খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

ব্রজেন দাস: ইতিহাস সৃষ্টি ছিলো যার নেশা

আরিফুল আলম জুয়েল: নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। আজ পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। থৈ থৈ পানির উপর দৃশ্যমান ৪১ স্প্যানের ৪২ পিলারের পদ্মাসেতু। আমার নিজেরও পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে সাঁতার কাটতে ইচ্ছে করছে খুব!গ্রামের ছেলে সাঁতার জানে না এমনটা সাধারনত হয় না। দৌড়, লাফ-ঝাফ, সাঁতারে ছোঁয়ার খেলা সবই যেন এক নস্টালজিক! সাঁতারের সঙ্গে এই অঞ্চলের আপামর মানুষের নাড়ির সম্পর্ক। সাঁতার বাঙালিদের নিজস্ব খেলা। অথচ ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সাঁতার ফেডারেশনের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয় পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে, যেখানে নদী নেই।

জাতীয় ফেডারেশনের প্রথম নির্বাহী কমিটিতে কোনো বাঙালির স্থান হয়নি! অথচ সেই সাঁতারে আমাদের এক বাঙালী ছেলে বিশ্বরেকর্ড করেছে, তাও সেটি আজ থেকে ৬২ বছর আগে। দেয়া হয়নি তাকে সরকারিভাবে সুযোগ, বারবার বঞ্চিত করা হয়েছে, তাঁর প্রতিভাকে বারবার অস্বীকার করা হয়েছে। কে সে?কি করেছিল সে ৬২ বছর আগে?কিভাবে করতে পেরেছিল এক অজপাড়াগায়ের ছেলে সে রেকর্ড ?আজ তাকে নিয়েই লেখা!সাল ১৯৫৪। কয়েক বছর আগে দেশভাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হয়েছে দুটি রাষ্ট্র। পূর্ব পাকিস্তানের বুকে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য লড়াই। ১৯৫২ দেখেছে কিছু তরুণ তাজা প্রাণের মৃত্যু। পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ও সেনার অত্যাচারে অতিষ্ঠ তাঁরা।

এরই মধ্যে ঢাকায় শুরু হল ন্যাশনাল অলিম্পিক। সেদিন ছিল সাঁতারের ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল ইভেন্টের ফাইনাল রাউন্ড। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেখানকার সেরা সাঁতারুরা অংশ নিয়েছেন। তাঁদেরই মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক বাঙালি যুবক। ঢাকার বিক্রমপুরের ছিপছিপে শ্যামলা গ্রাম্য যুবকটি শত বাধা টপকে এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন। জল যেন একপ্রকার যুদ্ধের ময়দানই। যে করেই হোক, জিততেই হবে…দিনের শেষে সকলকে পিছনে ফেলে প্রথম হন সেই যুবক। ঢাকার এক বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের সাঁতারুদের হারিয়ে দেবে— এটা যেন মানতে পারলেন না সেখানকার বিচারকেরা। নানা অজুহাত দেখিয়ে যুবককে অযোগ্য ঘোষণা করলেন, বাদ দেওয়া হল তাঁকে। আবারও উঠল প্রতিবাদের ঝড়। সব জায়গায় বাঙালিদের প্রতি এরকম অন্যায় অত্যাচার কেন মেনে নেওয়া হবে? প্রতিবাদের তেজে আবারও আয়োজিত হল প্রতিযোগিতা। এবারও জিতলেন সেই যুবক। এবার আর সরানো যায়নি তাঁকে। এখান থেকেই শুরু হল এক কিংবদন্তির গল্প। ঢাকার সেই যুবক কালে কালে নিজেকে ছাপিয়ে এগিয়ে যাবেন আরও আরও দূরে।

ব্রজেন দাস যেন তৈরিই হয়েছিলেন ইতিহাস সৃষ্টি করার জন্য।জ্বি, আমাদের ব্রজেন দাস!ব্রজেন দাসের জন্ম মুন্সিগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক বিক্রমপুর এলাকার কুচিয়ামোড়া গ্রামে, ৯ ডিসেম্বর ১৯২৭!সেখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ব্রজেন ঢাকার কে এল জুবিলি হাই স্কুল থেকে ১৯৪৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও বিএ পাস করেন। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারে তার দারুণ উৎসাহ ছিল। সাঁতারে হাতে খড়ি হয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে সাঁতার কেটে।ছোটবেলা থেকেই বুড়িগঙ্গার বুকে লাফ-ঝাঁপ দিয়েই শৈশব-কৈশোরের সোনালী দিনগুলো কাটিয়েছেন ব্রজেন!

১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে ফ্রি-স্টাইল প্রতিযোগিতার শেষ কথা ছিলেন ব্রজেন দাস। যেখানেই নেমেছেন, জিতে ফিরেছেন। ১৯৫৫ সালের পাকিস্তান অলিম্পিকেও দুটো ইভেন্টে সোনা জেতেন। পরের বছরই মেলবোর্ন অলিম্পিক। ক্রীড়াবিদদের স্বপ্নের জায়গা। ব্রজেন দাস স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন। শুধু স্বপ্ন দেখাই নয়, দিনরাত এক করে চলছে অনুশীলন। আশা, জাতীয় দলে জায়গা পাবেনই। কিন্তু বাঙালি সাঁতারুর ‘স্পর্ধা’ তখনও হজম করতে পারেনি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার। অতএব, অলিম্পিকের চূড়ান্ত দলে জায়গা পেলেন না ব্রজেন দাস। অলিম্পিকের স্বপ্ন ভেঙে খানখান!১৯৫৭ সাল। বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়েছে সেবার ঢাকায়। তাঁর মধ্যেই কেউ কেউ লক্ষ্য করলেন, কে যেন এই প্রবল ঠান্ডার মধ্যেও সুইমিং ক্লাবে প্র্যাকটিস করছেন। পাগল ভেবেছিলেন তাঁরা।

সত্যি একপ্রকার পাগলই ছিলেন ব্রজেন দাস। মনের মধ্যে তীব্র হচ্ছে জেদ। অলিম্পিকে জায়গা পাননি তো কী হয়েছে, ব্যক্তিগত ভাবে নিজেকে তৈরি করবেন। সাঁতারের আন্তর্জাতিক জগতে বাঙালির পতাকা ওড়াবেন। লক্ষ্য বদলে গেছে তখন। মাথায় ঘুরছে একটাই নাম— ইংলিশ চ্যানেল। সাঁতারের জগতে এর মাহাত্ম্য কী সেটা আলাদা করে বলার দরকার পড়বে না। সেখানেই এবার নামতে চান ব্রজেন। আর তার জন্যই প্রবল ঠান্ডার মধ্যেও চলছে প্রস্তুতি। ব্রজেন দাসের এই উদ্যোগের কথা একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল পূর্ব পাকিস্তানে। তিনিও সহযোগিতা চাইলেন ঘনিষ্ঠ মহলে। যদি ব্রজেন সফল হন, তাহলে সেটা মহান কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ এর আগে দক্ষিণ এশিয়া থেকে কেউ ইংলিশ চ্যানেল পার করেননি। একজন বাঙালি হয়ে সেই কৃতিত্ব অর্জন করলে সেটাই হবে আসল জবাব। সেখানেই জয় হবে বাংলার। তড়িঘড়ি তৈরি হল চ্যানেল ক্রসিং কমিটি নামের একটি বিশেষ কমিটি।

যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান থেকে আরম্ভ করে সাংবাদিক, ক্রীড়া সংগঠক— সবাই এগিয়ে এলেন তাঁর সাহায্যে। পাকিস্তান সরকার তো অর্থসাহায্য করবে না। কাজেই শুরু হল চাঁদা তুলে ফান্ড জোগাড় করা। শেষমেশ এস এ মহসিন এবং মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন ব্রজেন দাস। লক্ষ্য স্থির, অবিচল…১৯৫৮ সালে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের সাঁতার প্রতিযোগিতায় মোট ২৩ টি দেশ অংশ নেয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন ব্রজেন দাস। ১৯৫৮ সালের ১৮ই আগস্ট প্রায় মধ্যরাতে ফ্রান্সের তীর থেকে প্রতিযোগিতা শুরু। ২৩টি দেশের জনা চল্লিশেক প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল জয় করলেন ব্রজেন দাস।

১৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিটের দূরত্ব কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। রাত পৌনে দুইটা থেকে শুরু। কুয়াশার আবরণে ঢাকা চারদিক, হিমেল বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। পানি কণকণে ঠান্ডা, ঢেউয়ের তীব্রতাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সামনে গভীর অন্ধকারে ঢাকা সাগরপথ, পাড়ি দিতে হবে একুশ মাইল লম্বা দূরত্ব!তবে জোয়ার-ভাটার কারণে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে ৩৫ মাইল। প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশে সাঁতার কেটে পরদিন বিকেলবেলায় প্রথম সাঁতারু হিসেবে ইংল্যান্ড তীরে এসে পৌঁছান ব্রজেন দাস।পূর্ব পাকিস্তানে অনেক স্কুল, কলেজ একদিনের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছিল এইজন্য। অবশ্য একবার নয়, ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে মোট ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল জয় করেন তিনি। ব্রজেন দাস সর্বমোট ছ’বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন: ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬০, ১৯৬১ সালে।

দেশে ফেরার পর যে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে অবমাননা জুটেছিল, তারাই তাঁকে সম্মানিত করে। আইয়ুব খান রীতিমতো বুকে জড়িয়ে ধরেন তাঁকে। সবশেষে ১৯৬১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড অতিক্রম করেন। সময় নেন ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। এটি ছিল বিশ্বরেকর্ড। এর আগে ১৯৫০ সালে মিসরের হাসান আবদুল রহিম ১০ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে দূরত্ব অতিক্রম করে বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন। ব্রজেন সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন বিশ্বরেকর্ড করেছেন। ব্রজেন দাস ছয়বার চ্যানেল অতিক্রম করেছেন এটাও একটা রেকর্ড। তার আগে চারবারের বেশি কেউ চ্যানেল অতিক্রম করেননি।১৯৬১ সালে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টির পর ইংল্যান্ডে পাকিস্তান হাইকমিশনে ব্রজেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই সংবর্ধনায় ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট বেটেন উপস্থিত ছিলেন। ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে কৃতিত্বের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঢাকায় ফিরে আসার পর ঢাকা স্টেডিয়ামে ব্রজেন দাসকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খান ব্রজেন দাসকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘বাঙাল কা শের’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এরপর ইংল্যান্ডের রানি ও তাঁর মা পাকিস্তান সফরে এলে করাচিতে নাগরিক সংবর্ধনায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে একমাত্র ক্রীড়াবিদ ব্রজেন দাসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রানি ব্রজেন দাসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। রানির সঙ্গে ব্রজেন দাসের সেই ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতাতে ১ জুন ১৯৯৮ সালে ৭০ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন ব্রজেন দাস।১৯৯৯ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়। সেই সোনালী দিন এখন আর নেই, কালের চক্রে বাঙালি সাঁতারুর সেই অসাধারণ সোনালি অধ্যায়ের ওপর এখন ধুলো জন্মেছে!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker