বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

দ্য ইনহিউম্যান টম ক্রুজ!

ইসমাইল আহমেদ রুপন: ডিজনি অ্যানিমেশনের আলাদিন দেখা হয়েছে কখনো? ওখানে আলাদিন চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মত এবং জনপ্রিয় করবার জন্য অ্যানিমেটররা একজন অভিনেতার মুখাবয়ব এবং হেয়ারস্টাইলের সাহায্য নেন, সেই অভিনেতাটি হচ্ছেন টম ক্রুজ। আশির দশকের ঘটনা। বিখ্যাত সানগ্লাস কোম্পানি রে-বান এর বেচা-বিক্রীতে নেমেছিলো ভয়াবহ ধ্বস। আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হবার পথে ছিলো তারা। সে দশকেই মুক্তি পেলো টম ক্রুজের রিস্কি বিজনেস, টপ গান, রেইন ম্যান।

এই সিনেমাগুলোতে তিনি ব্যবহার করলেন রে-বান এর ওয়েফেরার সানগ্লাস। ৪০% শতাংশ বিক্রী বেড়ে গেলো কোম্পানিটির। বলা হয়ে থাকে, সেবার টম ক্রুজ একাই বাঁচিয়েছিলেন রে-বান এর মতো জায়েন্টকে। এমনই একজন ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ফ্যাশন আইকন তিনি। বলছিলাম রিস্কি বিজনেস সিনেমটির কথা। এই সিনেমার স্ক্রিপ্টে একটি দৃশ্যে এভাবে লেখা ছিলো যে প্রোটাগনিস্টকে শুধু আন্ডারওয়ার পরে বাড়িজুড়ে নাচাতে হবে। সেই চরিত্রে অভিনয় করা টম ক্রুজ পুরো দৃশ্যটা নিজের মত করে ইম্প্রোভাইজ করেছিলেন, যেটা বর্তমানে হলিউডের ওয়ান অফ দ্য মোস্ট আইকনিক সিনে পরিণত হয়েছে। অ্যাকশনে পারদর্শী টম ক্রুজ যে নাচতেও কম জানেন না সেটা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন আসস্ক্রিপটেড ইম্প্রোভাইজেশনে।

আয়রন-ম্যান চরিত্রের জন্য প্রাথমিকভাবে তার নাম শোনা গেলেও, রুঢ় বাস্তবতা হচ্ছে সে সময়ে টম ক্রুজকে এফোর্ড করার মতো অবস্থা ছিলো না তৎকালীন ভঙ্গুর মার্ভেল স্টুডিওস এর। বলা বাহুল্য, নিজের মুভিগুলো নিজেই প্রযোজনা করেন এখন। কারণ, তিনি যে লার্জার স্ক্লেলে ইনসেইন শুটিংগুলো করেন, সেই পাগলামিতে ভাগ বসানোর মত সাহস বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও নেই। পশ্চিমা বিশ্বে বাচ্চাদের খেলার উপকরণ হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে অ্যাকশন ফিগার। এবং এখন পর্যন্ত যে অভিনেতার অফিশিয়াল অ্যাকশন ফিগার বানানোর জন্য সর্বোচ্চ অনুরোধ করা হয়েছে, তিনি হচ্ছেন আমাদের এই টম ক্রুজ সাহেব। তার আদলে বানানো পুতুলগুলো কিনতে পাওয়া গেলেও, তিনি কোনো অ্যাকশন ফিগার বা তার ভিডিও গেইমস বানানোর অনুমতি এখনো দেননি।

মিশন ইম্পসিবল- রোগ নেইশনের শুটিং এর সময় নাকি পানির নীচে সাড়ে ছয় মিনিট শ্বাস বন্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। এক টেইকে সেই শট কমপ্লিট করেছিলেন। যেটা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে একদমই অসম্ভব। একটু গুগল করে দেখুন, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন। দ্য গ্র্যাহাম নর্টন শো’তেও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টম ক্রুজ। কখনো সিনেমায় স্টান্ট করতে গিয়ে মরতে বসেছেন, কখনো বা বেঁচে গিয়ে ইনজুরি’তে আক্রান্ত হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার অভিনয়ে আসার পেছনের কারণটাও ঐ ইনজুরিই। স্কুল টিমে রেসলার ছিলেন তিনি, ইনজুর্ড হয়ে ছিটকে পড়েন টিম থেকে। সেই অলস সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য নাম লেখা স্কুলের ড্রামা দলে। সেই থেকেই অভিনয় জীবনের শুরু।

অথচ, ডেয়ারডেভিল ঘরানার এই মানুষটা ঠিকঠাক মতো কোনো লেখাই পড়তে পারতেন না ডিসলেক্সিয়া রোগী হবার কারণে। আমির খান তারে জামিন পার মুভিটা বানিয়েছেন যে রোগের ওপর ভিত্তি করে, তেমনই একজন রোগী টম ক্রুজও। তবুও অদম্য এই মানুষটা ছুটে চলেছেন, ডিসলেক্সিয়া তাকে থামাতে পারেনি। দ্য লাস্ট সামুরাই সিনেমার শুটিং এর সময় নিজের গলাটাই হারাতে বলসেছিলেন। শুটিং এর জন্য মেশিনাইজড ঘোড়া ব্যবহার করা হলেও, সোর্ডগুলো ছিলো একদম রিয়াল। তিনি যে ঘোড়ায় বসে ছিলেন সেটা থেমে যায় হঠাৎ করে। ফলে সহ-অভিনেতা হিরোইউকি সানাডা যদি মুহূর্তের মধ্যে নিজের রিফ্লেক্স নিয়ন্ত্রণ করতে না পারতেন, তবে সেদিন টম ক্রুজের গলা কাটা যেত। দ্য জে লেনো শোতে বলেছিলেন, চালাতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছিলেন নিজের প্রথম মোটরসাইকেল

জীবনে প্রথম বাইসাইকেল যখন কেনেন তখন বয়স ছিলো মাত্র দশ বছর। সেটা চালাতেও পারতেন না। ১৯৯৮ সালের ঘটনা। সে সময় ছিলেন লন্ডনে। পাশের রাস্তাতেই এক মহিলার চিৎকার শুনতে পান। জানতে পারেন ঐ মহিলার প্রায় দেড় লাখ পাউন্ডের গহনা ছিনতাই হয়েছে। সেখান থেকে চেস করে ঐ ছিনতাইকারীদের ধরেন তিনি। আবারও প্রমাণ করেন স্টান্টবাজিতে তিনি অনস্ক্রিন অফস্ক্রিনে সমানভাবেই দক্ষ। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তার অভিনীত টানা পাঁচটি মুভি লোকাল বক্সঅফিসে ১০০ মিলিয়নের মাইলফলক ছুঁতে সক্ষম হয়। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম অভিনেতা হিসেবে এই রেকর্ড গড়েন টম ক্রুজ। তার আবেদন শুধু লোকালেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন গ্লোবাল সুপারস্টার।

২০০৬ সাল থেকে জাপান মেমোরিয়াল ডে এ্যাসোসিয়েশন প্রতিবছর ১০ই অক্টোবর টম ক্রুজ ডে হিসেবে পালন করে আসছে। ২০০৫ সালে, শুধুমাত্র তাকে দেবার জন্যেই এমটিভি এওয়ার্ডের নতুন একটি ক্যাটাগরি চালু করা হয়। ক্যাটাগরিটা হচ্ছে- “an artist who has shown us a variety of impressive roles, a personal and professional flair, and of course, an awesome level of talent” সর্বকালে সেরা অভিনেতাদের একজন পল নিউম্যান। তার খুব আদরের ছিলেন টম ক্রুজ। একসাথে গাড়ী ছুটিয়ে রেস করতেন তারা। কমার্শিয়াল মুভি করেন দেখে অনেকেই তার মেধাকে অগ্রাহ্য করে থাকেন। অথচ, স্ট্যানলি ক্যুব্রিক থেকে নিয়ে স্টিভেন স্পিলবার্গের মতো সর্বকালের সেরা পরিচালকদেরও প্রিয় পাত্র তিনি। একসাথে কাজও করেছেন তারা।

কলেজ এডুকেশনের খরচ যুগিয়েছিলো তার বড় বোন। নিজের আয়ে কেনা প্রথম স্পোর্টস কারটি তাই উপহার দিয়েছিলেন বড় বোনটিকেই। তার মা এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, টম ক্রুজ নাকি তাকে সাপোর্ট করার জন্য যেকোনো অড জব করে অর্থ উপার্জন করতো সেই ছোটবেলা থেকেই। ক্যাথোলিক পরিবারে জন্ম নেয়া টম ক্রুজ চেয়েছিলেন একজন ধর্মজাজক হতে। চার্চ অফ সাইন্টোলজির আজীবন সদস্য তিনি। যেটা নিয়ে রয়েছে বেশ কন্ট্রোভার্সি। তার অশেষ পাগলামির সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে, তিনি মহাকাশে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, টম ক্রুজ মহাকাশে শুটিং করবেন। নিশ্চিত করেছে নাসা কর্তৃপক্ষও। আর এমনটা হলে তিনিই হবেন ইতিহাসের প্রথম অভিনেতা যার অর্জন তাকে আক্ষরিকভাবেই পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। মাত্র ৫০০ ডলার পকেটে নিয়ে ওকলাহোমা ছেড়েছিলো যে স্মলটাউনার ছেলেটা, এখন তার নেট ওর্থ ৫৭০ মিলিয়নেরও বেশি।

যে মানুষটা এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং এ লাফ দিতে গিয়ে পায়ের গোড়ালি ভেঙে ফেলেন, তারপরেও সেই দৃশ্য কমপ্লিট করেন ভাঙা গোড়ালি নিয়েই। উড়ন্ত প্লেনের বাইরে ঝুলে থাকেন, চলন্ত প্লেন থেকে স্কাই ডাইভ দেন, নিজেই হেলিকপ্টার উড়িয়ে পাহাড়ের ওপর ভেসে বেড়ান, ১৬৩ তলা উঁচু বুর্জ খলিফা বেয়ে উঠতে ভয় লাগে না যার, উটাহ ক্যানিয়নের পাহাড় হাইক করেন নির্দ্বিধায়। গ্রীন স্ক্রিনে ভেল্কি দেখানো অভিনেতার ভিড়ে, সে মানুষটা বারবার নিজের জীবন বাজি রেখে লার্জার দ্যান লাইফ দৃশ্যগুলো উপহার দিয়ে যাচ্ছেন দর্শকদের, তার অন্তত একটা ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য। বাইক থেকে অ্যারোপ্লেন, সবখানেই তার জুড়ি মেলা ভার। তাই তো তাকে বলা হয় ওয়ান অফ দ্য গ্রেটেস্ট অ্যাকশন হিরো এভার।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker