বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

বিজ্ঞাপন ও রবীন্দ্রনাথ

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী: ১৮৮৯ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ অংশ নিয়েছেন। এই ৫০ বছরে তিনি কমবেশি ৯০টি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন। বিদেশি ছায়াছবিতে বিজ্ঞাপিত হয়েছিলেন। সরাসরি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনে ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছেন বহুবার। পণ্যের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন কলকাতার তৎকালীন মাসিক ‘পূরশ্রী’ পত্রিকার সম্পাদক অরুণ কুমার রায়। কবিগুরু বিজ্ঞাপনের জন্য অজস্র অটোগ্রাফ দিয়েছেন, উপস্থিত থেকেছেন লেকচার কিংবা ডিনারে। বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার উদাহরণও আছে কবিগুরুর।

‘রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞাপন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় একবার ‘ভারত’ ব্লেড সংস্থা তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য কবির কাছে গেলে তিনি তার শ্বেতশুভ্র, দীর্ঘ দাড়িতে সস্নেহে হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলেন, “এই দাড়ি নিয়ে আমি যদি বিজ্ঞাপন করি তাহলে কেউ কি তোমাদের ব্লেডের ধারে আস্থা রাখবে? না আমাকে করবে বিশ্বাস?” আবার একই ধরণের পণ্যের দুই কোম্পানির বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। বন্ধু হেমেন্দ্র মোহন বোসের অনুরোধে সুলেখা কালির বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে লিখেছিলেন, “সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।”

ঐ সময় সুলেখা কালিকে বিদেশি কোম্পানীর কালি পার্কারের এবং শেফার্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো। আবার একই রবীন্দ্রনাথ ‘কাজলকালি’র বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে লিখেছেন, “কাজলকালি ব্যবহার করে সন্তোষ লাভ করেছি, এর কালিমা বিদেশি কালির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।” একদিকে সরকারী রেলের বিজ্ঞাপনে যেমন কবির কবিতা ব্যবহার করা হয়েছে, ঠিক তেমন বিদেশি “কে এল এম রয়াল ডাচ” এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপনেও ব্যবহার করা হয়েছে এই কোম্পানীর বিমান যাত্রায় কবিগুরুর সন্তুষ্টিপত্র। পূর্ব ভারতীয় রেলওয়েতে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কবির শ্যামলী কাব্যের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার প্রথম দুলাইন- ‘রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবিনি সম্ভব হবে কোনো দিন।’ কবিসত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রেখেও কবি লিখেছেন কোনো কোনো বিজ্ঞাপন। যেমন ‘লিপটন চা’-এর বিজ্ঞাপনে কবি রবীন্দ্রনাথকেই খুঁজে পাওয়া যায়। লিপটনের বিজ্ঞাপনে তিনি লিখেছিলেন, ‘চা-স্পৃহ চঞ্চল/ চাতকদল চল/কাতলি-জল তল/কলকল হে…’ ১৯২১ সালে দেশী কোম্পানীর উৎপাদিত গোদরেজ সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে কবির শ্মশ্রুমণ্ডিত ছবি। যেখানে কবি লিখেছেন, ‘I know of no foreign soaps better than Godrej’s and I will make a point of using Godrej’s soap.’ ‘গোদরেজ সাবানের অপেক্ষা ভালো কোনো সাবান আমার জানা নাই। আমি ভবিষ্যতে শুধু এই সাবানই ব্যবহার করিব স্থির করিয়াছি।’ আবার একই কোম্পানীর সব পণ্যের বিজ্ঞাপন কবি লিখেছেন একসঙ্গে।

বাঙালি ব্যবসায়ী হেমেন্দ্রমোহন বোসের কোম্পানীতে তৈরি হতো মাথায় মাখা তেল, পান মশলা এবং সুগন্ধি।দীর্ঘ বছর ধরে সাবান, স্নো, পাউডারের মতো প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে আমরা নারীর উপস্থিতি দেখতে অভ্যস্ত হলেও রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া গেছে এসব বিজ্ঞাপনে। কারণ তার সময়ের সুপার মডেল তিনি। ১৩৫২ বঙ্গাব্দে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই কোম্পানীর বিজ্ঞাপনে কবি লিখেছিলেন, কেশে মাখো ‘কুন্তলীন’। রুমালেতে ‘দেলখোস’। পানে খাও ‘তাম্বুলীন’। ধন্য হোক এইচ বোস। কলকাতার রেডিয়াম ল্যাবরেটরির উৎপাদিত রেডিয়াম ক্রিমের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘রূপচর্চার জন্য স্নো ও ক্রিমজাতীয় প্রসাধন যারা ব্যবহার করেন, তারা রেডিয়াম ফ্যাক্টরির তৈরি ক্রিম ব্যবহার করে দেখুন, বিদেশি পণ্যের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবেন না।’

অবশ্য এই বিজ্ঞাপন নিয়ে একটা মজার গল্পও আছে। ১৯৮১ সালে ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী সাধারণ সংখ্যায় শকুন্তলা রায়ের একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, একবার ঢাকা থেকে কবিগুরুর কাছে ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার জন্য লেখা আনতে গেলে কবিগুরু খুব ক্লান্ত এবং লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদেরকে লেখা দিতে পারেননি।তবে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথ, ‘খালি হাতে ফিরে যাবে!- এই বলে এক বাক্স রেডিয়াম স্নো তাদের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, এটা সবাই মিলে মেখো। আমি তো এসব ব্যবহার করি না।’ তখন রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করা হয়- আপনি নিজে না মাখলে কেন ওদের বিজ্ঞাপনে লিখে দিয়েছেন? ব্যবহার না করে লিখলেন কি করে! তখন রবীন্দ্রনাথ হেসে তাদেরকে উত্তর দেন, ‘দুটো লাইন লিখে দিলে আমার ভিক্ষের ঝুলিতে কিছু টাকা পাওয়া যাবে যে! অনেক কোম্পানি তাকে তাদের উৎপাদিত পণ্য পাঠাত কবির ঠিকানায় এবং তিনি উদার হস্তে চিঠি লিখে তাদের প্রশংসা করতেন, সেগুলিকেই পরে কোম্পানীগুলো ব্যবহার করতো বিজ্ঞাপন হিসেবে। এতে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। অনেক কোম্পানী তাদের পণ্যের প্রসারের জন্য সেগুলোকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যবহার করেছে। কেশোরাম কটন মিলের তৈরি শাড়ি, লং ক্লথ, টুইল, তোয়ালে বিষয়ে লেখা তার চিঠি স্বাক্ষরসহ সম্পূর্ণ ছেপে দিয়ে, নীচে লেখা হয়েছিল, ‘পূজায় এই কাপড় কিনিবেন, বেঙ্গল স্টোর্সে পাওয়া যায়।’

ব্রিটেনের তৈরি ‘বোর্ন-ভিটা’র বিজ্ঞাপনে কবির ছবির পাশে তার স্বাক্ষরিত একটা লাইনে পণ্য সম্পর্কে কবি লিখেছেন, ‘বোর্ন-ভিটা সেবনে উপকার পাইয়াছি।’রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ‘জলযোগ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ এর জন্যও লিখেছেন বিজ্ঞাপন। ঐ বিজ্ঞাপনে তিনি লেখেন, ‘জলযোগের বানানো মিষ্টান্ন আমি চেখে দেখেছি। এটা আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে। এর আলাদা স্বাদ আছে।’ ঘিয়ের বিজ্ঞাপনেও আমরা পাই কবিগুরুকে। কলকাতায় তৈরি শ্রীঘৃত সম্পর্কে তিনি লেখেন, ‘বাংলায় ঘিয়ের ভেজাল বাঙালির অন্ত্রের ভেজালকেও অনিবার্য করে তুলেছে। আশা করি শ্রীঘৃত বাঙালির এই ভেজাল রোগের প্রতিকার করবে।’সে সময়ের স্টুডিও এস ঘোষের বিজ্ঞাপনে কবিগুরুর ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেখানে কবি লিখেছিলেন, ‘এস ঘোষ আমার যে দুটি ফটোগ্রাফ তুলেছেন তা অতি সুন্দর ও সুনিপুণ। দেখে আমি বিস্মিত ও সন্তুষ্ট হয়েছি। তাদের ব্যবসায়ে তারা যে যথেষ্ট সফলতা লাভ করবেন তাতে আমার সন্দেহ নেই।’ তবে সত্যি সত্যি কবি ঐ স্টুডিও থেকে ছবি তুলেছিলেন কিনা তার বিবরণ পাওয়া যায়নি।

হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইনস্যুরেন্সের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের গানের একটা কলি এবং একটি উপদেশসহ তার ছবি দেখা যায়। ‘হে নূতন, তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন সূর্যের মতন’-গানের এই লাইনটার সঙ্গে তার উপদেশের এই লাইন ‘লক্ষ্মীর অন্তরের কথাটি হচ্ছে কল্যাণ, সেই কল্যাণের দ্বারা ধন শ্রীলাভ করে। কুবেরের অন্তরের কথাটি হচ্ছে সংগ্রহ, সেই সংগ্রহের দ্বারা ধন বহুলত্ব লাভ করে’ যোগ করে কবিগুরুর নাম দিয়ে প্রকাশ করা হয়। শুধু মডেল রবীন্দ্রনাথ নয়, তার সময়ে তিনি কতটা প্রভাবশালী এবং তার সমর্থনের গুরুত্ব কতটা ছিল সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় আরেকটি বিজ্ঞাপনে।১৯৩৬ সালে ‘দ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া’ এর লোকাল বোর্ডের নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন অমরকৃষ্ণ ঘোষ।

সেই বছরের ৯ অক্টোবরে কবি স্বাক্ষরিত বাংলা এবং ইংরেজি পত্রিকায় অমর ঘোষের প্রতি কবির সমর্থনের বিষয়টি বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়। কবির হস্তাক্ষরে সেই বিজ্ঞাপনের কথাটি ছিল, “রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লোকাল বোর্ডের নির্বাচনে শ্রীযুক্ত অমরকৃষ্ণ ঘোষের সফলতা কামনা করি।’আর ইংরেজিতে এটা ছাপা হয়েছিল এভাবে, ‘I earnestly desire the success of Sj. Amar Krishna Ghosh at the election to the Local Board of Reserve Bank.’ সেই নির্বাচনে মি. ঘোষ ৫৩৩৪টি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লোকাল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনের লেখা, চিঠির উত্তর দেওয়া, নিজের সাহিত্যকর্ম এসব কিছু নিয়ে কবি ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন। জীবন পড়ন্তবেলায় এসেও ক্লান্ত ও অসুস্থ কবিকে কয়েকটি বিজ্ঞাপনে অংশ নিতে হয়। তবে যাই হোক মডেল হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যে তৎকালীন বাংলা তথা ভারতবর্ষে প্রথমসারির ই ছিলেন তা বোধহয় বললে ভুল হবেনা।

তথ্যসূত্রঃ ১/ রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞাপন, শ্রী অরুণকুমার রায় (পৃষ্ঠাঃ১৮-২১) ২/ রবীন্দ্রজীবন কথা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (পৃষ্ঠাঃ১২৭-১২৮)।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker