প্রযুক্তিবিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

ফিল্ম এডিটিং এর ইতিহাস!

খুব সহজভাবে বলতে গেলে একটি শটের সাথে আরেকটি শট জোড়া দিয়ে সিকুয়েন্স সাজিয়ে একটা গল্পকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার টেকনিককেই ফিল্ম এডিটিং বলে। ফিল্মমেকিং করার বেলায় এই এডিটিং ব্যাপারটা অনেক বেশি জরুরী। তো আজ আমরা এই ফিল্ম এডিটিং-এর ইতিহাস সম্পর্কে কিছু তথ্য জানবো।

একদম শুরুতে সব ফিল্মই ছিল একেকটি শর্ট ক্লিপ, ক্যামেরাকে ট্রাইপডে বসিয়ে একটা পজিশন থেকেই ফিল্ম শ্যুট করা হত। সাধারণত সেসব ফিল্মে কোনো গল্প থাকতো না। লোকজন চলন্ত ছবি দেখেই অবাক হয়ে যেতো, যে এটা কিভাবে সম্ভব! ১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর প্যারিসের গ্র্যান্ড ক্যাফেতে সর্বপ্রথম কোনো কমার্শিয়াল ফিল্মের শো হয়। লুইস এবং অগাস্টে লুমিয়্যের নামে দুই ভাই মিলে Cinematographe নামে একটি ক্যামেরা-প্রজেক্টর সিস্টেম উদ্ভাবন করেন, আর সেখানে লুমিয়্যের ফ্যাক্টরি থেকে কিছু কর্মী হেঁটে বের হয়ে যাচ্ছে -এমন একটি দৃশ্য দেখানো হয়।

দর্শক সারিতে সেদিন উপস্থিত ছিলেন Georges Méliès নামে একজন ম্যাজিশিয়ান। তিনি সেই Cinematographe যন্ত্রটি কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু লুমিয়্যের দুই ভাই তাকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করে এবং তাদের যন্ত্রটি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়। Méliès তখন Animatograph নামে একটি ব্রিটিশ টেকনোলজির প্রজেক্টর মেশিন কিনে তার নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে একটি নিজস্ব ক্যামেরা বানিয়ে ফেলেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে Méliès তার ক্যামেরা দিয়ে ফিল্ম বানিয়ে সেটা তার যাদুর শো-এর মাঝে দেখানো শুরু করেন।

১৮৯৬ সালে একদিন Méliès তার ক্যামেরা দিয়ে প্যারিসের রাস্তায় একটি চলন্ত বাসের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করছিলেন। কিন্তু মাঝপথে তার ক্যামেরা আটকে যায়। যখন ক্যামেরা চালু হয় ততক্ষনে বাস চলে গেছে এবং সেখানে অন্য একটি গাড়ি (Hearse) চলে আসে। যখন ফিল্মটি ডেভেলপ করতে যান তখন Méliès লক্ষ্য করেন দৃশ্যটি এমনভাবে এসেছে যে – একটি বাস টানেল থেকে বের হল, তারপর নাই হয়ে গেলো এবং অন্য একটি গাড়িতে রুপান্তরিত হল। এভাবেই শুরু হয় প্রথম Jump Cut । এই Jump Cut পদ্ধতি পরবর্তীতে ফিল্মমেকিং-এ কোনো কিছু ভ্যানিশ করে অন্য কিছুতে রুপান্তরিত করার এফেক্ট হিসেবে ব্যবহার হওয়া শুরু হয়।

চার্লি চ্যাপলিন-এর মুভিগুলোতে এই ধরণের এফেক্ট অনেক বেশি পাবেন। একই টেকনিকে কাজে লাগিয়ে Fade in- Fade out, Overlapping Dissolve, Stop-motion photography ইত্যাদি ব্যাপারগুলো চলে আসে। আস্তে আস্তে শুধু চলমান ছবি থেকে কন্টেন্ট নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। ১৯০২ সালে Méliès নির্মাণ করেন A Trip to the Moon, যেটিকে প্রথম সায়েন্স ফিকশন মুভি ধরা হয়। অপরদিকে আমেরিকার Edwin S. Porter নামে এক ভদ্রলোক এডিসন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে ১৯০০ সালে যোগদান করেন এবং তিনি এডিসনের নিউইয়র্ক স্টুডিও প্রধান হিসেবে ফিল্মমেকিং শুরু করেন।

তিনি ১৯০৩ সালে ‘Life of an American Fireman’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। Edwin যেটি করেছিলেন তা ছিল – উনি কিছু স্টক ফুটেজকে জোড়া লাগিয়ে একটি কাহিনী তৈরি করেন। আগে প্রতিটি দৃশ্য একেকটি নির্দিষ্ট ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলতো, ঘটনা শেষ হবার আগ পর্যন্ত ক্যামেরা থামতো না। তারপর একই ঘটনাকে কয়েকটি ভাগে ভেঙে বিভিন্ন পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে দেখানো শুরু হয়। ফিল্মমেকিং-এর এই উন্নতিগুলো তখনকার লোকজন ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, তাদের জন্য সেগুলো ছিল কেবল চলমান ছবি। এরপর তিনি ‘The Great Train Robbery’ মুভিতে সিনেম্যাটিক আরো কিছু উন্নয়ন করেন।

১৯০৮ সালে David Wark Griffith তার বানানো Greaser’s Gaultlet মুভিতে সর্বপ্রথম Cut-in এর ব্যাবহার করেন। সেখানে একটা লং শট থেকে কাট করে একই দৃশ্যের একটি ফুলশটে চলে যান। এরপর বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে Continuity Editing, 180 Degree Rule, Intercutting, Cross Cutting টেকনিকগুলো তার After Many Years (1908), The Lonely Villa (1909) ইত্যাদি মুভিতে ব্যবহার করেন। তার এসব টেকনিক কপি করে কিছুটা পরিবর্তন করে পরবর্তীতে Establishing Shot, Reverse Shot, Matching Eyelines, Cutting on Action কন্সেপ্টগুলো আসে।

১৯১৫ সালে Griffith তার সারাজীবনে উদ্ভাবিত সব টেকনিক কাজে লাগিয়ে সিনেমার ইতিহাসে সর্বপ্রথম ব্লকব্লাস্টার ফিল্ম ‘The Birth of a Nation’ নির্মাণ করেন। পরে অবশ্য রেসিজম অভিযোগের কারণে তার মুভিটি ব্যান করা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে রাশিয়াতে ‘মস্কো ফিল্ম স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কারণ ছিল তখন ফিল্মমেকিং জানা লোকজনের বেশিরভাগই ছিল বামপন্থী। এই ফিল্ম স্কুলের কাজ ছিল লোকজনদের ফিল্মমেকিং শেখানো যাতে তারা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন কার্যকালাপ ফিল্ম আকারে বানিয়ে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। পরবর্তীতে রাশিয়ানরা Griffith-এর বানানো Intolerance (1916) মুভিটি নিয়ে ১০ বছর গবেষণা করে।

Kuleshov-এর হাত ধরে Creative Geography কনসেপ্ট আসে। দুটি ভিন্ন জায়গার ধারণকৃত ছবিকে একই দৃশ্যে পরপর কেটে বসিয়ে একধরণের ফেইক আবহাওয়া সৃষ্টির টেকনিক এটি। এভাবে কাটিং টেকনিক ব্যবহার করে টাইম এবং স্পেসের ব্যবধানকে ফিল্মমেকাররা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পদ্ধতি পেয়ে যান। ১৯২৫ সালে Sergio Eisenstein -এর বানানো ‘Battleship Potemkin’ চলচ্চিত্রের এডিটিং স্টাইলের কারণে সেটি সেসময় বেশ সাড়া ফেলে।

১৯৬০ সালে Alfred Hitchcock-এর বানানো Psycho আজও ফিল্মমেকারদের জন্য উপহার এবং সোভিয়েত Montage Editing -এর উন্নত সংস্করণ। তারপর থেকে খুব দ্রুত কয়েকজন ফিল্মমেকার বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করে এখনো বিভিন্ন এডিটিং টেকনিক বানিয়ে যাচ্ছেন। এসব বিষয় আরো বিস্তারিত জানতে হলে বিশ্বের বিভিন্ন ফিল্মমেকারদের কাজ দেখতে হবে।

  • তাহশিকুল ইসলাম

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker