ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

বিমান ছিনতাই ও একজন সাহসিকা

আরিফুল আলম জুয়েল: গল্পটি ভারতের এবং অবশ্যই সত্য গল্প। অনেকেই হয়তো জানেন গল্পটি, ২০১৬ সালে সিনেমাও হয়েছে এ নিয়ে ভারতে। খুবই জনপ্রিয় সিনেমাটি। সিনেমার কল্যানেই মূলত ঘটনা জানা। বিমানবালার বয়স খুব বেশি নয়, মাত্র ২২ বছর বয়স। তার প্রখর বুদ্ধিমত্তার কারনেই বেঁচে যায় প্রায় ৩৬০ জন যাত্রীর প্রাণ। নাম তাঁর ‘নীরজা ভানোত’! পাঞ্জাবী পরিবারের মেয়ে নীরজার জন্ম চণ্ডীগড়ে, ১৯৬৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। দুই ভাই অখিল ও অনীশের সঙ্গে তাঁর বড় হওয়া অবশ্য মুম্বাইয়ে। নীরজার বাবা হরীশ ভানোত ছিলেন সাংবাদিক। তাঁর কর্মসূত্রে ভানোত পরিবার চণ্ডীগড় থেকে মুম্বাই চলে এসেছিল। সাথে সাথে চণ্ডীগড়ে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার পর মুম্বাইয়ে চলে আসেন নীরজা। চণ্ডীগড়ের সেক্রেড হার্ট স্কুলের পরে নীরজা ভর্তি হন বম্বে স্কটিশ স্কুলে। এরপর স্নাতক বম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে।

বলিউড সুপারস্টার রাজেশ খান্নার অন্ধ ভক্ত নীরজা ষোলো বছর বয়সে প্রথম মডেলিং-এর সুযোগ পান। চেহারা ও ব্যক্তিত্বের দৌলতে খুব দ্রুত উন্নতি করেন মডেলিং ক্যারিয়ারে। কিন্তু সুপার মডেল হয়ে থাকা হল না নীরজার। ১৯৮৫-তে মাত্র ২২ বছর বয়সে বাবা-মার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে করে মধ্যপ্রাচ্যে চলে যান তিনি। বেশি দিন স্থায়ী হল না দাম্পত্য জীবন। কয়েক মাস পরেই নীরজা ফিরে এলেন বাবা মায়ের কাছে। বিয়ের পর থেকেই ক্রমাগত পণের জন্য চাপ দেওয়ায় স্বামীকে ছেড়ে আবার মুম্বাইয়ে চলে আসেন তিনি। ঠিক করলেন, এ বার থেকে স্বাধীন জীবন কাটাবেন।

১৯৮৫ সালেই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ-এ ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট পদে আবেদন করেন নীরজা। কাজটি পেয়েও যান তিনি। প্রশিক্ষণের জন্য মায়ামি যান। দক্ষতার জোরে ফেরেন পার্সার বা চিফ ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট হয়ে। তবে মাত্র বছর খানেকের মধ্যেই এক কলঙ্কিত দিন ঘনিয়ে আসে তাঁর জীবনে। ১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩-তে নীরজা ছিলেন পার্সারের দায়িত্বে। মুম্বাই টু নিউইয়র্ক- এই উড়ানে নির্ধারিত স্টপ ছিল পাকিস্তানের করাচি ও জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট। করাচিতে ল্যান্ড করার কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান ছিনতাই করে আবু নিদাল জঙ্গি গোষ্ঠীর চার সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী! নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে এই চার জঙ্গি করাচি থেকে বিমানে ওঠে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বিমানটিকে সাইপ্রাসে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। সেখানে থাকা ফিলিস্তিনীয় বন্দিদের উদ্ধার করা।

বিমানে ছিলেন প্রায় ৩৮০ জনের মত পূর্ণবয়স্ক যাত্রী ও বিমান ক্রু এবং ৯ জন শিশু। বিমান ছিনতাইকারীদের কবলে চলে গিয়েছে, এই খবর প্রথম নীরজাই দেন ককপিটে। বিমান তখন টারম্যাকে দাঁড়িয়ে, ককপিট থেকে ওভারহেড হ্যাচে পালিয়ে যান পাইলট, কো পাইলট এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার। পালানোর সুযোগ ছিল নীরজার সামনেও। তিনি জানতেন কোন গোপন পথে গেলে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারবেন তিনি। কিন্তু বের হয়ে যাননি। ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট-এর চাকরি নেওয়ার সময় নীরজাকে তাঁর মা রমা ভানোত বলেছিলেন, বিমান ছিনতাই হলে পালিয়ে যেতে। উত্তরে মাকে নীরজা বলেছিলেন, ‘মরে যাব, কিন্তু পালাব না’। ঠিকই নীরজা পালায়নি বরং ঠান্ডা মাথায় কথা বলে গিয়েছেন ছিনতাইকারীদের সঙ্গে। তিনি জানতেন ছিনতাইকারীদের মূল নিশানা মার্কিন যাত্রীরা। নীরজার কাছে যাত্রীদের পাসপোর্ট চায় জঙ্গিরা। বলে সব যাত্রীর পাসপোর্ট যোগাড় করে দিতে! পাসর্পোট সংগ্রহ করার সময় কিছু মার্কিন যাত্রীদের পাসপোর্ট নীরজা লুকিয়ে ফেলেন আসনের নীচে। বাকিগুলো ফেলে দেন ডাস্টবিনে, জঞ্জালের মধ্যে।

যাতে জঙ্গিরা বুঝতে না পারে বিমানের কোন যাত্রীরা মার্কিন। পার্সার যেহেতু নীরজা সেহেতু নীরজার সাথেই কথা বলতে থাকে ছিনতাইকারীরা। কি লাগবে কি না লাগবে, যাত্রীদের খাবার সরবরাহ করবে কি করবে না! টানা ১৭ ঘণ্টা ধরে জঙ্গিদের সঙ্গে চলে নীরজার স্নায়ুযুদ্ধ। এই স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যেই উপস্থিত বুদ্ধির জোরে নীরজা যাত্রীদের আপদকালীন দরজা দিয়ে বের করতে থাকেন। তবে তার আগেই এক ইন্দো মার্কিন যাত্রীকে গুলি করে দেহ টারম্যাকে ফেলে দেয় দুষ্কৃতিকারীরা। তবে এর মধ্যেই বেশির ভাগ যাত্রীদের নিরাপদে বিমান থেকে বের করতে সক্ষম হন নীরজা। কিন্তু ফ্লাইট পার্সার নীরজা নিজে পারেননি বের হতে। ঐদিকে জঙ্গিদের চাহিদারও কোন সুরাহা হচ্ছে না, আবার অনেকেই আপদকালীন দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিরা তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে, নিজেদের মধ্যেও তারা সিদ্ধান্তে একমত হতে পারছে না। মেরে ফেলা শুরু করবে নাকি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে! ততক্ষণে নিজেদের কাছে থাকা বিস্ফোরক ব্যবহার করতে শুরু করেছে জঙ্গিরা। অন্ধকার বিমান থেকে তিনজন শিশুকে নিজের দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে আগলে রেখে ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে বের করার সময় জঙ্গিদের কাছে ধরা পড়ে যান নীরজা। তাঁকে পরপর গুলিতে বিদ্ধ করে বিমান ছিনতাইকারীরা।

বাইশ বছর পূর্তির জন্মদিনের দু’দিন আগে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন বাবা মায়ের ‘লাডো’। বাবা-মা তাকে লাডো বলেই ডাকতেন! কিন্তু একটা বুলেটও ওই তিন শিশুর গায়ে লাগতে দেননি তিনি। শুধু যাত্রীদের প্রাণ রক্ষাই নয়। শুধুমাত্র নীরজার জন্যই ছিনতাইকারীরা বিমানটিকে নিয়ে করাচি ছেড়ে উড়ে যেতে পারেনি। পরে অবশ্য তাদের গ্রেফতার করে পাকিস্তানি আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে সেই শাস্তি বদলে যায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে। হাইজ্যাকের ঘটনায় এত যাত্রীর মধ্যে নীরজাসহ নিহত হয়েছিলেন মোট ২০ জন। বাকি যাত্রীদের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছিলেন নীরজা, যিনি খুলে দিয়েছিলেন বিমানের জরুরি নির্গমনের পথটি। এর ফলেই আসলে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালানো শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত যাত্রীরাই হামলে পড়ে এই চার জঙ্গির ওপর। তার আগেই নীরজাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে তার মাথায় গুলি করে জঙ্গিদের প্রধান। এই ভয়ংকর সময়ের পুরোটা জুড়েই নীরজা শান্ত আর কর্মক্ষম ছিলেন।

ওই অভিশপ্ত বিমানে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী, ডক্টর কিশোর মূর্তি। তিনি জানিয়েছেন— করাচি বিমানবন্দরে ৩৬১ জন যাত্রী ও ১৯ বিমানকর্মীসহ ওই বিমানটিকে হাইজ্যাক করে চার সশস্ত্র জঙ্গি। বিমানসেবিকা হিসেবে নিজের প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ পেয়েও বিমান ছেড়ে পালিয়ে যাননি নীরজা। নিজের থেকে যাত্রীদের নিরাপত্তাকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ঘটনার সময় ভারতীয় ও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি তিনি। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সব বিমানযাত্রীকে বিমান থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তিনটি বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়েই জঙ্গিদের চোখে পড়ে যান নীরজা। যাত্রীর ছয় নম্বর সারি থেকে নীরজার মৃত্যুর সেই ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছিলেন ডক্টর মূর্তি। তার চোখের সামনে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক দূরত্ব থেকে নীরজাকে খুন করে জঙ্গিরা। সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে ভারত সরকার নীরজাকে ‘অশোক চক্র’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

আমেরিকার সরকার তার জন্য ঘোষণা করে ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশন ‘হিরোইজম অ্যাওয়ার্ড’। পুরস্কারের ঘোষণা আসে পাকিস্তান ও কলম্বিয়া সরকারের পক্ষ থেকেও। ২০০৪ সালে অসম সাহসী এই ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের নামে একটি স্ট্যাম্পও বের করে ভারত সরকার। নীরজা ভানোত এর জীবনী নিয়ে বলিউডে একটি মুভি তৈরি হয়েছে যার নাম “নীরজা”। নীরজা মুভিতে অভিনয় করেন -সোনম কাপুর, শাবানা আজমি, শেখর রাভজিয়ানি। মুভিটি রিলিজ হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে। না দেখে থাকলে দেখে নিতে পারেন! অভিনেত্রী সোনম কাপুরের গেটাপ চোখের সামনে দেখে ‘এ তো আমার লাডো-ই দাঁড়িয়ে আছে সামনে’ বলেছিলেন প্রৌঢ়া নীরজার মা রমা ভানোত! মনে হয়েছিল তাঁর সাহসী নীরজা আবার ফিরে এসেছেন।

২০০৮ সালে ৮৬ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন নীরজার বাবা, হরীশ ভানোত! মা, রমা ভানোতও দেখে যেতে পারেননি তাঁর মেয়ের জীবনীনির্ভর সিনেমা ‘নীরজা’ ছবিটি। ছবি মুক্তির কয়েক দিন আগে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে চলে গিয়েছেন তিনি তাঁর আদরের ‘লাডোর’ কাছে। ভারতের এই মেয়ের সাহসিকতা দেখে কুর্নিশ জানিয়েছিল পাকিস্তানও, নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিলেন বিমান যাত্রীদের। কুর্নিশ জানাই আমরাও!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker