বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

রাধাবিনোদ পাল: কীর্তিমান এক বাঙালি বিচারক

আরিফুল আলম জুয়েল: ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে পড়া রাধাবিনোদ পাল কে কতজন চিনেন? নিজ দেশে ভিখ না পাওয়া এই বিচারক আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। অথচ আমরা তাঁর নাম ই জানি না। বলা হয়ে থাকে, আজকে জাপান আমাদেরকে এভাবে বলামাত্রই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার পেছনে রয়েছে এই লোকটির অবদান। জানেন, ২০০৭ সালে জাপানের প্রধান মন্ত্রী শিঞ্জো আবে এসেছিলেন ভারত সফরে। পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখার সময় তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিলেন রাধাবিনোদ পালকে। স্বয়ং কলকাতায় রাধাবিনোদ পালের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করে গিয়েছিলেন তার ৮০ বছরের পুত্রের সাথে। কে এই রাধাবিনোদ পাল?

ছোট করে বলি, রাধাবিনোদ পালের জন্ম ১৮৭৬ সালে, কুষ্টিয়া জেলার সলিমপুর গ্রামে। ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। পড়েন গণিতশাস্ত্র নিয়ে। ১৯০৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর পাস করেন। এরপর কিছুদিন এলাহাবাদে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের অফিসে কেরানীর চাকরি করেছিলেন। বিএল ডিগ্রী পাওয়ার পর চাকরি নিলেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। গণিতের শিক্ষকতা করার পাশাপাশি ময়মনসিংহ কোর্টে ওকালতির চর্চাও চলছিল সমান তালে। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে এলএলএম পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হলেন। ১৯২৪ সালে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করলেন তিনি।

যারা বলছিল, আইন চর্চার সুযোগ পেয়ে শিক্ষকতার মহান ব্রতকে ছেড়ে গেলেন রাধাবিনোদ, তাদের মুখে ছাই দিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ল কলেজে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত আইনের অধ্যাপনা করেছিলেন তিনি। তখনও ভারতে ইংরেজ শাসন চলছে। তার মাঝেই ১৯৪১ সালে তিনি ভারত সরকারের আইন উপদেষ্টা, তারপর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এরপর ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। কাজের চাপ কি নুইয়ে ফেলেছিল রাধাবিনোদ পালকে? ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। ফিরে এলেন বাংলাদেশে, শেকড়ের টানে। সলিমপুরের মাটির ঘ্রাণেই বাকিটা জীবন শান্তিতে কাটাতে চান। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। কি করেছিলেন তিনি?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জাপান আত্মসমর্পণ করলো। অক্ষশক্তির পরাজয়ের ইতিহাস! ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতোই শুরু হয়ে গেল টোকিও ট্রায়াল। জাপানের যেসকল সামরিক নেতা জাপানের সমরবাদের উত্থানের সাথে জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা করা হয়। ট্রাইব্যুনালের ১১ জন বিচারেকের একজন ছিলেন রাধাবিনোদ পাল। বাকি ১০ জন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও ফিলিপাইনের ছিলেন। রাধাবিনোদ পালকে রাখার প্রধান দুটো কারণ ছিল। প্রথমত, তিনি উপমহাদেশের একজন বিজ্ঞ ও নামকরা বিচারক ছিলেন তখনকার দিনে। মিত্রশক্তির এই ট্রাইব্যুনালে অনুন্নত এশিয়ার একজন বাঙালী বিচারককে রেখে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দাবী করা সহজ হতো। দ্বিতীয়ত, উন্নত বিশ্বের নীতিনির্ধারকেরা ভাবতে পারেনি রাধাবিনোদ সজ্ঞানে তাদের মতামতের বিরুদ্ধে যেতে পারেন।

কিন্তু নিরীহ ভেবে বসা এই বাঙালীর তেজস্বীয়তা বুঝতে তাদের দেরি হয়নি। কিন্তু টোকিও পৌঁছে রাধাবিনোদের ভুল ভাঙল। তাকে মেধাবী যোগ্য বিচারক হিসেবে এখানে আনা হয়নি। বরং অবহেলিত দেশের ক্ষুদ্র প্রতিনিধি হিসেবে বিচারকদের প্যানেলে একটা সমতা রক্ষার জন্য আনা হয়েছে। সেখানে রাধাবিনোদ কী মতামত দেন তা কারোর কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল আলাদা একটি হোটেলে। বাকি ১০ জনের জন্য ছিল ভিন্ন ব্যবস্থা। কিন্তু তিনি রায়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালী কি জিনিস, শুধু বাকী ১০ জন বিচারককে নয়, সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি! বিচারের সময় চলে এলে রাধাবিনোদ ভিন্ন মত পোষণ করলেন। জাপান যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধচলাকালে যে কম অপরাধ ঘটায়নি তা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু দোষ শুধু জাপানের একার ছিল না। নাগাসাকি, হিরোশিমাতে বোমাবাজি করে মানবতার অপমান না করলেও জাপান আত্মসমর্পণ করতো। এইসব যুদ্ধাপরাধের জন্য, হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য এই শক্তিশালী দেশগুলোরও তাহলে শাস্তি পাওনা আছে।

তার এই কথায় ফুঁসে উঠল প্যানেল। ধারণা করা হয়, এই রায় ছিল ১,২৩৫ পৃষ্ঠার। তিনি লিখেছিলেন জাপান তার অধিকৃত ভূমিতে যা করেছে তা ন্যাক্কারজনক, কিন্তু যে লোকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ যোগাড় করতে পারেনি ট্রাইব্যুনাল। তিনি তার রায়ে প্রশ্ন রেখেছিলেন—অভিযুক্তদের করা অপরাধ যুক্তরাষ্ট্রের হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে করা অপরাধের চেয়েও বেশি ঘৃণ্য কিনা ?? যুদ্ধচলাকালে ব্রিটিশ ও আমেরিকান বিমানবাহিনী শত্রুদেশের সাধারণ নাগরিকদের সর্বোচ্চ মৃত্যু নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কারে ব্যস্ত ছিল। তার রায় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ফরাসী আর ডাচ বিচারকেরা তা থেকে প্রভাবিত হয়ে কিছুটা নিরপেক্ষ অবস্থানে সরে আসেন। বিচারকার্য শেষ হতে হতে ১৯৪৮ সাল চলে এল। স্বাধীন দেশে ফিরে এলেন রাধাবিনোদ। তার দেশেও তখন চলছে স্বাধীনতা উত্তর অরাজকতা।

তার অবসর নেওয়া আর হয়ে উঠল না। ১৯৫৮ সালে জাতিসংঘের আইন কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন। জাপানেও গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। ১৯৬৬ সালে জাপানের সম্রাট তাকে জাপানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয় সম্মান ‘প্রথম শ্রেণীর পবিত্র রত্ন’ তে ভূষিত করলেন। ১৯৬৭ সালে কলকাতার বাড়িতে চিরতরে অবসর গ্রহণ করেন রাধাবিনোদ পাল। আপনি কি জানেন- বর্তমান সময়ে, জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজের আগ্রাসী ভূমিকা লুকাতে রাধাবিনোদ পালের রায়কে ব্যবহার করে থাকে! রাধাবিনোদ পাল বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এই ঘটনায় খুশি হতেন না। ১৯৫২ সালে হিরোশিমায় এক বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, “ জাপান যদি আবারো সমরবাদের উত্থান চায়, তবে তা হবে, এইখানে, এই হিরোশিমায় শায়িত নিরীহ মানুষদের আত্মার প্রতি চরম অসম্মান।” রাধাবিনোদ পালের জন্যই বলা হয় জাপান আমাদের সবচেয়ে ভাল বন্ধু!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker