ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

নেত্রকোণা: সবুজের বুকে এক টুকরো রঙিন পাহাড় ও অন্যান্য!

মৃন্ময়ী মোহনা: নেত্রকোণা- ‘চোখের কিনারা’ জেলাটির এমন নাম শুনে বেশ সাহিত্যরস সম্পন্ন মনে হলে কী হবে, এই নামকরণের পিছনে রয়েছে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ব্রিটিশ সাহেবের বাংলা উচ্চারণ সঠিকভাবে করতে না পারার করুণ ইতিহাস! এ জায়গায় পূর্ব নাম ছিল নাটোরকোনা।বেচারা ইংরেজ সাহেব তা বলতে পারতোনা – বলত নেটেরকোনা।সেখান থেকেই পরিবর্তিত হয়ে এখন এ জেলার নাম নেত্রকোণা। ।সোমেশ্বরী এ জেলার নদীর নাম। যাতায়াত ব্যবস্থা খুব উন্নত না হলেও ভ্রমণপিপাসু মানুষ অার ফেসবুকের ট্রাভেল গ্রুপগুলোর কল্যাণে নেত্রকোণা পরিণত হচ্ছে দারুণ পছন্দের বেড়ানোর জায়গা হিসেবে। এর মূল কারন হল নেত্রকোণা  সদর থেকে  প্রায় ৫০ কি.মি দূরে অবস্থিত দূর্গাপুরের চীনামাটির পাহাড়। তিন চারটে বড় বড় পাহাড় অার তার নীচে ছোট্ট একটা সবুজ জলের লেক দেখে অতি পাষানেরও  মন গলে যাবে বৈকি!

মূলত চীনামাটি সাদা রঙ হলেও  স্থানে স্থানে  গোলাপি, হলুদ, ধূসর, সবুজ রঙের অাভা থাকায় পাহাড়গুলোকে রঙিন বলেই মনে হয়! তবে দুঃখের বিষয় হল, বিভিন্ন সিরামিক কোম্পানি এগুলো কিনে নেয়ায় দিন দিন পাহাড়গুলো ছোট থেকে ছোটতর হচ্ছে।হয়তো একদিন সব পাহাড় মিলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়ে যাবে সমতল ভূমির।সেইদিন যেন কখনো না অাসে। অাগেই বলেছি, এ জেলার নদীর নাম সোমেশ্বরী। অাহা! বড় চমৎকার এর রূপ। নদীর রূপোলী জল অার ওপারে ভারতের মেঘালয়ের অাকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে মনটা শীতল হয়ে যায়। জিরো পয়েন্টে বিজিবির তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠেছে গোছানো একটা জায়গা- ঘাটের সিঁড়িতে বসে নদী – পাহাড়ের যুগলবন্দী সৌন্দর্য অবলোকনের জন্য।

নদীতে ডিঙি নৌকায় ঘোরার ব্যবস্থাও অাছে। জিরো পয়েন্টে গিয়ে অারো একটি জিনিস চোখে পড়ার মত, তা হল, অনেক অাদিবাসী নারী, যারা সীমান্ত পাড় হয়ে ভারত থেকে নানা  জিনিস(সাবান,লবণ,চিনি,শ্যাম্পু, স্নো,বাম ইত্যাদি) নিয়ে এসে দেশে বিক্রি করে।ছবি তোলাতো কঠোরভাবে নিষিদ্ধই, তাদের সাথে একটু কথা বলারও সুযোগ নেই।তারাও কোন কথা বলবেনা, বিজিবিও কথা বলতে দেয়না। ছবি তুলতে যাওয়া বা কথা বলতে গিয়ে তাদের বিব্রত না করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ!

 

দুর্গাপুর মোটামুটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত জনপদ ; কেননা, সেখানে রয়েছে অনেক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী অাদিবাসী।তাই অনেক চার্চ অাছে। কয়েকটা খ্রিস্টান কবরস্থানও রয়েছে। সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, রাণীখং একটা দর্শনীয় স্থান এখানকার। অারেকটা জিনিসের কথা না বললেই নয় সেটা হল ওয়াচ টাওয়ার। গারো সম্প্রদায় এ এলাকার প্রধান অাদিবাসী হলেও হাজং খাসিয়াও রয়েছে বেশ।তাদের জীবন যাপন অার সংস্কৃতির নানা দিক প্রদর্শনের হেতু গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যাদুঘর।এখানে প্রায় প্রতিদিনই থাকে নানা অনুষ্ঠানের অায়োজন।

অাদিবাসীদের গ্রাম- সেও এক দেখার মত জায়গা। ভারতের সীমানাঘেঁষা সারি সারি ছোট  বাড়িগুলো মনটা ভরিয়ে দেবে।চমৎকার এ জায়গাগুলোতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা কিন্তু খুব চমৎকার নয়। ট্রেন এবং বাস দু পথেই যাওয়া যায়। ট্রেনের নাম হাওড় এক্সপ্রেস অার বাসের নাম মা-মনি, সৌখিন। ট্রেনে গেলে নেমে পড়তে হয় নেত্রকোনা স্টেশনে অার তারপর ডেউয়াডেমরা ঘাটে ( অটোতে করে) ঘাট পাড় হয়ে অাবার সারাদিনের জন্য অটো / রিক্সা ভাড়া করে সবগুলো স্পটে ঘোরা যায়। ভাড়া রিক্সা(ইঞ্জিনচালিত)  ৭০০-৮০০/-  অটো – ১২০০/১৫০০/-তবে সব স্পট ঘুরে দেখতে চাইলে কিন্তু শুরু করতে হবে  খুব ভোরে। অার একটা থেকে অারেকটা স্পটের দুরত্বও বেশি।ভ্রমণের সময় এটাও মাথায় রাখতে হবে বৈকি।

বাস মহাখালী থেকে ছাড়ে। বাসে গেলে নদীর ওপারেই নামিয়ে দেয়। ঘাট পাড় হবার ঝামেলা নেই।তবে রাস্তা খুবই খারাপ। খানা খন্দে ভরপুর রাস্তায় কিছুদূর এগুনোর পর শরীর মন বিষিয়ে উঠলে কিন্তু কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়!

দীর্ঘ ভ্রমনের পর ভাঙা হাড়গোর জোড়া লাগাতে তো রেস্ট হাউজের কথা বলতে হয়- নাকি? হুম সে কথাই বলছি।ঘাটের ওপার থেকে ৭/৮ কি.মি দূরেই অাছে YWCA অার YWMA রিসোর্ট। অাগে থেকেই বিকাশের মাধ্যমে টাকা দিয়ে বুক করে যেতে হয়। এছাড়াও অাশেপাশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক হোটেল গড়ে উঠেছে।

এত চমৎকার ও অাকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলোকে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা অার নানা অব্যবস্থাপনা রুদ্ধ করে রেখেছে পুরোপুরিভাবে বিকশিত হতে। এ বিষয়গুলো নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের ভাবার সময় তাই এখনই।

জীবন হোক সুন্দর, জীবন হোক ভ্রমণময়, ভ্রমণ হোক অানন্দময়।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker