জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

বজ্রপাত ও ম্যাগনেটিক পিলার নিয়ে যত ভুল ধারণা

মাসুদ আলম: তথাকথিত ম্যাগনেটিক পিলার সমন্ধে বাংলাদেশের অনেক মানুষের মাঝে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। অনেক শিক্ষিত মানুষও এগুলো সমন্ধে নানান ধরনের বানোয়াট কথা বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন। তাই আমার মনে হয়েছে এই ভুল ধারনা গুলো সবারই পরিহার করা দরকার।

সর্বপ্রথমে খুব সংক্ষেপে জেনে নেই যে আর্থিং কি?

Earth (আর্থ) মানে হলো পৃথিবী। পৃথিবী বলতে মাটি ভূগর্ভ পাহাড় সাগর নদী বন গাছপালা মরুভূমি ইত্যাদি সব। আর আর্থিং (earthing) মানে হলো পৃথিবীর সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া। পৃথিবী একটি বিশাল গ্রহ, এটি প্রায় সব কিছুই হজম করতে পারে। পৃথিবী জুড়ে বজ্রপাতের সময় লাখ লাখ ভোল্টের লাখ লাখ ছোট বড় বজ্র বিদ্যুৎ একসাথে পৃথিবীতে পতিত হয় কিন্তু পৃথিবীর কোন ক্ষতি হয়না। কেন হয়না?- কারণ পৃথিবীর আছে অসীম সহ্য ক্ষমতা, যেটাকে ইংরেজিতে বলে Resistance (রেজিস্ট্যান্স)। পৃথিবীর প্রতিটা জিনিসে রেজিস্ট্যান্স আছে, মানে প্রতিটা জিনিসের ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে  সেটা বিদ্যুৎ প্রবাহকে বাঁধা দেয়, কম অথবা বেশি। একটি জিনিস বা বস্তু যতো বড় এবং ঘন হবে তার বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা (resistance) এবং সহ্য ক্ষমতা (tolerance) ও বেশি। সুতরাং পৃথিবী অনেক বড় এবং অনেক ঘনত্ব বিশিষ্ট একটি বস্তু তাই এটা বিলিয়ন বিলিয়ন ভোল্টের বজ্র বিদ্যুৎ একসাথে আসলেও এর কোন ক্ষতি হয়না, সহ্য করতে পারে।

একটা উদাহরণ দেইঃ একটি ১০ হাত লম্বা কলমের মতো চিকন তারে যদি ২২০ ভোল্টের বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে যদি অপর প্রান্তে আপনি স্পর্শ করেন, তাহলে আপনি শক্ (Shock) খাবেন। কিন্তু একহাজার হাত লম্বা এবং তেলের ড্রামের মতো মোটা সলিড কোন দন্ডের একমাথায় ২২০ v সংযোগ দিয়ে শেষ মাথায় আপনি যদি স্পর্শ করেন তাহলে আপনি কোন শক্ ই অনুভব করবেন না। তাহলে এই বিদ্যুৎ গেল কোথায়? আসলে এই বিদ্যুৎ শেষ মাথায় পৌঁছাতে পারেনা কেননা বিশাল পরিবাহী হওয়ায় এর রেজিস্ট্যান্স বা বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। পৃথিবীর (Earth) ক্ষেত্রে  বিষয়টিও এভাবেই চিন্তা করতে পারেন। সুতরাং আর্থিং মানে হলো- অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বা বজ্র বিদ্যুৎকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া যাতে স্বাভাবিক কাজ বা নিয়মের কোন ক্ষতি না হয়। এটি একটি নিরাপত্তা সরঞ্জাম (Switchgear)।

ম্যাগনেটিক পিলাগুলো কিসের তৈরি?

লোহা তামা পিতল টাইটানিয়াম ধাতব পদার্থ গুলো বিভিন্ন অনুপাতে যুক্তকরে ছাঁচে ঢেলে তৈরি করা হয়েছে এই পিলার গুলো। এতে ধাতব ম্যাগনেট বা ধাতব চুম্বক মিলানোর বিষয়টি একটি মুখরোচক গল্প মাত্র। প্রাকৃতিক পরিবেশে, বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন খনিতে কালো রংয়ের একধরনের পাথর পাওয়া যায় যেগুলোতে চৌম্বকের কিছু গুণাবলি দেখা যায়। এই পাথর গুলোকে বলে লোডস্টোন (Lodestone) বা খনিজ চুম্বক বা প্রাকৃতিক চুম্বক। এগুলোর চৌম্বকত্ব খুবই দূর্বল। এবং এই পাথরটি অন্যান্য ধাতব পদার্থের সাথে গলিয়ে ম্যাগনেটিক পিলার তৈরি করার বিষয়টি যুক্তিযুক্ত নয়। হযরত ঈসা আঃ নবীর জন্মের প্রায় ৬০০ বছর পূর্বে গ্রীসের আনাতোলিয়া’র (বর্তমান তুরস্কের পশ্চিম অংশ) ম্যাগনেসিয়া (magnesia) নামক এলাকায় থ্যালেস অব মেলিতাস (Thales of Miletus) নামের একজন দার্শনিক প্রথম এর সন্ধান দেন বা আবিষ্কার করেন।

 ম্যাগনেটিক পিলার কি বজ্রপাতের সময় আর্থিং হিসেবে কাজ করে?

বজ্রপাতের সময় এই ধাতব দন্ড বা পিলারটি আর্থিং হিসেবে কাজ করতে কোন ভূমিকা রাখেনা। কারণ এই পিলার গুলো মাটির কয়েক ফুট নিচে পোঁতা আছে। (যদিও বৃটিশ আমলে এগুলোর মাথা দৃশ্যমান করে পোঁতা হয়েছিল।) এগুলো যদি আর্থিং হিসেবে কাজ করতো তাহলে এর আকারে এবং গঠনে পরিবর্তন আনতে হতো। যেমন এগুলোকে আরো লম্বা করে মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করিয়ে ভেজা অংশে ঢুকানো হতো এবং সেটার সাথে কোন মোটা তার যুক্ত করে বিদ্যুতের খাম্বার মতো অনেক উচুঁতে উঠিয়ে রাখতে হতো। এবং তারটি অবশ্যই কম রেজিস্ট্যান্সের কোন ধাতব যেমন- খাঁটি তামা (Copper) দিয়ে তারা তৈরি করতো।

 ব্রিটিশরা এমন পিলার স্থাপন করেছিল কেন?

সে সময় এই বাংলা অঞ্চলটি ছিল বৃটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্তর্গত এলাকা। তখন ছিল জমিদারি প্রথা এবং ভূমির খাজনা আদায় ছিল জমিদারদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। তাই বৃটিশরা- খাজনা আদায়, নিখুঁত ভূমি বন্টন, নিখুঁত সীমানা নির্ধারণ এবং ভূমি জরিপ ইত্যাদির সুবিধার্থে মৌজা গুলোরবসীমানা এসব পিলার পুঁতে স্থায়ী ভাবে নির্ধারণ করে দেয়। যেহেতু এগুলো যুগযুগ ধরে মাটির নিচে থাকবে তাই এগুলোকে মরিচা রোধী করতে বিভিন্ন ধাতুর মিশ্রণে (এলয়) তৈরি করা হয়েছে। এলয় ধাতু হওয়ায় এগুলোর গলনাংক অনেক বেশি ফলে চুরি করে নিয়ে এগুলো দিয়ে অন্য কিছু বানানো তখনকার সময় সম্ভব ছিলনা। বৃটিশরা এটাও ভেবেছিল যে- এগুলো মাটির অনেক গভীরে চলে গেলেও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে এগুলোর অবস্থান সনাক্ত করা সম্ভব হবে। (এগুলোর নিজস্ব কোন ফ্রিকোয়েন্সী বলে কিছু নেই। ফ্রিকোয়েন্সী মেপে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর এগুলো বসানোর বিষয়টি একেবারেই মিথ্যা এবং পিলারের সাথে ফ্রিকোয়েন্সীর বিষয়টি একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।) আর প্রজাদের জমির অস্থায়ী সীমানা গুলোতে একজাতের বহুবর্ষজীবি ঘাস লাগিয়ে দিত। যেগুলো যুগযুগ ধরে পানি বৃষ্টি খরা সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে। (ফুলঝাড়ু ঘাস, আমাদের চাঁদপুর জেলার মতলব থানার মোহনপুর গ্রামে এগুলোকে চেঙ্গামুড়া নামে চিনে)

বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ কি?

 বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পূর্ণভাবে পরিবেশগত বিষয়। এতে ম্যাগনেটিক পিলার না থাকা বা এতে মানুষের কোন হাত নেই। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে গত দুই দশক ধরে পৃথিবী জুড়ে ক্রমেই বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। নাসা’র (NASA) হিসাব মতে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় উগান্ডার লেক ভিক্টোরিয়া এলাকায়, গড়ে বছরের ২৪২ দিনই সেখানে বজ্রপাত হয়। ভেনিজুয়েলার   লেক মারাকেইবো (Lake Maracaibo) এলাকায় প্রতি ১ বর্গ কিঃমিঃ এলাকায় বছরে গড়ে ২৩৩ বার বজ্রপাত হয়। তবে সংখ্যার হিসেবে সবচেয়ে বেশি এবং ভয়াবহ বজ্রপাত হয় আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো’তে। (শুধু কঙ্গো আলাদা আরেকটি দেশ) পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ ১০ টি শহরের মধ্যে ৫ টি শহরই ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো’র। বাকি পাঁচটি শহরের মধ্যে ২ টি কলম্বিয়া’র, একটি পাকিস্তানের, ১ টি ভেনিজুয়েলা’র এবং ১ টি ক্যামেরুনের শহর। তালিকার ১০০ শহরের মধ্যেও বাংলাদেশের কোন শহরের নাম নেই। বজ্রপাতের ঘটনা গুলো নাসা’র আবহাওয়া বিষয়ক স্যাটেলাইট (Meteorologycal Satellite) দ্বারা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং রেকর্ড রাখা হয়।

বজ্রপাতে এখন বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে কেন?

আমার মতে, গত এক দশকে বজ্রপাতের কারণে বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যু বেশি হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ হতে পারে। তারমধ্যে প্রধানতম কয়েকটি হলো- ক) দেশ জুড়ে বহুবর্ষজীবি উঁচু গাছের পরিমাণ ব্যাপক ভাবে কমে যাওয়া, যেমন তাল নারিকেল দেবদারু ইত্যাদি গাছ কমে গেছে। আগে গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়িতে, পুকুরের আইল, সড়কের পাশে এবং বিলেও প্রচুর তালগাছ এবং উঁচু দেবদারু গাছ দেখা যেত। যেগুলো বজ্রপাতের সময় ‘ লাইটনিং এ্যারেস্টার’ এর মতো কাজ করতো। অর্থাৎ উঁচু গাছ গুলো বজ্রপাতকে “আকর্ষণ” করে মাটির অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দিতো (এখনো দেয়)।

খ) মানুষ বেড়েছে। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মানুষের ঘনত্বও বেড়েছল, অর্থাৎ পুরো দেশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হয়েছে। সুতরাং যেখানেই বজ্রপাত হোক, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি তো কিছুটা হবেই। গ) এখন নিমিষেই মৃত্যুর খবর দ্রুত জানা যাচ্ছে, ফলে মনে হয় যেন বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার বেড়েছে। তুলনামূলক কম হলেও ৩০-৪০ বছর আগেও অনেক মানুষ মারা যেত যেগুলোর ৯৯% ই সংবাদ মাধ্যমে আসতোনা। এমনকি দুই তিন কিলোমিটার দূরের গ্রামে কেউ বজ্রপাতে মারা গেলেও খবর পাওয়া যেত তিন চার দিন পর!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker