জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন কিংবা একজন প্রেমিকের গল্প

মঞ্জুর দেওয়ান: কথায় আছে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। উৎসব প্রিয় বাঙালির সব সময়ই কোন না কোন আয়োজন থাকে। প্রতি মাসেই বিশেষ কোন দিন থাকে। যে দিনগুলো ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। তবে অন্যান্য দিন, মাসের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফেব্রুয়ারি মাসটি আরোও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই মাসেই রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু শুধু যে ভাষার মাস বলে ফেব্রুয়ারি মাস গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাপারটি তেমন নয়। বাংলাদেশ তথা বিশ্ববাসীর কাছে ফেব্রুয়ারিতে বেশ কয়েকটি ‘ডে’ কিংবা দিবস রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ৭ তারিখ থেকে শুরু হয়ে ১৪ তারিখ পর্যন্ত একের পর এক দিবস চলতে থাকে। আজ রোজ ডে, তো কাল প্রোপোজ ডে। চকলেট ডে, হাগ ডে, কিস ডে দিয়ে দিবস থামে ভালোবাসা দিবসে।

 

তবে এতো এতো দিবসের মধ্যে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভালোবাসা দিবস। রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের জন্য নি:সন্দেহে দিনটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে প্রিয় মানুষকে ফুল দিয়ে কিংবা চকলেট দিয়ে, নয়তো কোন উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে থাকেন। চলতি এই ট্রেন্ডের সাথে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিতি থাকলেও আমরা অনেকেই জানিনা কিভাবে ‍শুরু হয়েছিল এই ভালোবাসা দিবস।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে ভালোবাসা দিবসের শুরুর ইতিহাস নিয়ে বেশ কয়েকটি ধারণার মধ্যে ক্লডিয়াস-ভ্যালেন্টাইন দ্বৈরথের কথা বেশ জনপ্রিয়। ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের শাসন চলছিলো। ভালোবাসার বিপরীত শব্দ ছিলেন তিনি। যুদ্ধপ্রিয় সম্রাট এক সমীক্ষা চালিয়ে দেখেন বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিতরা সৈনিক হিসেবে পটু হয়। তাই বেরসিক ক্লদিয়াস সে সময় নিয়ম করেন, কোন নারী-পুরুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। কারণ ক্লদিয়াসের ধারণা ছিলো, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে পুরুষের যুদ্ধ করার সক্ষমতা কমে যাবে। এবং যুদ্ধের প্রতি পুরুষদের অনীহা সৃষ্টি হবে। 

কিন্তু ভালোবাসা তো আর বাঁধা মানেনা। কোন না কোন উপায় ঠিক খুঁজে নেয়! রোমাঞ্চপ্রিয় নারী-পুরুষদের কাছে দেবতা রূপে আবির্ভাব হলো ‘ভ্যালেন্টাইন’ নামক এক খ্রিষ্টান পুরোহিতের। রোমের খ্রিষ্টান গির্জার পুরোহিত ভ্যালেন্টাইন, রাজা ক্লডিয়াসের নির্দেশ না মেনে গোপনে বিবাহ বন্ধনের কাজ চালিয়ে যায়। ভ্যালেন্টাইনের এমন দুঃসাহসিক কাজের কথা খুব বেশি দিন চাপা থাকেনা। রোমান সম্রাটের কানে যাওয়ার পর তাকে ধরে আনা হয়। রাজার আদেশ না মানার কারণ জানতে চাইলে, খ্রিষ্ট ধর্মের কেউ বিয়ে করতে চাইলে তিনি মানা করতে পারবেন না বলে জানান। ভ্যালেন্টাইনের এমন জবাবে রাজা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কারাগারে থাকাকালীন ভ্যালেন্টাইনকে ক্লডিয়াসের প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্ম পালনের আদেশ দেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলেন। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন ক্লডিয়াসের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তখন ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। ক্লডিয়াসের নির্দেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সেই থেকেই ভ্যালেন্টাইনস ডে পালিত হয়। 

আবার অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ধর্ম প্রচারের অভিযোগে ক্লডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। এছাড়া বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আর দিনটি ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস ঘোষণা করেন।

অন্য আরেকটি গল্প এমন; সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন রোমান সম্রাটের অত্যাচার, নিগ্রহের থেকে খ্রিস্টানদের পালাতে সাহায্য করতেন এবং সেই কারনেই মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত হন তিনি। কথিত আছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন তার কারারক্ষকের কন্যার প্রেমে পড়েন এবং তিনি তার প্রেমিকাকে ভালবাসার শুভেচ্ছা পাঠান। মারা যাওয়ার আগে তিনি তার প্রেমিকাকে একটি চিরকুট লিখে যান। যে চিরকুটের শেষ বাক্যে লেখা ছিলো “তোমার ভ্যালেন্টাইনের কাছ থেকে” বা “From your Valentine,”। সেই থেকেই এই বৈশ্বিক দিবসের শুরু।

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের গল্প কোনটা সত্যি তা নিয়ে হয়তো দ্বিমত আছে। তবে মধ্যযুগ থেকেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ডে এবং ফ্রান্সের মানুষের কাছে এক ত্রিকাল পুরুষের নাম। যিনি ভালবাসা, প্রেম, বীরত্ব এবং সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন সেই সময় থেকেই। ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বব্যাপী সমান জনপ্রিয় এই দিবস। তাই ১৪ই ফেব্রুয়ারি আসলে আমরা প্রিয় জনকে বলি ‘হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে’!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker