বই Talkহোমপেজ স্লাইড ছবি

মননশীল পাঠকের জন্য সেরা দশটি বই

১। রিপাবলিকঃ প্লেটো
বলা হয়ে থাকে, এযাবত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েকটি বইয়ের মধ্যে রিপাবলিক একটি। এর ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত উঁচু মানের। বিষয়জ্ঞান তারচেয়ে বেশি উৎকৃষ্ট। প্রাচীন গ্রীসে রিপাবলিক একটি অমূল্য সৃষ্টি। এই গ্রন্থের মাধ্যমেই সক্রেটিসকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তার ছাত্র প্লেটো। চমৎকার সব যুক্তি ও আর পাল্টা যুক্তির মধ্য দিয়ে সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র, দর্শন, নীতি নৈতিকতা ও প্রয়োগের নানাদিক উঠে এসেছে রিপাবলিকে। আজকের পাঠকের কাছে এর অনেক যুক্তি দুর্বল মনে হতে পারে, তবে এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর যে, এটা যখন রচিত হয়েছিল তখন এমনসব উচ্চ চিন্তা করাটাও আশ্চর্যের ঘটনা।

২। জেরুজালেমঃ সাইমন সেবাগ মন্টেফিউরি
এই বইটা পড়ার আগ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর কেন্দ্রীয় রাজনীতি সম্পর্কে আমি একরূপ অন্ধই ছিলাম বলা যায়। আপাতদৃষ্টিতে জেরুজালেমকে নিছক একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান মনে হলেও, এর ঐতিহাসিক অবস্থান একে কিভাবে পুরো পৃথিবীর সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে পরিণত করেছে, সেটা এই বই না পড়লে আপনি কখনোই সম্পুর্ণ উপলব্ধি করতে পারবেন না। এই নগরীর সৃষ্টি, রাজায় রাজায় যুদ্ধ, ইহুদি জাতির উদ্ভব, তারো অনেক পরে খ্রিষ্টের অনুসারী বৃদ্ধি, ইসলামের আবির্ভাব, মধ্যযুগীয় জিহাদ ও ক্রুসেডের চমৎকার এক ধারাবিবরণী পাবেন এই বইটিতে। একে জেরুজালেমের ইতিহাস না বলে পৃথিবীর কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসও বলা যেতে পারে।

৩। ভারতবর্ষের ইতিহাসঃ কোকা আন্তোনভা, গ্রিগোরি বেনগার্দ- লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি
ভারতীয় উপমহাদেশের সুপ্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইতিহাসকে যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে হলে এই বইটি দারুণ ভূমিকা রাখার যোগ্য। বইটি লেখা হয়েছে কয়েকজন লেখকের যৌথ প্রচেষ্টায়। এবং প্রতিটি লাইনই যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রামাণ্যের সাক্ষর বহন করে। ভারতবর্ষের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকের বস্তুনিষ্ট আলোচনা আছে এতে। এই অঞ্চলের সকল ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমের কার্যকারণ জানতে হলে বইটি পড়া উচিত।
.
৪। দ্য গড ডিল্যুশনঃ রিচার্ড ডকিন্স
সমস্ত কিছুকে নিরেট প্রমাণভিত্তিক বাস্তব সত্যতার ভিত্তিতে যাচাই করার যে নীতি, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে রিচার্ড ডকিন্সের এই বইটি। সৃষ্টির শুরু থেকে একেবারে আধুনিক যুগের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সত্যতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ভিত্তিক এক চমৎকার বই ‘দ্য গড ডিল্যুশন’। স্রষ্টা, সৃষ্টি, পৃথিবী, জীব ও মানুষের পায় সব প্রধান দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে। এবং কোনো ক্ষেত্রেই লেখককে সংখ্যাগরিষ্টের সমর্থন অসমর্থনের দিকে দুর্বল হতে দেখা যায় নি। যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে যা সত্য তাই তিনি বলতে চেয়েছেন।

৫। নারীঃ হুমায়ুন আজাদ
মানবজাতির প্রায় অর্ধেক সংখ্যক নারী, যদিও তাদের সম্পর্কে খুব কমই নির্মোহ গবেষণা ও আলোচনা হয়েছে পৃথিবীতে। ইউরোপে যদিও রেনেসা পরবর্তী সময়ে কিছু দার্শনিক ও লেখক এ বিষয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু নারী সম্পর্কে প্রায় সব ধরণের বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীকে একত্রে এনে ব্যাপকভাবে আলোচনা করার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার লেখক হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ গ্রন্থটি অনন্য। যদিও এটি মৌলিক গ্রন্থ নয়। তবে, আপেক্ষিক তুলনামূলক গবেষণায় এর স্থান প্রথম দিকেই থাকবে। কারণ, নারী বইটিতে নারী সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থের দৃষ্টিভঙ্গী, ইউরোপের প্রায় সব প্রধান দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গী ও বাংলাভাষী কবি লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গীকেও যুক্তির কষ্টিপাথরে পরখ করে দেখা হয়েছে। যা আর কেউ আগে এতো ব্যাপক আকারে করে নি। বলা হয়েছে, নারীর অন্তনির্হিত যৌনতার ব্যাপারে। আফ্রিকা থেকে এশিয়ায়, নারীর প্রকৃত স্বরূপ সন্ধান করা হয়েছে। নারী গ্রন্থের প্রধান আকর্ষণ বইটিতে ব্যবহৃত ভাষা, যা অনন্য, শৈল্পিক। বাংলাদেশের সকল নারীর তো বটেই, সকল পুরুষও এই বইটির পাঠক হওয়া উচিত। কারণ, এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

৬। রাজনীতিকোষঃ হারুনুর রশীদ
যদি কেউ এক বইয়ের মধ্যেই দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতির মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ব করতে চান, তাহলে আমি বলবো হারুনুর রশীদের ‘রাজনীতিকোষ’ বইটি পড়ে ফেলুন। বইটির পাতায় পাতায় জানার ও শেখার মতো অনেক বিষয় আছে। এটি অভিধান আকারে অক্ষরের ক্রম অনুযায়ী লেখা হয়েছে। প্রতিটি রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শনের প্রায় সব দিকই উঠে এসেছে এখানে। প্রতিটি টপিকে সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেওয়া হয়েছে, যাতে পাঠক একটা মৌলিক ধারণা নিয়ে উঠতে পারে। অধিক বই পড়তে যাদের ধৈর্য কম, কিন্তু জ্ঞান তৃষ্ণা মেটানোর একান্ত ইচ্ছা, তাদের উচিত বইটি পড়ে ফেলা।

৭। সত্যের সন্ধানেঃ আরজ আলী মাতুব্বর
ধর্ম ও জীবন দর্শন নিয়ে কিছু কৌতুহল উদ্দীপক প্রশ্নকে লেখক সাধারণের উপযোগী করে উত্তর দিয়েছেন। লেখক সব ধরণের জটিলতা পরিহার করেছেন, যাতে সর্বসাধারণের উপযোগী হয় প্রশ্ন ও উত্তরগুলো। বইটার তাত্ত্বিক ওজন হয়তো কম, তবে যারা প্রশ্ন করে না বা চিন্তা করে না, তাদেরকে জাগাতে ‘সত্যের সন্ধানে’ বইয়ের মতো খুবই কমই বই আছে বাংলা ভাষায়। কৃষক শ্রমিক থেকে শুরু করে বিরাট অধ্যাপককেও একইভাবে ভাবাতে বাধ্য করবে বইটি। জীবন ও জগত সম্পর্কে আগ্রহী ভাবুক পাঠক মাত্রই এই বইটির অনুরাগী হবে, এই আমার বিশ্বাস।
.
৮। দর্শনকোষঃ সরদার ফজলুল করিম
দর্শন চর্চায় আগ্রহী যারা আছেন, তাদের জন্য উৎকৃষ্ট একটি বই হলো ‘দর্শনকোষ’। এটা দর্শনের উপর মৌলিক কোনো বই নয়। তবে এযাবত যতো দার্শনিক মতবাদ এসেছে পৃথিবীতে, সবগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপ ও কার্যকরী ‍উপায়ে ধারণা দেওয়া চেষ্টা করেছেন সরদার ফজলুল করিম। দর্শন জগতের সামগ্রিক একটা ধারণা পেতে এই বইটি পড়তে হবে। উপকৃত হবেন আশা করি।

৯। ডাস ক্যাপিট্যালঃ কার্ল মার্ক্স
পৃথিবী আসলে কিসের ভিত্তিতে চলছে? এই প্রশ্নের জবাব আছে কার্ল মার্ক্সের এই বইটিতে। আমরা যা কিছু দেখছি, ইমারত, রাস্তাঘাট, কল কারখানা, আর এইসব চাকচিক্য, সবকিছু কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা করেছেন মার্ক্স। অর্থ, সম্পদ, পণ্য, উৎপাদন, বিতরণ, শ্রম ও শ্রমিক এবং এসবের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া আজকের দৃশ্যমান পৃথিবীর অন্তরালে কতসব ঘটনা জড়িত, ক্যাপিটাল গ্রন্থে এর স্পষ্ট উত্তর আছে।

১০. সেপিয়েন্সঃ ইউভাল নোয়াহ হারারি
এতসব বই পড়ার পর আপনার মনে মানুষ হিসেবে যখন আরো আরো জ্ঞানপিপাসা তৈরি হবে, তখন সেই পিপাসা মিটাবে হারারির ‘সেপিয়েন্স’ বইটি। এটা আলাদা করে কোনো দার্শনিক বা ইতিহাসভিত্তিক বই নয়, বরং মানুষ হিসেবে নিজের আত্মপরিচয় সন্ধানের প্রামাণ্য দলিল এটি। মানুষের আদিম সংগ্রামী জীবন থেকে একেবারে বর্তমান পর্যন্ত, সবকিছু ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে এই গ্রন্থে। ‘সেপিয়েন্স’ গ্রন্থটির প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে, এর ভাষাগত প্রাঞ্জলতা। দারুণ সুখপাঠ্য একটি বই।

  • আনসারি মুহম্মদ তৌফিক

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker