ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

মেঘের রাজ্য মেঘালয়

বাশার আল আসাদ: চারদিকে উঁচু পাহাড় আর সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্না, পাশাপাশি মেঘেদের অবিরাম ছোটাছুটি। কেউ যেন তাদের কানে কানে শুনিয়ে দিচ্ছে ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’। কখনো মেঘের শীতল স্পর্শ আপনার মনে জাগিয়ে তুলতে পারে অন্য রকম আনন্দ। বলছি বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্তবর্তী ভারতের একুশতম রাজ্য মেঘালয়ের কথা। পাহাড়, ঝর্না, বৃষ্টিস্নাত সবুজ প্রকৃতি ইত্যাদি মিলে প্রকৃতি যেন আরেক স্বর্গ রচনা করেছে এখানে। বছরে ছয় থেকে সাত মাস মেঘালয় মেঘে ঢাকা থাকে। মেঘেদের খেলাঘর এই রাজ্যটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসে।

মেঘালয় হচ্ছে মেঘেদের বাড়ি। কবিদের অনুপ্রেরণা ও চিত্রকরদের ক্যানভাস। বেড়ানোর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় জায়গা। মেঘালয় ছবির মত সুন্দর একটি রাজ্য। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, মেঘের সমাবেশ, জীবনের কিছু রঙিন সময় কাটানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা। মেঘালয় ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত উত্তর পূর্ব অঞ্চলে অত্যতম একটি সুন্দর রাজ্য। ২১ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে এটিকে রাজ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়। চোখ জুড়ানো পাহাড়ি দৃশ্য আর শীতল আবহাওয়ার কারণে এ রাজ্যের রাজধানী শিলং শহরকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শহরটির উচ্চতা প্রায় ১,৫০০ মিটার। বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান চেরাপুঞ্জিও মেঘালয়েই অবস্থিত। এ রাজ্যের ভৌগলিক কাঠামো অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, সিকিম ও হিমাচল প্রদেশের মতো। তবে উল্লেখিত তিনটি জায়গার তুলনায় মেঘালয়ে বেড়ানোর খরচ তুলনামূলক অনেক কম। পুরোটাই ঘন সবুজ বনানীতে আচ্ছাদিত এই রাজ্যের নয়নাভিরাম পাহাড়ি দৃশ্য, দৃষ্টিনন্দন লেকসমূহ, নদী অববাহিকা, বিচিত্র প্রজাতির পশুপাখি সবকিছুই এককথায় অসাধারণ।

কখন যাবেন

আগেই বলেছি মেঘের রাজ্য মেঘালয়। সুউচ্চ পাহাড়, সুন্দর সুন্দর ঝর্না, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, খাসিয়াদের জীবনব্যবস্থা সর্বোপরি মেঘেদের অপরূপ খেলা দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে এই রাজ্যটিতে। মেঘালয়ে সারা বছর পর্যটকদের আগমন ঘটে তবে সেখানে পিক সিজন এবং অফ পিক সিজন বলে কথা আছে। পিক সিজন হলো মার্চ মাস থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি। এ সময় প্রচুর পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন, তাই সবকিছুর দাম বেশি থাকে। যেমন ভ্রমণ খরচ, হোটেল ভাড়া, খাবার খরচ এ সময় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে মেঘালয় যাওয়ার সহজ উপায় হলো ঢাকা থেকে সিলেট। তারপর সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করা। মেঘালয় যেতে হলে প্রথমে বাসে বা ট্রেনে করে আপনাকে যেতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট শহর থেকে বাসে বা সিএনজি করে যেতে হবে তামাবিল সীমান্ত চেকপোস্ট।  ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করেই যে ছোট্ট শহরটিতে প্রবেশ করবেন, তার নাম ডাউকি। সীমান্ত পার হয়েই আপনি ডাউকি যাওয়ার গাড়ি পাবেন। ডাউকিতে নাশতা সেরে আপনাকে যেতে হবে মেঘালয় রাজ্যটির রাজধানী শিলং। জিপে করে যেতে সময় লাগবে আড়াই থেতে তিন ঘণ্টা। তবে যাত্রাপথ আপনার কাছে একটুও বিরক্তিকর লাগবে না বরং উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ আপনাকে মোহিত করবে। হয়তো বা পথেই মেঘের রাজ্যের মেঘেদের সাক্ষাৎ পেয়ে যেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

শিলং পাহাড়ি শহর। শিলংয়ের বড়বাজার ও পুলিশবাজার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় দুটি এলাকা। কারণ পর্যটকদের থাকার হোটেলগুলোর অধিকাংশই বড়বাজার ও পুলিশবাজার কিংবা তার আশপাশে অবস্থিত। তবে পুলিশবাজার তাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়, কারণ এখান থেকে থেকে সহজেই বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটগুলোতে যাওয়ার গাড়িগুলো ছেড়ে যায়। শিলংয়ের হোটেলগুলোতে আপনি দিনপ্রতি ৮০০ রুপি থেকে ১০ হাজার রুপির মধ্যে রুম পাবেন। শিলংয়ের হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম হোটেলগুলো হলো ইডেন রেসিডেন্সি, হোটেল ব্রডওয়ে শিলং, হোটেল আলপিন কন্টিনেন্টাল, হোটেল এসেম্বলি, হাই উইন্ডসহ অসংখ্য থাকার হোটেল এখানে আছে। অনলাইনের মাধ্যমেও রুম বুকিং দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে এই হোটেলগুলোতে।

পরিবহন:

ভাড়া করা ট্যাক্সিই শিলং ও চেরাপুঞ্জিতে বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো বাহন। তবে বড় দল হলে শিলং থেকে বাস ভাড়া করেও চেরাপুঞ্জি বেড়িয়ে আসা যায়। যারা অহরহ কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকায় বেড়াতে যান তাদের জন্য বলে রাখি, শিলং বা চেরাপুঞ্জিতে থাকা, খাওয়া এবং গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর খরচটা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে কিছুটা বেশি। তামাবিল সীমান্তে ট্রাভেল ট্যাক্স দেওয়ার মতো ব্যাংক নেই, এ জন্য বেশ খানিকটা দূরে যেতে হতে পারে। তাই ঢাকা থেকেই ট্রাভেল ট্যাক্স পরিশোধ করে যাওয়া ভালো।

সর্বাধিক দর্শনীয় পর্যটন স্থান গুলোর বিবরণ:

শিলং পিক ও সোহপেতবিনেং পিক

এই দুটি উঁচু জায়গা শিলং শহর থেকে যথাক্রমে ১০ কিলোমিটার ও ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শিলং পিক হচ্ছে সারা মেঘালয় রাজ্যের উচ্চতম জায়গা যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৯৬১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ঘন সবুজ বনানী সৌন্দর্য বাড়িয়ে একে একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। পাখির চোখে গোটা শিলং শহরকে দেখতে পারবেন এখান থেকে। মন চাইবে পুরো দিনটাই এখানে কাটিয়ে দিতে। সোহপেতবিনেং পিকের উচ্চতা ১,৩৪৩ মিটার। খাসিয়া, জৈন্তিয়া, ভই প্রভৃতি সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি তীর্থস্থান।

ওয়ার্ডস লেক ও উমিয়াম লেক

শিলং শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত ওয়ার্ডস লেক একটি কৃত্রিম লেক। এটি পলক লেক নামেও পরিচিত। বিচিত্র বর্ণের সব ফুল আর পাইন গাছ ১০০ বছরের পুরনো এই লেকের প্রধান আকর্ষণ। চোখ জুড়ানো উমিয়াম লেক শিলং শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। এর আরেকটি নাম হচ্ছে বড়পানি লেক। নৌকা বাওয়া, নৌকা চড়া, স্কিয়িংসহ আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকায় জলক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য এটি একটি চমৎকার স্থান।

পার্ক সমূহ

সারা মেঘালয় রাজ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চমৎকার সব পার্ক। তবে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের সমাবেশ ঘটে শিলং শহরে অবস্থিত লেডি হায়দারি পার্কেই। রাজ্যের প্রথম লেডি এবং আসামের গভর্নরের স্ত্রী হায়দারির নামেই নামকরণ হয়েছে পার্কটির। এক কিলোমিটারেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত পার্কটিতে রয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা, যেখানে দেখা মিলবে ৭৩ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির সরীসৃপ, ভালুক, লোপার্ডসহ আরও বন্যপ্রাণীর। এর পাশাপাশি বিপুল প্রজাতির ফুল আর আকর্ষণীয় বৃক্ষরাজি তো আছেই। মেঘালয়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পার্কগুলো হচ্ছে চেরাপুঞ্জির থাংখারাং পার্ক ও ইকো পার্ক, রি ভই জেলার নেহেরু পার্ক, খারসাতি পার্ক ও থ্রিলস ফান পার্ক এবং জৈন্তিয়া হিল জেলার লালং পার্ক ও লুকসি (কুলপি) পার্ক।

ঝর্না সমূহ

হ্যাপি ভ্যালি এলাকায় অবস্থিত সুইট ফলস হচ্ছে মেঘালয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঝর্নাগুলোর একটি। শিলং শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রেংথিয়াম ফলস আরেকটি ফিতাসদৃশ ঝর্না। সুনা ভ্যালিতে অবস্থিত বিশপ ও বিডেন ফলস হচ্ছে আরও দুটি নজরকাড়া ঝর্না। এলিফ্যান্ট ফলস ও স্প্রেড ঈগল ফলসও সৌন্দর্যের বিচারে পিছিয়ে নেই। তবে সবগুলো দেখার মতো সময় না থাকলে বেছে নিন এলিফ্যান্ট ফলসকেই।

শিলং গলফ কোর্স

ছবির মতো সুন্দর শিলং গলফ কোর্স ভারতের মধ্যে তৃতীয় প্রাচীনতম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গলফ অ্যাসোসিয়েশন ও জাদুঘর একে ‘গে­নঈগল অব দ্য ইস্ট’ হিসেবে গণ্য করে। ১৮৮৯ সালে নয় হোলের গলফ কোর্স হিসেবে যাত্রা করলেও ১৯২৪ সালে ক্যাপ্টেন জ্যাকসন ও সি.কে. রোডস এটিকে ১৮ হোলে রূপান্তর করেন। পাইন ও রডোডেনড্রন গাছে আচ্ছাদিত এক উঁচু-নিচু উপত্যকায় অবস্থিত গলফ কোর্সটি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৫,৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।

 চেরাপুঞ্জি

চেরাপুঞ্জির অবস্থান শিলং শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত চেরাপুঞ্জি বিশ্বের সবচেয়ে আর্দ্র স্থান হিসেবে পরিচিত। এক বছরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের হিসেবে চেরাপুঞ্জি ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে’ অন্তর্ভুক্ত। দারুণ সব উপত্যকা ও নদী চেরাপুঞ্জির সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। সারা বছরই ভ্রমণ করা যায় জায়গাটিতে। শিলং থেকে কার অথবা পাবলিক বাসে করে সকালে চেরাপুঞ্জি গিয়ে আবার বিকেলে ফেরা সম্ভব। আর যদি সব আকর্ষণীয় জায়গা খুব ভালোভাবে ঘুরে দেখতে চান তাহলে একরাত থাকতে পারেন। চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট, কনিফেরাস রিসোর্ট, পলো অর্কিড রিসোর্ট, সোহরা প্লাজা, হালারি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড লজিং প্রভৃতি সদা প্রস্তুত আপনাকে উষ্ণ আতিথেয়তা দিতে।

 কেভস বা গুহা সমূহ

খাসি হিলস, জৈন্তিয়া হিলস ও গারো হিলসের গুহাগুলো মেঘালয়ে যাওয়া পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। মৌসুমাই কেভ, ক্রেম মৌমলুহ ও ক্রেম ডেম খাসি হিলসের প্রধান প্রধান গুহা। জৈন্তিয়া হিলসের গুহাগুলো হলো ক্রেম কটসাটি ও দ্য কেভ অব ইওসিন এজ যেগুলো অন্ধকার ও ভীতিকর। বক-বাক দোবাকল, সিজু-দোবাকল ও তেরেংকল-বালওয়াকল হলো গারো হিলসের দীর্ঘতম ও দুর্গম কিছু গুহা।

পুলিশবাজার মোড় থেকে আপনি এই স্থানগুলোতে যাওয়ার বিভিন্ন গাড়ি পাবেন। এ ছাড়া এখানকার ট্যুরিজম সম্পর্কিত সকল তথ্যের জন্য আপনি মেঘালয় ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনে যোগাযোগ করতে পারেন। এখান থেকে প্রতিদিন বাসে করে কম খরচে পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হয়। তবে এর জন্য আপনাকে আগে থেকে টিকেট কেটে রাখতে হবে। এ ছাড়া আপনার সুবিধার জন্য সঙ্গে একজন টুরিস্ট গাইড রাখতে পারেন।

সঙ্গে যা যা রাখবেন

একজন টুরিস্ট হিসেবে আপনার প্রথমেই যা সব সয়য় সঙ্গে রাখা উচিত তা হলো আপনার পাসপোর্ট ও ভিসা। কারণ পুলিশ যেকোনো সময় আপনার পাসপোর্ট ভিসা দেখতে চাইতে পারে। এ ছাড়া যেহেতু মেঘের রাজ্য, সুতরাং ভিজতে না চাইলে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম যেমন ছাতা, রেইন কোর্ট, মোবাইল ভেজা থেকে রক্ষা করতে পলিথিন ব্যাগ ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন। পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার জন্য স্লিপার স্যান্ডেল বেশ আরামদায়ক। কিছু মানুষ আছে যাদের উঁচুতে উঠলে মাথাব্যথা হয়, তারা সঙ্গে মাথাব্যথার ট্যাবলেট রাখতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আপনার খেয়াল রাখতে হবে তা হলো সঙ্গে পানি নিয়েছেন কি না।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker