আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণআলোচিত যারাহোমপেজ স্লাইড ছবি

পাবলো এসকোবার: ইতিহাসের কুখ্যাত মাদকসম্রাট

আরিফুল আলম জুয়েল: আজকে এমন একজনের কথা বলবো, যিনি নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সরকারও পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত! ক্ষমতার চূড়ায় থাকা অবস্থায় তিনি ছিলেন বিশ্বের ৭ম সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তি। তাকে বলা হতো সম্রাট। এই সম্রাটের আচরণ ছিল অনেকটাই বর্বর এবং পাশবিক। তার কোন শত্রুই তার হাত থেকে নিস্তার পেত না। ব্যবসায় তার প্রতিপক্ষ থেকে শুরু করে সাংবাদিক কিংবা সাধারণ মানুষ, যে-ই তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতো, তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে বিন্দুমাত্র হাত কাঁপতো না তার।

রাজনীতিবিদ আর পুলিশকে সমানে ঘুষ দেওয়া হতো। তার স্ট্র্যাটেজির নামই ছিল, ‘প্লাতা ও প্লোমো’ অর্থাৎ, ‘টাকা অথবা সীসা’। টাকা নেও অথবা সীসার বুলেটের আঘাতে পরপারে পাড়ি জমাও। তার চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল এই কালো টাকা তিনি সাধারণ, গরীব জনগণের পিছনেও খরচ করতে কার্পণ্য করেননি। নাম তার পাবলো এমিলিও এসকোবার গাভিরিয়া। কলম্বিয়ার সবচেয়ে ধূর্ত মাদক সম্রাটের নাম। কোকেন পাচারের ইতিহাসে এসকোবারকে ধরা হয় সবচেয়ে প্রভাবশালী, ধূর্ত এবং বিত্তবান।

কোকেনের মূল বাজার আমেরিকায়। আমেরিকায় কোকেন পাচারের জন্য এসকোবার গড়ে তুলেছিলেন ‘মেডেলিন কার্টেল’। এই চক্র ১৯৭০ এবং ৮০-এর দশকে বাইরে থেকে আমেরিকার ভেতরে ঢোকা মাদকের শতকরা ৮০ ভাগ যোগান দিয়ে গেছে। এই ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো মেডেলিন কার্টেলের, তার বস হিসেবে এসকোবারের। আয় হতো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। কলম্বিয়াসহ সবজায়গাতেই সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হতো, টাকা না নিতে চাইলে সীসার বুলেট তো রয়েছেই! মেডেলিন কার্টেল গঠিত হওয়ার এক দশকের মধ্যেই স্থানীয় ব্যবসা রূপ নিলো আন্তর্জাতিক এন্টারপ্রাইজে, যাদের দৈনিক আয় ছিল ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! ভাবা যায়, দৈনিক আয় ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার!৯০ এর দশকে এসকোবারের জ্ঞাত সম্পত্তির পরিমাণ ছিলো ৩০ বিলিয়ন ডলার।

এত টাকা ব্যাংকে রাখা সম্ভব না, রাখলে নানাবিধ আইনি ফ্যাকরা। তাই এসকোবার গোটা কলম্বিয়া জুড়ে গর্ত করে মাটির নীচে রেখেছিলেন কাড়ি কাড়ি ডলার। শুধু মাটির নীচে রেখেই ক্ষান্ত দিয়েছিলেন, ব্যপারটা এমন না। বিশ্বের নানাপ্রান্তে চার শতাধিক ম্যানসন, ব্যক্তিগত বিমান আর নিজস্ব একটা চিড়িয়াখানাও তার ছিল। সেই চিড়িয়াখানায় এনে রেখেছিলেন নানা পদের জানোয়ার। ১৯৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর কলম্বিয়ার মেডেলিনের পাশেই এক ছোট্ট শহর এনভিগালদোতে জন্মগ্রহণ করেন এসকোবার। কৃষক বাবা এবং স্কুলশিক্ষিকা মায়ের ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৩য় ছিলেন এসকোবার। তা-ই শৈশবকাল অভাবেই কেটেছে তার। কৈশোরে পদার্পণ করতেই মেডেলিনে আবাস গাড়ে এসকোবাররা, আর সেখান থেকেই শুরু হয় পাবলোর অপরাধ জগতে পদার্পণ।

কিংবদন্তী রয়েছে যে, শিশু পাবলো ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি মিলিয়নিয়ার হবেন। এবং তিনি হতাশও করেননি। কিশোর বয়সেই অপরাধজগতে হাতেখড়ি হয় এসকোবারের। শুরুটা হয়েছিলো কবরস্থানের নামফলক চুরির মাধ্যমে। কবরস্থানে যেসব কবরে আত্মীয়স্বজন কম আসতেন, সেসব কবরের নামফলক চুরি করতেন এসকোবার। নামফলক পরে ঘষে পরিস্কার করে বিক্রি করে দিতেন স্থানীয় ব্যবসায়ীর কাছে। সাথে উপরি হিসেবে ছিলো কবরে স্থাপন করা ভাস্কর্য। এগুলো বিক্রি হতো বেশ চড়া দামে। গাড়ি চুরি, নকল লটারির টিকিট বিক্রিসহ ছোটোখাটো অপরাধ করতে করতে পরবর্তীতে স্থানীয় গ্যাংস্টারদের দেহরক্ষী হিসেবেও কাজ শুরু করেন তিনি। এসময় কলম্বিয়াতে তৈরী সিগারেটের পাশাপাশি মার্লবোরো কোম্পানীর চোরাই সিগারেট বিক্রি হতো বাজারে। বাজারের আধিপত্যের গ্যাঁড়ায় ঢুকে পড়েন এসকোবার, হয়ে ওঠেন মূল চরিত্রদের একজন। মেডেলিনের এক স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাকে অপহরণ করে এক লক্ষ মার্কিন ডলার বাগিয়ে নেওয়ার পর মেডেলিনের অপরাধীদের কাছে নায়ক বনে যান পাবলো।

আর ঠিক সেই সময়েই কলম্বিয়াতে কোকেনের ব্যবসার শুরু হয়েছে মাত্র। আর যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের চাহিদা শুনে পাবলো তার পরবর্তী পরিকল্পনা ঠিক করলেন, কোকেন পাচারই হতে পারে তার মিলিয়নিয়ার হওয়ার প্রধান রাস্তা। এসকোবার ছোটভাবেই শুরু করলেন। ১৯৭৫ সালের কথা, বলিভিয়া থেকে কোকা পেস্ট আমদানি করে তার ভাইয়ের সাথে কোকেন বানানো শুরু করলেন। তারপর পুরনো প্লেনের চাকায় সেগুলো ভরে ছোট্ট একটা প্লেনে করে পানামায় পাচার করে আসতেন। প্রতিবার ৫ লক্ষ ডলারের কোকেন পাচার করলেও, বিমানবন্দরের অফিসারদেরকে প্রায় ৩ লক্ষ ডলার করে ঘুষ দিতে হতো।

সুতরাং, বেশি লাভের জন্য আরো বড় শিপমেন্ট পাচারের প্রয়োজন হয়ে পড়লো। প্রথম দিকে জাহাজের কার্গোতে করে ডলার আসতো কলম্বিয়াতে। কার্গোয় বিছানার জাজিমের ভেতর ছোবড়ার বদলে আসতো ডলার। দিন দিন পরিমাণ এতো বেড়ে যায় যে এই ডলার আনার জন্যে এসকোবার কিনে ফেলেন একটা লিয়ারজেট। একটা না আসলে অনেকগুলো গল্প প্রচলিত আছে এসকোবারের টাকা নিয়ে!শুনলে আপনার শুধু পিলে চমকাবে না, চোখ সত্যি সত্যি কপালে উঠে যাবে! এসকোবারের ডলারের বান্ডিল করার জন্য সারা মাসে ২৫০০ ডলারের শুধু রাবারব্যাণ্ড কিনতে হতো। এত টাকা ব্যাংকে রাখা যেতো না তাই বিকল্প হিসেবে ড্রামের ভেতরে বা ট্রাঙ্কের ভেতরে করে ডলার মাটিতে পুঁতে রেখেছিলেন এসকোবার। কোথায় কোথায় ডলার পুঁতে রাখা হচ্ছে এবং পরিমাণে কতো তার হিসেব রাখার জন্য একজন আলাদা লোক ছিলো। সেই লোকের কোডনেইম ব্ল্যাকবিয়ার্ড। বিখ্যাত পাইরেটের নামে নাম।

এসকোবারের বিপুল পরিমাণের ডলারের নাকি দশভাগ ইঁদুরে খেয়েছে অথবা জলে ভিজে নষ্ট হয়েছে। এসকোবারের পলাতক জীবনের কোনো এক সময় মেয়ের গা গরম রাখতে বাড়ির ফায়ারপ্লেসের কাঠের অভাবে কয়েক মিলিয়ন ডলার পোড়ানোর কাহিনীও শোনা যায়। মেডেলিনের পাহাড়ের উপর চোখে পড়বে ১২ হাজার লোকের মাঝারি আকারের এক জনবসতি, আর স্থানীয়রা এই এলাকার নাম রেখেছে পাবলো এসকোবারের নামে ‘ব্যারিও পাবলো এসকোবার’। আশির দশকে নির্মিত এই ইটের জনবসতিতে রয়েছে পানি আর ইলেক্ট্রিসিটির সুবিধা, রয়েছে স্কুল আর হাসপাতাল, এবং এক দশক ধরে বাড়ি ভাড়ার জন্য এই ১২ হাজার লোকের পকেট থেকে এক পেসোও খরচ করতে হয়নি। কারণ এর সব খরচ বহন করেছেন পাবলো এসকোবার, কলম্বিয়ার বিখ্যাত মাদক সম্রাট, কোকেনের রাজা, মেডেলিন কার্টেলের প্রধান, একজন বিলিয়নিয়ার, একজন খুনি, একজন দুর্নীতিবাজ, এবং ‘দ্য কলম্বিয়ান রবিন হুড’।

পাবলো বুঝতে পেরেছিলেন যে, মাদক পাচারের জগতে কোনোরকম দয়া দেখানোর সুযোগ নেই। এটা হলো ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’। আর এসকোবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ধারণা করা হয়, প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার লোকের হত্যার পিছনে এসকোবার দায়ী। তবে খুব কম সময়েই এসকোবার আরেকজনের রক্তে নিজের হাত রাঙাতো। এ কাজের জন্য তার আততায়ী দল প্রস্তুত ছিল। এসকোবার একবার দম্ভুভরে বলেই ফেলেছিলো—“মাঝেমধ্যে আমার নিজেকে ঈশ্বর মনে হয়। আমি যদি বলি কেউ মরবে, সে ঐদিনই মরবে।” তার কারণে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে কলম্বিয়ার ৩ জন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, ৩০ জন বিচারক, কয়েক ডজন সাংবাদিক এবং কম করে হলেও ৪০০ জন পুলিশ অফিসার। সমাজে অবস্থান যা-ই হোক না কেন, তুমি যদি এসকোবারের শত্রু হও, তোমার একমাত্র পরিণতি অকাল মৃত্যু। যতই জানি ততই অবাক হই; পাবলো এসকোবার কি করেননি তিনি! ধরা হয়, তার কোকেন ব্যবসার জন্য দৈনিক কম করে হলেও ২০ জন কলম্বিয়ান খুন হতো! প্রায় ৫ লক্ষ লোক তার এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি’-র উপর নির্ভরশীল ছিল।

তবে সবাই যে নিজের আগ্রহেই ঢুকেছিল এমনটি নয়। সাধারণ কৃষকদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো, যদি না তারা আশানুরূপ কোকেন উৎপাদন না করতে পারতো, এবং বেশিরভাগেরই এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। যেসব পুলিশ অফিসার আর রাজনীতিবিদ ঘুষ নিতে অস্বীকৃতি জানাতো, বেশিরভাগই মাথায় গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতো। ১৯৮৯ সালে, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী লুই কার্লোস গালান ঘোষণা করেন তিনি প্রেসিডেন্ট হলে কলম্বিয়া থেকে মাদকের ব্যবসা সমূলে উৎপাটন করবেন। তার কয়েকদিন পরেই গালানের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। এসকোবারের আদেশে গালানের উত্তরাধিকারী সিজার গ্যাভিরিয়াকেও খুন করার চেষ্টা করা হয়। গ্যাভিরিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানে বোমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ১০৭ জন যাত্রীর সবাই মারা যায়, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে গ্যাভিরিয়া সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

পরের বছরেই গ্যাভিরিয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, আর এসকোবারের শাসনের সূর্য অস্তমিত হতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র এবং কলম্বিয়া যৌথ উদ্যোগে তাকে ধরার জন্য ব্যবস্থা নেয়। ধরা পড়লে কলম্বিয়া সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিবে। কলম্বিয়ার এই আইন পরিবর্তনের জন্য এসকোবার রাজনীতিতেও নাম লেখায়, যদিও তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এতে ব্যর্থ হওয়ার পর এসকোবার ভিন্ন পদ্ধতিতে চেষ্টা করে, তিনি বলেন যে, কলম্বিয়ার আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ করে দিবেন, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! অবশেষে ১৯৯১ সালে, এসকোবার সরকারের সাথে চুক্তি করতে সমর্থ হয়।

এসকোবার নিজের তৈরি জেলখানায় ৫ বছরের জন্য আটক থাকবেন, যেখানে থাকবে ফুটবল পিচ আর বার, নিজের কারারক্ষী নিজেই ঠিক করবেন, আর পুরো জেলখানায় তিনিই একমাত্র আসামী! সরকার তাতেই রাজি হলো। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল সেই জেলখানা আসলে ব্যবহৃত হচ্ছে এসকোবারের বিরোধিতা করা লোকদের টর্চার সেল হিসেবে! তারপরে সরকার থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তাকে সাধারণ কারাগারেই বন্দী করা হবে। ধরা পরার ভয়ে এসকোবার পালালেন এবং লুকিয়ে রইলেন। তাকে ধরার জন্য সরকার প্রায় ২০০০ জনের বিশাল এক ‘সার্চ ব্লক’ টিম গঠন করলো। টিমের সবাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। লোকাল বিভিন্ন ইনফো থেকে শুরু করে এই দলে ছিলো ইলেকট্রনিক সার্ভেইল্যান্স টীম। ১৬ মাস পর রেডিও ট্রায়াঙ্গুলেশন টেকনোলজি ব্যবহার করে এসকোবারের রেডিওটেলিফোন ট্রান্সমিশন ধরতে সমর্থ হন টিম। দেখা গেলো এসকোবার দিব্যি লুকিয়ে আছে খোদ মেডেলিন এর লস ওলিভোস এলাকার মধ্যবিত্তদের থাকার জন্য বানানো এক কলোনীতে।

নিজের ৫৫তম জন্মবার্ষিকীর ১ দিন পর, সার্চ টিমের আনাগোনা টের পেয়ে কলোনীর ছাদ থেকে পালানোর সময় গুলি খেয়ে মারা যান এসকোবার। সাথে তার একমাত্র দেহরক্ষী লিমোনে। একটি গুলি লেগেছিলো তার পায়ে, একটি বুকে আর শেষটি হলো তার মাথায়। তবে এসকোবারের সঙ্গীসাথীদের মতে, শেষ গুলিটি এসকোবার নিজেই তার মাথায় করেছিলেন। কারণ তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জেলখানায় পচার চেয়ে বরং কলম্বিয়ার মাটিতেই শুয়ে থাকবো।”পরদিন কলম্বিয়ার জাতীয় সংবাদপত্রে শীর্ষ সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হলো, “কলম্বিয়ার নির্দয় মাদকসম্রাট আর নেই।”এসকোবারের মৃত্যু আদতেই পুলিশের বুলেটে হয়েছে নাকি পুলিশের গুলি খাবার পর এসকোবার নিজেই নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছেন- এটা আজো এক রহস্য!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker