ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

তাজিংডং বিজয় কিংবা ভয়ংকর সুন্দরের মায়ায়!

বাশার আল আসাদ: তারুণ্য সব সময় দুর্বার। দুর্গম পথকে জয় করাই তারুণ্যের নীতি। দুর্গম পাহাড়ের দুঃসাহসিকতার গল্প এখন অনেকেরই জানা । দিনে দিনে যতো দুঃসহ অভিযানের কথা সমাজে ছড়িয়ে পড়লে তারুণ্য নতুন কিছু শিখবে। ভবিষ্যতের তারুণ্য এতে উৎসাহী হবে। যার সুফল আমাদের তারুণ্য অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। পাহাড় আরোহণ শুধুই পাহাড় আরোহণ তা কিন্তু নয়, এই দুঃসাহসিকতার সুফল সারা জীবনের পাথেয়। পাহাড় আরোহণে ধৈর্যশীল ও পরোপকারী হতে হয়। যা সারজীবনের অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজ করবে। পর্বত আরোহণে কেউ বিপদে পড়লে তাকে নিয়ে নিচে নেমে আসাটাও একটি সহযোগিতার পরিচয় দেয়। তাই, আমাদের পাহাড় আরোহণে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটানো উচিত। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পাহাড় আছে যা তারুণ্য কে সব সময় ডাকে তাহার সান্নিধ্যে আসার জন্য। বাংলাদেশের আলোচিত পাহাড় গুলোর মধ্যে তাজিংডং পাহাড় প্রেমীদের কাছে একটি ভালোবাসা নাম। যার সু-উচ্চ বুকের উপর গিয়ে বাংলার সৌন্দর্য দেখার জন্য বাংলার দামাল ছেলে মেয়েরা অধীর আগ্রহে থাকে। আজ আমরা জানবো কিভাবে তাজিংডং জয় করতে হবে সেই গল্প।

বান্দরবানের থেকে দিনের প্রথম প্রহরেই বাস ধরে রওনা হতে হবে থানচির পথে। পাহাড়ি রাস্তায় চলবে থানচির মিনি বাস আর মনে হবে স্বর্গের ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন। পাহাড়ের কোল জুড়ে কুয়াশার বিছানা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাবে একের পর এক উঁচু সব পাহাড়। থানচি বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু সড়কপথ। চলতে চলতে বাসের জানালা দিয়েই চোখে পড়ে পাহাড়ের চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে মেঘেরা। দিনের আলো পাহাড়ের বিস্তৃত আকাশে ঘোরাফেরা দেখে মনে হবে তারা স্বর্গের  ভিতরে খেলা করছে। দিনের শেষের দিকে যাত্রা বিরতির আগে দেখতে পাবেন পশ্চিম আকাশের দিগন্তে লুকিয়ে যাওয়া সূর্যের রক্তীম আলো। সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা এতো বড় একটা যাত্রা পথে একটুখানির জন্যও কারো ক্লান্তি অনুভব হবে না পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে।

গোধূলি বেলায় বাস থেকে নেমে গরম চায়ে চুমক দিয়ে আবার যাত্রা শুরু করতে পারেন। যদি পূর্ণিমার সময় যান তাহলে পথ চলতে চলতে হঠাৎ চোখে পড়তে পারে পাহাড়জুড়ে নামছে জোছনার দল। যতদূর চোখ যায় কেবল পাহাড়ের বিস্তৃর্ণ মানচিত্র। ধবধবে জোছনার আলোয় আলোকিত গোটা পাহাড়ি জনপদ। পূর্ণিমায় পাহাড়ের এমন চিত্র কল্পনার রংও ছাড়িয়ে যায়। হাজারও তারার দল সবুজ পাহাড়ের আকাশজুড়ে, নিচের পৃথিবীতে শুধু জেগে আছে শতশত পাহাড়ের ভাঁজ, উপত্যকা, অরণ্যভুমি, খরস্রোতা নদী, ছোট-বড় ঝর্না, জুম ক্ষেত, ফুল-পাখি। বিস্তৃত অরণ্যভূমিতে জেগে থাকা হাজারও অচেনার সৌর্ন্দয্যের পথ পেরিয়ে থানচি বাজার পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হতে পারে। আগেই থেকে থানচিতে গাইড ঠিক করে রাখা ভালো। থানচির সাঙ্গু নদীর পাড়ে একটা পাহাড়ি খাবার হোটেলে খেয়ে ক্ষুধা মেটাতে পারেন। যদি পারেন তাহলে সন্ধ্যার আগেই থানচি থেকে রওনা হতে হবে। কারণ সন্ধ্যা হয়ে গেলে বিজিবি অনুমতি দিবে না। তবে রাতে থানচিতে থেকে রাতের সাঙ্গু পারের অন্যরকম পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন।

ভোরের থানচির চারপাশের মনোরম পরিবেশ মনকে কোমল করে তুলবে। দীর্ঘ পথ ট্র্যাক করতে হবে, তাই ভোরেই রওনা হওয়া ভালো। এবারের গন্তব্য দেশের অন্যতম শীর্ষ পাহাড় চূড়া তাজিংডং (সরকার স্বীকৃত বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়)। ভোরের আলোয় যাত্রা পথে পাহাড়ের সবুজ রাঙানো কুয়াশার মোড়ানো পথ বেশ উপভোগ্য। উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ, পথে পথে ছোট জুম ঘর। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে নামছে সকালের নির্মল সোনালি সূর্যেরের প্রথম রশ্মি। পথ চলতে চলতে পাহাড়ের উপর থেকে চোখে পড়ে বোডিং পাড়া। থানচি থেকে রওনা হয়ে প্রথম পাহাড়ের দেখা পাবেন। পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠেছে ঝিরি পাড়ের এই বোডিং পাড়া। ঝিরির ঠান্ডা জলের পরশ নিয়ে কিছুুক্ষণ পরেই যাত্রা করতে হবে তাজিংডংযের পথে। বোডিং পাড়ার দীর্ঘ খাড়া পাহাড় পেরিয়ে যেতে এই পাহাড়ের উচ্চতা দেখেই চোখ কপালে উঠবে। ক্রমাগত উতপ্ত হয়ে ওঠা দিনের সূর্য, হাঁটার গতিকে কমিয়ে দিয়েছে ক্রমাগত। ভোরের কুয়াশা সকালের কিরণ, ভর দুপুরের প্রচুর গরম এসব নিয়েই পথ চলতে হবে উঁচু নিচু পাহাড়ের সরু পথ বেয়ে। জুম ক্ষেতের পথ পেরিয়ে কখনও ঝিরি, ক্যাসকেড বেয়ে আসা ঠান্ডা জলের স্রোত, বুনো পথের ট্রেইল এসব পায়ে ঠেলে পথ চলতে হবে তাজিংডংয়ের পথে।

দুপুরের শেষ দিকে পৌঁছে যাবেন শেরকর পাড়ায়। বলা যায় এটি তাজিংডংয়ের বেইস ক্যাম্প। পাড়ায় বম আদিবাসীদের বসবাস। ভর দুপুরে কিছুটা বিশ্রাম নিয়েই আবার যাত্রা শুরু করতে হবে। শেরকর পাড়া থেকে তাজিংডং দুই ঘণ্টা সময় লাগে। তবে পুরোটা পথ উঠতে হবে। দুপুরের শেষ দিকে পা বাড়াতে হবে তাজিংডংয়ের পথে। বুনো পথে ছড়ানো ভয়ংকর সৌর্ন্দয্যের মালা। কোথাও কোথাও বুনো ফুলের দল, চেনা-অচেনা কীটপতঙ্গ, কান ভারি করা পাহাড়ি পোকার তীব্র শব্দ। এসব দেখতেই দেখতেই পা ফেলতে হবে। তীব্র্র গরমে প্রায়ই গলা শুকিয়ে যাওয়ার মতোই হবে। কিন্তু যদি সাথে এনার্জি ড্রিংকস থাকলে খেলে দেহের ভিতরে এনার্জি পাবেন এবং পাহাড়ি পথ চলতে কষ্ট কম হবে। পুরোটা পথে আমাদের চেনা সভ্যতার কোনো চিহ্ন মাত্র পাবেন না। পথ চলতে চলতে একসময় কিছুটা দূর থেকে চোখে প্রায় সারি করা তিনটি চূড়া, সবোর্চ্চটা দেখে বুঝা যাবে, নর্থ চূড়া বলেই ট্রেকারদের কাছে পরিচিত, এটি তাজিংডংয়ের সেন্ট্রাল চূড়া থেকেও উঁচু।

ক্লান্ত শরীরে তাজিংডং এর চূড়ায় উঠে মনের দীর্ঘশ্বাসটা ছাড়তে ছাড়তে মনে হবে যেন একটা সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন। সবোর্চ্চ চূড়া থেকে নিচের পাহাড়ি খাঁজ, জুম ক্ষেত, চোখ সীমানায় বন্দী হওয়া পাহাড়ি পাড়া সবকিছুকে তুচ্ছ মনে হবে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে কেবল মনে হতেই পারে পাহাড়কে কখনও জয় করা যায় না, শ্রদ্ধায় অবনত হতে হয়। তাজিংডংয়ের চূড়া দূর আকাশের গায়ে হেলান দেওয়া পাহাড় আর মেঘমল্লার দল দেখে মনে হবে এই বিস্তৃত অরণ্যভূমি পেরোলেই যেন ধরা দিবে নতুন কোনো স্বর্গের স্বপ্ন। মন চাইবে আকাশ পানে মুখ তুলে দু’হাত মেলে চিৎকার করে বলি ভালোবাসি বাংলা তোমার এই অপরুপ সৌন্দর্য কে,ভালোবাসি বাংলাদেশ তোমাকে।

প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য জেনে রাখা ভালো

বছরের যেকোনো সময় তাজিংডং ঘুরে আসতে পারেন। বর্ষায় সবচেয়ে সুন্দর। তবে এই সময় পাহাড়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বলে ট্র্যাকিং করা বেশ কষ্টকর। বান্দরবানের থানচি বাস স্টেশন থেকে প্রতিদিন বাস ছাড়ে থানচির পথে। তাছাড়া রিজার্ভ চান্দের গাড়িতে থানচি পৌঁছানো যাবে। থানচি থেকে বোডিং পাড়া, শেরকর পাড়া হয়ে তাজিংডং পৌঁছানো যায়। শেরকর পাড়ায় রাত যাপন করতে হবে। তাবু নিলে গেলে তাতেও রাত কাটানো যায়। খেয়াল করবেন ট্র্যাকিংয়ের প্রস্ততি নিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য জুম-জুতা অথবা ট্রেকিং সু নিতে পারেন। বান্দরবান বা থানচি বাজারে জুম-জুতা পাওয়া যায়। অবশ্যই ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক নিতে হবে। মশারোধী ক্রীম, গামছা, ছুরি, স্যালাইন, শুকনো খাবার এসব নেওয়া জরুরি। প্রকৃতি রক্ষা করতে হবে সবার আগে। তাই পাহাড়ি ট্রেইলে কোনো প্লাস্টিক বা অপচনশীল কিছু ফেলবেন না।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker