বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যে তিন নারীর ভূমিকা আমাদের অনেকেরই অজানা

সাবা তারান্নুম: বাংলার ব্রিটিশ মুক্তি আন্দোলনে যে সকল নারীর নাম নেয়া বাঞ্ছনীয় তারা হলেন প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত আর বীণা দাস। পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের জন্য লড়াই করে প্রাণ দিতেও তারা ছিলেন অকুতোভয়। বিল্পবী এই নারীরাই প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন যোগদান করেন। যাদের জীবনের বিনিময় আমরা আজ স্বাধীন বাংলার স্বাধীন নাগরিক, বাঙালী আজও তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রামের পটিয়ায় জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং প্রতিভাদেবীর ঘরে। অন্তর্মুখী কিন্তু সাহসী মেয়ে প্রীতিলতাকে তার মা আদর করে ডাকতেন রাণী । ছয় সন্তানের ভিতর প্রীতিই ছিলেন সব থেকে মেধাবী সন্তান। প্রখর স্মৃতিশক্তির কারনে প্রীতিলতার বাবা মেয়েকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি না করিয়েভর্তি করান তৃতীয় শ্রেণীতে।

শিক্ষাজীবনের মাঝেই তার ভিতরে বপন হয় দেশ ভক্তির বীজ। দেশের জন্য প্রাণ দেয়ার সাহসও রাখতেন এই স্বল্পবয়সী তরুণী। ১৯২৪ সালে স্বদেশী রেল কর্মচারীদের বেতন ডাকাতির কথা তার কোমল মনে ছাপ ফেলে যায়। স্কুলের ঊষা’দির কাছ থেকে শোনা ‘ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই’ গল্প তাকে আরো বেশি আগ্রহী করে তোলে। পূর্ণেন্দু দস্তিদার ও উষাদির সংস্পর্শে এসে রানী রাজনীতির অনেক কিছু বুঝতে শুরু করলেন। কিন্তু প্রীতিলতা যতক্ষন না সরাসরিভাবে এই আন্দোলনে যুক্ত হতে না পারেন তিনি হাল ছাড়েননি। মাস্টার দা সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক প্রীতিলতার সাহসীকতায় নিজের দলে যোগ করেন নেন প্রথম নারী সেনানি হিসেবে। এরপর তিনি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে সাহায্য করে গেছেন সূর্যসেনের নানান কর্মসূচিকে।

১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে সফল হন। আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন প্রীতিলতা। এ অবস্থায় ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশ পুলিশের মারের মুখে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। এভাবে দেশের জন্য আত্মাহুতি দেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

কল্পনা দত্ত: কল্পনা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আরেকজন ব্যক্তিত্ব। তিনি চট্টগ্রাম বিপ্লবের একজন অন্যতম বিপ্লবী নেত্রী। চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। শহীদ ক্ষুদিরাম এবং বিপ্লবী কানাই লাল দত্তের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বেথুন কলেজ-এ গড়ে ওঠা ছাত্রী সংঘ-এ যোগদান করেন। মাস্টার দা সূর্যসেনের দলে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত একসাথে যোগদান করেন। গোপনে গান কটনও তৈরী করা এবং সে সময় বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের বিচার ও সাজা রুখতে তিনি বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৩১ সালে সূর্য সেন, কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে চট্টগ্রামের ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেন। পুরুষের ছদ্মবেশে একটি সমীক্ষা করতে গিয়ে তিনি ধরা পরেন ও গ্রেফতার হন। জামিনে মুক্তি পেয়ে মাস্টার দার নির্দেশে তিনি কিছু দিন আত্মগোপন করে থাকেন। ১৯৩৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পুলিশ তাদের গোপন ডেরা ঘিরে ফেলে,সকলেই পুলিশের হাতে ধরা পরেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলায় মাস্টার দা ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। কল্পনা দত্ত যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হন। কল্পনা দত্তের এই সাহসীবিপ্লবী মনভাবের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে ‘অগ্নিকন্যা’ বলেছেন।

বীণা দাস: ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের আর একজন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক। পরিবার রাজনৈতিক পরিবারের বীণা দাস ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক মনস্ক হয়ে ওঠেন। ১৯৩০ সালে ডালহৌসির অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য ছোট ছোট দলের নেতৃত্ব দেন এবং গ্রেপ্তার হন। বীণা দাস ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের নেত্রী ছিলেন। ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর সমাবর্তনে বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের উপর পিস্তল দিয়ে গুলি চালান। এই হত্যা প্রচেষ্টা চালানোর কারণে ৯ বছর কারাবরণ করেন বীণা দাস।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বলেছিলেন, “duty to family-কে duty to country-র কাছে বলি দিতে পারব”। যুগে যুগে নারীরা পরিবার পরিজনের মায়া ত্যাগ করে এসে এভাবেই মাতৃভূমির জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ করে আত্মত্যাগ করেছেন। তাদের আদর্শ নিষ্ঠা আর সাহসীকতা ইতিহাসের পাতায় আজীবন অম্লান হয়ে থাকবে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker