স্বাস্থ্য

মানুষ নাকি মায়ানেকড়ে?

যারা ভ্যাম্পায়ার কিংবা ওয়্যারউলফ(Werewolf) সংক্রান্ত মুভি/টিভি সিরিজ/বই দেখেছেন বা পড়েছেন তাদের কাছে লাইকেনথ্রপি টার্মটা পরিচিত হওয়ার কথা। এ এমন এক ক্ষমতা যার মাধ্যমে কোনো মানুষ নেকড়েতে পরিণত হতে পারে। বাংলায় যাকে বলা হয় ‘মায়া নেকড়ে’। তবে শুধু বিনোদন মাধ্যম নয়, পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তের মিথলজিতে এমন মায়া পশুর দেখা পাওয়া যায়। হ্যাঁ, শুধু নেকড়েতে পরিণত হওয়ার মাঝে মিথলজি থেমে নেই। নেকড়ে থেকে শুরু করে কুকুর, বিড়াল, হায়েনা, শিয়াল, বাঘ ইত্যাদি বিভিন্ন পশুতে পরিণত হবার গল্প প্রচলিত।

এসব মায়া পশুদের প্রায় প্রত্যেকটিই নিশাচর এবং পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী মানুষ শুধুমাত্র রাতের বেলাতেই সেসবে পরিণত হয়। মজার ব্যাপার, মায়াপশুদের কাহিনীর রকমফের অঞ্চলভেদে প্রায় এক ঘরানার হলেও যে অঞ্চলে যে নিশাচর পশুর দৌরাত্ন বেশী সে অঞ্চলে সে পশুতে রুপান্তরের কাহিনীও বেশী। যেমন, এশিয়ান মায়াপশু হিসেবে আপনি কখনো মায়াহায়েনার কথা শুনবেন না, যেটা আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বেশ প্রচলিত।

আবার ঐসব অঞ্চলে মায়া শেয়ালের গল্প তেমন শোনা যায় না, যেটা আপনি জাপানিজ মিথলজিতে পাবেন। তো এসব মায়া পশুদের গল্প কতটুকু সত্য, এসব কাহিনীর উৎপত্তি কীভাবে হলো, সাইনোসেফালিদের সাথে মায়াপশুদের কোনো সম্পর্ক আছে কী না, সেসব ভিন্ন আলাপ। অন্য কোনো দিন বিস্তারিত বলা যাবে, আজকে আপাততো মিথলজি বাদ দিয়ে বাস্তবতার কথা বলি। লাইকেনথ্রপি কী জিনিস সেটা আশা করি বুঝতে পেরেছেন।

এখন ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপি কী বস্তু তা নিয়ে আলাপ করা যাক। এটা বিরল এক মেডিক্যাল কন্ডিশন যেখানে রোগী মনে করে সে অন্য পশুতে রুপান্তরিত হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে যায় কিংবা ক্রমশ রুপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেশীরভাগ রোগীর মধ্যেই এ ধারণা জন্ম নেয় যে তার শরীর লোমে ঢেকে গেছে, নখ গুলো বড় হয়ে গেছে বা খুরে পরিণত হয়েছে এবং মাথা ও শরীরের গঠন পরিবর্তিত হয়ে কোনো পশুর আকৃতি ধারণ করেছে। পুরো ব্যাপারটা রোগীর মনোজগতে ঘটলেও বাহ্যিক কিছু লক্ষণও প্রকাশ পায় বটে। যেমন, রোগী কুকুর বা নেকড়ের মতো চারপায়ে ভর দিয়ে হাঁটে বা হাঁটতে চায়, পশুর মতো গর্জন করে, কামড়াতে চায়, আঁচড় বা থাবা বসাতে চায় ইত্যাদি।

১৮৫২ সালে ফ্রান্সের এক অ্যাসাইলামে অফিসিয়ালি প্রথমবারের মতো ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপিতে ভোগা এক পুরষের কথা জানা যায়, যার ধারণা ছিলো, সে মূলত নেকড়েতে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা পরিবর্তিত হয়েছে থাবায় এবং শরীরে বড় বড় লোম গজিয়েছে। নিজের দাবির প্রমাণ স্বরুপ সে ঠোঁট উল্টিয়ে নেকড়েদের মতো বড় বড় দাঁত দেখাতো সবাইকে। যদিও আদতে তার সবকিছু স্বাভাবিকই ছিলো। কাঁচা মাংস খেতে চাইতো সে, কিন্তু তা সরবরাহ করা হলেও ফিরিয়ে দিতো কারণ টাটকা নয় বরং পঁচে যাওয়া কাঁচা মাংস খাওয়াই নাকি তার অভ্যাস। ঠিক কেনো এমনটা হয়, আজতক তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে এই অদ্ভুত রোগের কারণ বের করতে পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন গবেষক কাজ করেছেন, করছেন।

নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. জান ডার্ক ব্লম তাদের মধ্যে একজন। ভদ্রলোকের কাছে ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপিতে ভোগা এক রোগী আসার পর থেকে তিনি রোগটা নিয়ে বেশ কৌতুহলী হয়ে পড়েন। কৌতুহল বশেই মেডিক্যাল আর্কাইভ খুঁড়ে বের করেন এই রোগে ভোগা রোগীদের রেকর্ড। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ব্লম ভেবেছিলেন রোগটা বেশ কমন, কারণ এ রোগের লক্ষন সম্পন্ন রোগীর কথা প্রায়ই শোনা যায়, অথচ রেকর্ড বলছে ১৮৫০ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দুনিয়া জুড়ে রেকর্ডেড রোগীর সংখ্যা মাত্র ৫৬। কেনো এমন হলো, তার উত্তরে ব্লম মনে করেন মানুষের মাঝে কুসংস্কারই এর জন্য প্রধাণত দায়ী। আবার রোগ সম্পর্কে ডাক্তারদের অজ্ঞতার দায়ও কম নয়। আরো একটা ব্যাপার ব্লমকে বেশ অবাক করলো। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী কুকুর বা নেকড়েতে পরিণত হয়েছে এমন মনে করা রোগীর সংখ্যাই বেশী হবার কথা। অথচ রেকর্ড অনুযায়ী ৫৬ জনের মাঝে মাত্র ১৩ জন রোগী এমন ধাঁচের। বাকিরা নিজেদের গরু, সাপ, ব্যাঙ, এমনকি মৌমাছিও ভেবেছে।

১৯৮৯ সালে এক রোগীর রেকর্ড থেকে জানা যায়, সে নিজেকে ক্রমান্বয়ে কুকুর, ঘোড়া, বিড়াল এবং চিকিৎসা শেষে আবার মানুষে পরিণত হবার অনুভূতি পেয়েছিলো। একই সাথে ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপি ও কটার্ড ডিলিউশনে (যে রোগে মানুষ নিজেকে মৃত মনে করে) ভোগা রোগীর রেকর্ডও আছে। বিভিন্ন রকম ব্রেইন ইমেজিং টেকনোলজি ব্যবহার করে দেখা গেছে, এ রোগে ভুক্তভোগীদের মস্তিষ্কে প্রিমোটর, কর্টিক্যাল ও সাবকর্টিক্যাল সেন্সর অর্থাৎ যেসব অঞ্চল বডি শেপের ধারণা বহন করে, সেই জায়গাগুলো অস্বাভাবিক রকম আচরণ শুরু করে। ব্লম আরো দেখেছেন, ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপিতে ভোগা এসব রোগীদের বেশীরভাগেরই অন্যান্য মানসিক রোগের রেকর্ড আছে। যেমন, শতকরা ২৫ ভাগ রোগী মূলত সিজোফ্রেনিক, ২৩ ভাগ সাইকোটিক ডিপ্রেশনে এবং বিশ ভাগের মতো ভুগেছে বাইপোলার ডিসঅর্ডারে। ব্লমের ধারণা, খুব সম্ভব এসব রোগের কারণেই ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপি ট্রিগার্ড হয়। তাই তিনি মনে করেন, অন্যসব রোগগুলোর চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ ভালো করা সম্ভব।

ড. ব্লমের কাছ থেকে সরে এসে আমরা যদি এবার ইতিহাসের দিকে নজর দেই, তাহলে কিন্তু সম্ভাব্য ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপির অনেক উদাহরণ দেখতে পাবো। বাইবেলের কথা যদি সত্যি বলে ধরে নেই, তবে বিখ্যাত ব্যবেলনীয় রাজা দ্বিতীয় নেবুচাঁদনেজার খুব সম্ভব শেষ বয়সে ক্লিনিক্যাল লাইকেনথ্রপিতে ভুগেছিলেন। বুক অফ ডানিয়েলে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘…was driven from men, and did eat grass as oxen.’ (সংযুক্ত ছবিটাও তার, উইলিয়াম ব্লেকের আঁকা)।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker