বিনোদনসিনেমা ও টেলিভিশনহোমপেজ স্লাইড ছবি

হলিউডের যে সিনেমা বানানো হয়েছিলো সত্যজিৎ রায়ের স্ক্রিপ্ট চুরি করে!

ইয়াসিন চৌধুরী: বিশ্ব সিনেমার সবচেয়ে লজ্জাজনক স্ক্রিপ্ট চুরির ঘটনার জন্ম দেন বিশ্বখ্যাত পরিচালক স্টিফেন স্পিলবার্গ এবং মাইক উইলসন। যার কাছ থেকে চুরি করেছেন তিনি আমাদের ‘দ্যা গ্রেট সত্যজিৎ রায়। এই স্ক্রিপ্ট চুরি না হলে হয়তো বহু আগেই বাঙালির ঘরে কয়েকখানা অস্কার চলে আসতো।

E.T. The Extra-Terrestrial মুভির নাম শোনেননি, এমন মুভিপ্রেমীর সংখ্যা হয়তো হাতে গোণা। এটি ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি আমেরিকান সায়েন্স ফিকশন মুভি যার পরিচালক এবং সহ-প্রযোজক হলেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। মুভিটির লেখক হিসেবে মেলিসা ম্যাথিসনকে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনিভার্সাল পিকচার কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত এই মুভিটি ছিল ব্লকবাস্টার হিট এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত টানা দশ বছর ধরে ছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা মুভি।

১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের একটি থিয়েটারে সত্যজিৎ রায়ের সাথে দেখা হয় বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান গল্পের রচয়িতা আর্থার সি ক্লার্কের। তখন ক্লার্কের লেখা একটি মুভি 2001: A Space Odyssey এর প্রদর্শনী চলছিলো। সত্যজিৎ ক্ল্যার্ককে জানান তিনিও একটা কল্পবিজ্ঞানের গল্পের ওপর সিনেমা বানাবেন। গল্পটা কিছুটা এরকম, ভিনদেশি এক জীব পৃথিবীতে আসবে এবং তার সাথে বন্ধুত্ব হবে এক বাচ্চা ছেলের। এতক্ষণ হয়তো বুঝে গিয়েছেন E.T ছবির সাথে গল্পের মিল। আইডিয়াটা ক্ল্যার্কের পছন্দ হলো, তিনি সত্যজিৎ রায় কে এই ছবি বানানোর সর্বাত্মক সহোযোগিতার আশ্বাস দিলেন।

১৯৬৬ শেষ দিকে সত্যজিৎ কলকাতায় চলে এসে স্ত্রিপ্টের ওপর কাজ শুরু করলেন। এই স্ক্রিপ্টের গল্পের ধাচের জন্য তিনি বেছে নিলেন ১৯৬২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় তারই প্রাকাশিত গল্প ‘বঙ্কু বাবুর বন্ধু’। ঐ দিকে ক্লার্ক তার বন্ধু মাইক উইলসনকে সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞানের গল্পের ওপর ছবি বানানোর কথা জানালেন। উইলসন মিঃ রায়ের সাথে যোগাযোগ করেন। এবং তাকে বললেন সিনেমাটা অনেক বড় স্কেলে হলিউডে তৈরী করা উচিৎ। মিঃ রায় দুটি শর্তের বিনিময়ে ছবিটি হলিউডে বানাতে রাজি হলেন; প্রথমত এর শ্যুটিং হবে গ্রাম বাংলায়, দ্বিতীয়ত মুভি বানাতে হবে বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষায়।

ছবিটির নাম দেয়া হলো ‘এ এলিয়্যান’১৯৬৭ তে হঠাৎ একদিন মাইক উলসন মিঃ রায়ের কলকাতার বাড়িতে হাজির। যতদিন না স্ত্রিপ্ট লেখা শেষ হচ্ছে তিনি এক পা ও নড়বেন না। ছবিটির মূখ্য অভিনেতা হিসেবে মিঃ রায়ের পছন্দের তালিকায় ছিলেন পিটার সেলার্স। উইলসন সেটা জানতে পেরে যোগাযোগ করলেন পিটার সেলার্সের সাথে। স্ত্রিপ্ট লেখার শেষের দিকে খবর এলো পিটার সেলার্স কাজ করতে আগ্রহী। পিটার সেলার্সকে স্ত্রিপ্ট শোনাতে মিঃ’ রায় আর উলসন পাড়ি জমান প্যারিসে। পিটার সেলার্সকে কনফার্ম করে কলকাতায় ফিরে আসার একমাস পর মিঃ রায় উইলসনের কাছ থেকে খবর পেলেন বিখ্যাত কলোম্বিয়া পিকচার্স মুভিটি বানাতে আগ্রহী।

ঐ দিকে উইলসন গোটা হলিউডে মিঃ রায়ের ‘এ এলিয়্যান’ ছবির স্ক্রিপ্ট বিতরণ করে ফেলছেন। কপিরাইটে নাম দেয়া হয়েছে সত্যজিৎ রায় এবং মাইক উইলসনের। মিঃ রায় তো এই শুনে ক্ষেপে আগুন, চলে গেলেন হলিউডে। উইলসন মিঃ রায়কে বোঝালেন যেহেতু মিঃ রয় হলিউডে নবাগত সেহেতু তার নামের পাশে উইলসনে নাম যোগ করা হয়েছে। ছবি প্রস্তত হয়ে গেলে নাম কেটে দেয়া হবে। মিঃ রায় কলকাতায় ফিরে এসে ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবির কাজে মন দিলেন। মিঃ রায় পরের বছর হলিউডে গিয়ে তার স্ক্রিপ্টের খোঁজ নিতে গিয়ে জানলেন- মাইক উইলসন অলরেডি এই ক্রিপ্টের ওপর ১০হাজার ডলার এডভান্স নিয়ে নিয়েছে এবং নিজেকে এসোসিয়েট প্রডিঊসার হিসেবে জাহির করছে।

মিঃ রয় হতাশ হয়ে ফিরে এলেন কলকাতায় । “এ এলিয়্যান’ বানানোর হাল ছেড়ে দেন।অনেক কাঠখড় পোড়ায়ে ১৯৮২ সালে মাইক উলসন স্টিফেন স্পিলবার্গকে দিয়ে বানিয়ে নেন সত্যজিৎ রায়ের সেই স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘এ এলিয়্যান’। কিন্তু নাম দেয়া হয় E.T. The Extra-Terrestria

সেই বাঙালি কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের এক শ’তম জন্মদিন আজ। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা। সেই সঙ্গে নাটক, সাহিত্য, চিত্রকলা এমনকি সংগীতে ছিল তার অবাধ বিচরণ। বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন সত্যজিৎ। জন্মদিনে বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই মহারাজাকে জানাই সেলাম!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker