ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

অন্যরকম আনন্দের খোঁজে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসবে 

মিজানুর রহমান টিপু: বছর ঘুরে বৈসাবি আসলেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের গানের সুর আর নাচের তালে তালে সবাই মিশে একাকার হয়ে যায়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় গানের সুর আর নুপুরের ছন্দ। চারদিকে বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। সব মিলে বৈসাবির রংয়ে রঙিন হয়ে উঠে পাহাড়। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয় এ উৎসব চলে প্রায় অর্ধমাস ব্যাপী। জানা গেছে, পার্বত্যাঞ্চলে ১০ ভাষাভাষী ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের বিজু-সাংগ্রাই-বৈসাবি-বিষু অর্থাৎ বৈসাবির আমেজে রাঙ্গামাটি এখন উৎসবের নগরী। আর প্রায় প্রতিদিন বসে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে জমজমাট আসর। এবার উৎসবে স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি ছাড়া যোগ দিয়েছে দূর দূরান্ত থেকে আগত পর্যটকরাও। ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সম্প্রীতির মিলনে পাহাড়ের বইছে আনন্দের বন্যা। উৎসব মুখর হয়ে ওঠেছে পাহাড়ি জনপদ।

বৈসাবি উৎসব শুরু: চৈত্র মাসের শুরুতেই একটি পাখি এসে বিজু বলে ডাক দিয়ে যায়। চাকমা সম্প্রদায় এ পাখিকে বিজু পেক্কো (বিজু পাখি) বলে। এই পাখির সুমধুর কলতান বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। এটা পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ধারণা। পার্বত্যাঞ্চলের ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা বৈসাবিকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে পালন করে থাকে। যেমন- চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাইং, ত্রিপুরারা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু ও অহমিয়ারা বিহু নামে পালন করে থাকে। সবমিলে এর নাম রাখা হয় বৈসাবি। চাকমা রীতি অনুযায়ী ১২ এপ্রিল অথাৎ চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ গঙ্গাদেবীর উদ্যেশে নদীতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনার মধ্যদিয়ে সূচনা করা হবে ফুল বিজুর উৎসব। পরদিন ১৩ এপ্রিল মূল বিজু এবং ১৪ এপ্রিল প্রহেলা বৈশাখ ও গোজ্যেপোজ্যা দিন উদযাপিত হবে। এছাড়া ১৫ এপ্রিল উদযাপন করা হবে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি উৎসব।

বৈসুক: পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মধ্যে ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনের অনুষ্ঠানকে বৈসুক উৎসব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বিজুকে তিনপর্বে ভাগ করে উৎসব পালন করে থাকে। এগুলো হল- হারি বিজু, বিষুমা বিজু ও বিসিকাতাল বিজু। বৈসুক দিনে তারা পাজন, সেমাই, পিঠাসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের আয়োজন করে। পরিবারে বা গ্রামের বয়স্ক নারী-পুরুষদের স্নান করিয়ে এদের গলায় পাহাড়ি কাঁচা ফুলের মালা পড়িয়ে নতুন কাপড় দান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এভাবে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক উৎসব বছরের শেষ দিনে মহাসমারোহে উদযাপন করে।

সাংগ্রাই: মারমা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনে নানা অনুষ্ঠান পালন করে। যার কারণে এ দিনটিকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করা হয়। নতুন বছরের প্রথম দিনে সাংগ্রাই পালন করে থাকে মারমা সম্প্রদায়। সেমাই, পাজন, পিঠা এবং নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন করে মারমা সম্প্রদায়। একে অপরের বাড়িতে যায়, কুশল বিনিময় করে এবং আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। মারমা সম্প্রদায়ের এ দিনের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে ‘জলোৎসব’। জলকেলি দৃশ্য বেশ উপভোগ্য বলে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে উৎসবস্থলে।

বিজু: চাকমা সম্প্রদায় বিজু উৎসবকে তিনভাগে ভাগ করে পালন করে থাকেন। বছরের শেষ অর্থাৎ চৈত্র মাসের ২৯ তারিখে ‘ফুল বিজু’, ৩০ তারিখে ‘মূল বিজু’ এবং নববর্ষের প্রথম দিনকে ‘গজ্যাপজ্যা বিজু’ নামে রকমারি উৎসব পালন করা হয়ে থাকে।

বর্ষবরণ উৎসব: পুরানো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে বরণের মধ্য দিয়ে পালন করা হয় বর্ষবরণ উৎসব। পার্বত্যাঞ্চলের শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা নয়, এ উৎসবে মেতে উঠে বাঙালি, হিন্দু ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মানুষও। এদিন জাতিগতভাবে থাকে না কোনো দ্বন্দ্ব। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়। কেউ কারো প্রতি বিদ্বেষ ভাব পোষণ করে না। সংঘাতেও জড়িয়ে পড়ে না। বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন মোট তিনদিনই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বৈসাবি’ পালিত হয় বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়।

এ সময়টা বিশেষ করে ভ্রমণপ্রিপাসু পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ করে। তাই আর দেরি না করে বেড়িয়ে আসতে পারেন রাঙ্গামাটির রঙ্গিন পাহাড় থেকে। আর এ উৎসবের ভাগ নিতে পারেন আপনিও।

যাতায়াত ও থাকা: ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটি যায় শ্যামলী, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের এসি বাস। ভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা। এছাড়া ডলফিন পরিবহন, এস আলম, সৌদিয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, ইউনিক সার্ভিসের নন এসি বাসও রয়েছে। রাঙ্গামাটি শহরে থাকার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরা। ভাড়া ১ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker