর। আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের ওপর তারা ভয়াবহ নির্যাতন করতো ও তাদেরকে দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করাতো।

এ নিয়ে ১৯ শতকের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক শুরু হয় এবং ১৮৫৪ সালে মার্কিন কংগ্রেস দাসপ্রথার বিরুদ্ধে আইন পেশ করে। ১৮৫৭ সালে সুপ্রিম কোর্টও দাসপ্রথাকে অবৈধ বলে মতপ্রকাশ করেন। 

দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে আফ্রিকান দাসরা পালিয়ে উত্তরে আশ্রয় নিতে থাকে। এটি ছাড়াও আরো অপ্রধান কয়েকটি বিষয় নিয়ে উত্তরের অঙ্গরাজ্যগুলোর সাথে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোর দূরত্ব বাড়তে থাকে।

১৮৬০ সালে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থানকারী রিপাবলিকান পার্টির আব্রাহাম লিংকন ক্ষমতায় এলে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় এবং দক্ষিণের সাত অঙ্গরাজ্য – সাউথ ক্যারোলিনা, মিসিসিপি, অ্যালাবামা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, টেক্সাস ও লুইজিয়ানা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেরা আলাদা একটি কনফেডারেট রাষ্ট্র গড়ে তোলে। 

উত্তরের বাকি ২১টি অঙ্গরাজ্য, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল, তাদের পরিচয় ছিল ইউনিয়ন নামে। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল সাউথ ক্যারোলিনায় কনফেডারেট বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন সেনাবাহিনী হামলা করলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

কয়েকমাসের মধ্যেই নর্থ ক্যারোলিনা, টেনেসি, ভার্জিনিয়া ও আলাস্কাও কনফেডারেটদের সাথে যোগ দেয়। ফলে কনফেডারেটে অঙ্গরাজ্য দাঁড়ায় ১১তে। এছাড়াও তাদের সমর্থন দেয় লুইজিয়ানা ও ম্যারিল্যান্ড।

যুদ্ধের প্রথমদিকে ইউনিয়ন বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তখন তারা তেমন প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারলেও ক্রমান্বয়ে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছায়। তাদের জনসংখ্যা ছিল অনেক বেশি, আর ছিল উন্নত প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থা।

ওদিকে দক্ষিণের কনফেডারেট রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো ছিল মূলত কৃষিপ্রধান ও তাদের অর্থনীতি ছিল উত্তরের তুলনায় দুর্বল। তারপরও অবশ্য তারা সর্বোচ্চ লড়াই চালিয়ে যায়।

চার বছরের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী অনেকগুলো লড়াইয়ের পর শেষপর্যন্ত ১৮৬৫ সালের ৯ এপ্রিল কনফেডারেট রাষ্ট্রগুলো আত্মসমর্পণ করলে অঙ্গরাজ্যগুলো আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একীভূত হয়। এই যুদ্ধের সময়ই ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গে আব্রাহাম লিংকন তাঁর বিখ্যাত “গেটিসবার্গ এড্রেস” দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন, 

“That (our) government of the people, by the people, for the people, shall never perish from the earth”

এই যুদ্ধেরই সূত্র ধরে কনফেডারেটের সমর্থক প্রতিশোধপরায়ণ মঞ্চাভিনেতা জন উইলকিস বুথ যুদ্ধ শেষের মাত্র পাঁচদিনের মাথায় ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে গুলি করে হত্যা করে।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker