খেলাট্রেন্ডিং খবরহোমপেজ স্লাইড ছবি

মেসি ক্রীতদাস শ্রেণীর মধ্যে একজন অভিজাত গ্ল্যাডিয়েটর!

মিরাজুল ইসলাম: শিল্পকলার ইতিহাসে ক্রিস্টি’র নিলামে সবচেয়ে বেশী দামে বিক্রি হয়েছিলো ২০১৭ সালে লিওনার্দো দ্যা ভিন্চি’র ‘সালভাদর মুণ্ডি’ নামের তেলচিত্রটি। ছবিটি বিক্রি হয়েছিল ৪৫০ মিলিয়ন ডলারে। ফুটবল বিশ্বের শিল্পী লিওনেল মেসি নিজেকে তার চেয়ে অনেক বেশী দামী প্রমাণিত করেও পারলেন না অবমুক্ত হতে। আগের এক লেখায় মেসিকে আধুনিক যুগের গ্ল্যাডিয়েটর বলেছিলাম। কঠিন-জটিল-কঠোর আর্থিক কানুনে মেসির মতো হাজারো ফুটবলার বন্দী।

ক্লাব মালিকের ইচ্ছের অধীনে নিয়ন্ত্রিত তার বিলাসী জীবনযাপন। মাঠের পারফরমেন্সই শেষ কথা নয়। রোমান কোলোসিয়ামরূপী আধুনিক ক্লাব নিংড়ে নেয় খেলোয়াড়দের যাবতীয় জীবনী শক্তি। নিজস্ব সিদ্ধান্তে নেবার স্বাধীনতা থাকলেও এর আড়ালে থাকে প্রকাশ্য-গোপনীয় চুক্তি ও নিয়মের বেড়াজাল। যার জের ধরে এই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী হয়েও লিওনেল মেসি পারলেন না মুক্ত হতে।

পারলেন না নিজ ইচ্ছায় স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। চ্যাম্পিয়নশিপ লীগের শেষ ম্যাচে জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখের সাথে শোচনীয় পরাজয়ের পরপরই মূলত মেসির গত এক বছরের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ হয়ে পড়ে। ক্লাবের পরিকল্পনায় মেসি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। অবশেষে বুরোফ্যাক্সের মাধ্যমে মেসি তার আজন্ম ভালোবাসার ক্লাব কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে লেখেন, ‘চলে যেতে চাই।’ এরপরের ঘটনা শুধু ফুটবল বিশ্বে নয়, ক্রীড়ালোকের ইতিহাসে এক বিশেষ ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো। মেসি ও বার্সা’র মাঝে তখন দেয়াল হয়ে দাঁড়ালো একটি বিশাল অংক – ৭০০ মিলিয়ন ইউরো/৮২৩ মিলিয়ন ডলার। ইউরোপ ফুটবল লীগের হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাব এই অবিশ্বাস্য মূল্য দিতে পারতো কিন্তু একই সাথে তাদের আইনী জবাবদিহি করতে হতো এই পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের কারনে। তার মানে বার্সা ক্লাব প্রেসিডেন্ট ও তার দলবল ভালোভাবেই জানতো মেসির সাথে চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার ‘রিলিজ ক্লজ’ মেনে কোন ক্লাবের পক্ষে হাত বাড়ানো আপাতত সম্ভব নয়।

কিন্তু মেসি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করেছিলেন ক্লাব প্রেসিডেন্ট বার্তামিও’কে। তিনি নাকি মেসিকে কথা দিয়েছিলেন এই মৌসুম শেষে যদি সে চলে যেতে চায় নতুন কোন চ্যালেঞ্জ নিতে, তাকে ‘ফ্রি’তে মানে কোন রিলিজ ক্লজ ছাড়াই তারা যেতে দেবেন। ক্লাবের প্রতি বছরেরে পর বছর প্রতিদানের সূত্রে মেসি এমন আশা করতেই পারেন। সে লক্ষ্যে কাগজে-কলমে চুক্তিও হয়েছিল মেসির সাথে। ২০১৯-২০ এর জুন মাস থেকে চাইলে কোন প্রকার ট্রান্সফার ফি ছাড়া ‘মুক্ত খেলোয়াড়’ হিসেবে ক্লাব ত্যাগ করে নিজের পছন্দের দলে যোগ দিতে পারবেন। বার্সা ক্লাব এখন বলছে সেই সুযোগ মেসি এবছরের ১০ জুনের আগে জানালে তাকে চুক্তি অনুযায়ী ছেড়ে দেয়া সম্ভব হতো। কিন্তু তখন মেসি লা-লীগা নিয়ে ব্যস্ত ও করোনা’র কারনে লীগের সময়সূচী প্রলম্বিত হওয়ায় তখন হুট করে ক্লাব ত্যাগের বিষয়টি তিনি বলতে চাননি। ওদিকে ক্লাবের ভাষ্যমতে মেসি ১০ জুনের পর বিষয়টি অফিশিয়ালি জানিয়েছেন এবং সেক্ষেত্রে নিয়মের ব্যতয় ঘটেছে। কারন মেসির চুক্তি বলবৎ আছে ২০২০-২১ সালের জুন মাস অব্দি।

সোজা ভাষায় মেসিকে তার চুক্তির স্বপক্ষে যুক্তিতে জিততে হলে বার্সেলোনা ক্লাবের বিপক্ষে আইনী লড়াইয়ে নামতে হবে। মেসি সর্বান্তকরণে তার জীবনদায়ী ক্লাবের বিপক্ষে আইনের আশ্রয় নিতে চাচ্ছিলেন না কোনভাবেই। চাইছিলেন সমঝোতার রাস্তা। কিন্তু ক্লাব প্রেসিডেন্ট এখন অনড় তার ব্যবসায়িক অবস্থানে। তাই মেসির মূল ক্ষোভ বার্সা ম্যানেজমেন্টের বর্তমান সিস্টেমের সাথে, ক্লাবের প্রতি নয়। ক্লাব ছেড়ে এই মুহূর্তে যেতে না পারার নেপথ্যে ৭০০ মিলিয়ন ইউরোর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ম্যানচেস্টার সিটি আগ্রহ দেখালেও মেসিকে তার আগে নিরসন করতে হতো ক্লাবের সাথে চুক্তির নিষ্পত্তি। আইনের আশ্রয় ছাড়া যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রিয় ক্লাবের বিরুদ্ধে আর যাই হোক আইনী যুদ্ধে জড়াবেন না বলে সিদ্ধান্তে মেসি বাধ্য হলেন। আরো এক মৌসুম বার্সায় থেকে যেতে রাজী হলেন কৌশলগত কারনে। তাছাড়া মেসির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পর তার বড় ছেলে থিয়াগো প্রচণ্ড কান্নাকাটি শুরু করেছিলো। কারন নতুন স্কুলে ভর্তি হতে চায় না সে। একই সাথে মেসির পরিবারেও শোকের ছায়া নেমে আসে। বার্সেলোনায় তাদের শেকড় গজিয়ে গেছে।

কিন্তু সবাইকে অবাক করে মেসি অবিচল ছিলেন বার্সেলোনা ছেড়ে যেতে। বার্তামিও’র অধীনে কোন ভালো ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছিলেন না বার্সার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলারটি। এর চেয়ে দু:খজনক আর কি হতো পারে! ক্লাবকে ৩৪টি শিরোপা জয়ে সাহায্য করেও মেসি চান আরো সাফল্য! এই মধ্য যৌবনে নিজেকে আরো উঁচুতে মেলে ধরার ইচ্ছে এখনো কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলোর মতো অটুট। চ্যাম্পিয়নস লীগে রোম, লিভারপুল কিংবা লিসবনের দু:স্বপ্ন বার্সা’তে থাকলে আরো দীর্ঘ হবে তা অভিজ্ঞ মেসি বুঝে গেছেন। সুতরাং মুখে ‘ক্লাবের জন্য আগামী বছর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো’ কথাটা সাক্ষাৎকারে যতই বলুন, মেসি এখন একজন চরম অসুখী ফুটবলার।

খেলবেন, আলো ছড়াবেন কিন্ত চেহারার মলিনতা সহজে ঢাকা পড়বে না। তাই দিন শেষে মেসি-ড্রামার আপাত অবসান দেখে কেবলই মনে হচ্ছে, মেসি যেন ক্রীতদাস শ্রেণীর মধ্যে একজন অভিজাত গ্ল্যাডিয়েটর। যে কিনা তার মুক্তি অর্জন করবার প্রায় শেষ ধাপে চলে এসেছে। আর মাত্র দশ মাস! তারপর মুক্তি। কিন্তু মেসি কি প্রাণ ফিরে পাবেন আবার?

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker