বিনোদনসিনেমা ও টেলিভিশনহোমপেজ স্লাইড ছবি

যার সুরে বিমোহিত পৃথিবী

আরিফুল আলম জুয়েল: ছোটখাট গড়নের মানুষটিকে দেখলেই ভাল লাগে, কোন কারন ছাড়াই ভাল লাগে! তার সৃষ্টি, তার কাজ, তার বিনয়ী ভাব, সুফী চেহেরা, তার ভাব-আচরণ-ব্যবহারে যে কেউ বলবে যে, সে অসাধারণ একজন মানুষ! ১৯৯৫ সাল! বিয়ে ঠিক হলো ২৭ বছর বয়সী ছোটখাট গড়নের ছেলেটির, কনের নাম সায়রা বানু! রেঁস্তোরায় দেখা হলো দু’জনের।

হবু স্ত্রীকে ছেলেটি বললো, এমনো হতে পারে রেস্তরাঁয় নৈশভোজে গিয়ে হঠাৎ তার মাথায় কোনো গানের সুর এল। তিনি কিন্তু ডিনার ফেলে বাড়ি ফিরে বসে যাবেন গান নিয়ে। সায়রা কি রাজি আছেন তাকে বিয়ে করতে? সলজ্জ হেসে সম্মতি জানিয়েছিলেন সায়রা বানু। ১৯৯৫ সালের মার্চে বিয়ে হয় তাদের। তখন সায়রা ২১ বছরের তরুণী। গত আড়াই দশক ধরে সে স্বামীর পাশে সায়রা বানু থেকেছেন তাদের যাত্রাপথের নৌকার হাল ধরে থেকে।

ছেলেটি আজ বিরাট তারকা। বিরাট সুনাম তার, এক নামে চিনে বিশ্ববাসী, ছেলেটি অস্কারও জিতেছে, গানের জগতে নিজের ভিশন ও প্যাশন দিয়ে ভারতীয় সংগীতশিল্পকে আমূল পাল্টে দিয়েছে এবং নিজেকে ভারতীয় সংগীতের মুখপাত্রে পরিণত করেছে।
বিশ্বের অন্যতম একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে সে!জিতেছে অসংখ্য পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে, দুটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, দুটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, একটি করে বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব, চারটি জাতীয় পুরস্কার, ১৫টি ফিল্ম ফেয়ার ও ১৩টি দক্ষিণ ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার। অথচ ছেলেটির ছোটবেলা কেটেছে নিদারুন কষ্টে!

পাঠক, এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয় কার কথা বলছি, জ্বি বলছি ভারতের সংগীত পরিচালক জনপ্রিয় সুরকার, সঙ্গীত প্রযোজক ও গায়ক এ আর রহমানের কথা! আরও কষ্ট দেয়, বিশেষত তাঁর পিতার মৃত্যুর দিনটি। ওই দিনেই তার বাবার সুরারোপিত প্রথম চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলেও তা তিনি দেখে যেতে পারেননি। বাবা চলে যাওয়ার পর মাকে কেন্দ্র করেই বেড়ে উঠেছেন রহমান। বাবার দুটো কি-বোর্ড ভাড়া দিয়ে তখন সংসার চলত তাঁদের। ১১ বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন অর্কেস্ট্রা দলের সঙ্গে কি-বোর্ড বাজাতে শুরু করেন রহমান। সেটা অবশ্য নেহাতই পেটের দায়ে। ভারতীয় একটি সংগীত মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান বলেছিলেন, ১১ বছর বয়স থেকেই অনেকে আমাকে চিনত। আমার কাজ ছিল, ফরমায়েশি ফিল্মি গান কি-বোর্ডে বাজানো।’

তখন ১৯৯২ সাল। তামিল পরিচালক মণিরত্নম একটি কফির বিজ্ঞাপনের জিঙ্গলসে সুর দিয়ে মাতিয়ে দেওয়া ২৫ বছর বয়সী ছেলেটিকে সুযোগ দিলেন তার ‘রোজা’ ছবির সংগীত পরিচালনার। তামিল ভাষায় তৈরি ছবিটি হিন্দিতে ডাব করা হয়েছিল। দুই ভাষাতেই রোজা’র সব কটি গান দারুণ হিট হয়। এর পর থেকে আর পেছনে তাকানো নয়, তার দেওয়া সুর কখনো ফ্লপ করেনি। জীবনের প্রথম ছবির জন্যই পেয়েছিলেন রজত কমল (জাতীয় পুরস্কার), আজ পর্যন্ত এই রেকর্ড অন্য কোনো সংগীত পরিচালকের নেই।

সংগীত পরিচালক কিংবা সুরকার হয়েও যে রীতিমতো প্রথম সারির তারকা হওয়া যায়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা যায়, তার প্রমাণ এ আর রহমান। ভারতের চলচ্চিত্র জগতে তিনি তারকাদের তারকা। নেপথ্যের মানুষ হয়েও এমন তারকাবাজি, এ আর রহমানের আগে কোনো ভারতীয় সংগীত পরিচালক করে দেখাতে পারেননি। অস্কার জেতার পর ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর হৃদয়ে সুরের মাধ্যমে নিজের জন্য পোক্ত আসন পেতে ফেলেছেন এ আর রহমান।

তিনি হলিউডকে বাধ্য করেছেন বলিউড সম্পর্কে নাক সিঁটকানো মনোভাব ছাড়তে। তাঁকে দক্ষিণ ভারতের মানুষ ডাকে ‘দ্য মোৎ​সার্ট অব মাদ্রাজ’ নামে। ১৯৮৪ সালে রহমানের ছোট বোন প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক চিকিৎসক এবং কবিরাজ দেখানোর পরও তিনি সুস্থ হচ্ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে তার মা আজমীর শরীফে মানত করেন। ১৯৮৮ সালে আল্লাহর রহমতে একজন মুসলিম পীরের সাহায্যে তার অসুস্থ বোন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে উঠলে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আসে এবং সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এ সময় তার নাম রাখা হয় আল্লাহ রাখা রহমান বা সংক্ষেপে এ আর রহমান। এ আর রহমানের স্ত্রী সাইরা বানু, তাদের তিনটি খাদিজা, রহিমা এবং আমিন নামে তিনটি সন্তান রয়েছে।

মঞ্চ, বলিউডের চলচ্চিত্রে কাজ করার পাশাপাশি তিনি তার সুরের প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন হলিউডেও। স্পাইক লির ‘ইনসাইড ম্যান’ (২০০৬) চলচ্চিত্রের জন্য একটি সাউন্ডট্র্যাক রচনা করেন তিনি এবং ‘এলিজাবেথ: দ্য গোল্ডেন এইজ’ (২০০৭) চলচ্চিত্রে যৌথভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। সত্যিকার অর্থে ওয়েস্টার্ন জগতে রহমান ব্রেক পান ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ চলচ্চিত্রের ‘জয় হো’ গানটির মাধ্যমে। এই গানটি তাকে অস্কার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পর্যন্ত এনে দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব, ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি ফর ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) প্রভৃতি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১০ সালে তিনি ‘জয় হো’র জন্য গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পান।

২০১০ সালে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ভারতের অত্যন্ত সম্মানজনক পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ’ অর্জন করেন রহমান। ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ২০০৯ সালে লন্ডনের ওয়ার্ল্ড মিউজিক ম্যাগাজিন তাকে “ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মিউজিক আইকন ” দের মধ্যে একজন বলে অভিহিত করে। বিশ্ব সঙ্গীতে অবদান রাখার জন্য ২০০৬ সালে ‘স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের’ পক্ষ থেকে রহমানকে একটি সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। তাছাড়া মিডলসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, আন্না বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।

দু’বারের অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে হোয়াইট হাউজে ডিনারের দাওয়াতও পেয়েছিলেন। ২০১৩ সালের নভেম্বরে তাঁর নামে মার্কহাম, ওন্টারিও, কানাডায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ট্রিনিটি কলেজ অফ মিউজিকে’ স্কলারশিপ পেয়ে ডিগ্রী অর্জন করেন রহমান।
পরবর্তীতে মাদ্রাজে পড়ালেখা করার সময় স্থানীয় একটি স্কুল থেকে ‘ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিকে’ ডিপ্লোমা করেন তিনি।

শেষে এসে জেনে নিন এ আর রহমানের কিছু অজানা তথ্য-

১) এ আর রহমান আসলে সুরকার নয়, কৈশোরে হতে চেয়েছিলেন ইলেকট্রনিকস অথবা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।

২) ৬ জানুয়ারি শুধু এ আর রহমানেরই জন্মদিন নয়, তাঁর ছেলে আমিনেরও জন্মদিন!

৩) শুধু ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ নয়, এ আর রহমান সুরকার করেছেন হলিউডের জনপ্রিয় মুভি ‘১২৭ আওয়ারস’ এবং ‘লর্ড অব ওয়ার’-এ।

৪) ২০০০ সালে এ আর রহমানেরই জিঙ্গেলে একটি ফরাসি বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল জিনেদিন জিদানকেও!

তবে বর্তমানে রহমান বলিউডে কম কাজ করছেন। করছেন না বলে কম করতে দেয়া হচ্ছে বলাটাই বেটার। একদল লোক তাকে বলিউডে কাজ করতে দিচ্ছে না।

সঙ্গীত পরিচালক কিংবা সুরকার হয়েও প্রথম সারির তারকা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা এ আর রহমান এবার বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ‘গ্যাং’ অর্থাৎ দলবাজি নিয়ে মুখ খুলেছেন।

এ আর রহমান বলেন , ‘ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটা গ্যাং রয়েছে, যারা আমার সম্পর্কে গুজব ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে।’

প্রিয় এ আর রহমান, আশা করি নিশ্চয় আবার সদর্পে ফিরে আসবেন গানের জগতে, বিমোহিত হবো আমরা সবাই, বিমোহিত হবে বিশ্ব!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker