ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

একটি সুখী দেশের গল্প

মৃন্ময়ী মোহনা: সাধারণ জ্ঞানের বই ঘাঁটলেই যে প্রশ্নটি পাওয়া যায়, তা হলো ‘নিশীথ সূর্যের দেশ কোনটি?’ ইদানিং সাথে আরেকটি প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে, ‘বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশ কোনটি?’ সবগুলো প্রশ্নের উত্তর কিন্তু একটাই! তা হলো নরওয়ে!

নরওয়ে সুমেরু অর্থাৎ উত্তর মেরু বা উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ায় মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এখানে সূর্যাস্ত না গিয়ে সবসময়ই আকাশ আলোকিত থাকে। ফলে অন্ধকারের পরিবর্তে গোধূলি আলো বজায় থাকে সারারাত। কিন্তু নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সূর্য ওঠেই না। আর তখন প্রায়ই ‘উত্তরের আলো’ বা ‘অরোরা বোরিয়ালিস’ দেখা যায়। এ কারনে এই দেশকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলে। এ তো গেল এ দেশের এক বিস্ময়। এ দেশের আরেকটি পরিচয় হলো এটি বিশ্বের একটি চির শান্তির দেশ। সুখী দেশের তালিকায় ২০১৭ সালে এটি প্রথম এবং ২০১৮ সালে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সুখী দেশের মর্যাদা লাভ করে।

কিন্তু কেন এ দেশে এতো শান্তি? জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে একটু। ভাইকিং যুগ থেকে ডেনমার্ক, সুইডেন এবং নরওয়ের মধ্যে সংযোগ ছিল। জার্মান আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই তিন দেশ ‘Kilmar Union’ গঠন করে। ১৫২৩ সালে সুইডেন আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ডেনমার্ক এবং নরওয়ে ১৮০৭ সাল পর্যন্ত একত্রে ছিল। ক্রমান্বয়ে নরওয়েবাসীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। পরবর্তীতে ডেনমার্ক-সুইডেন যুদ্ধের পর নানা কাঠখড় পেরিয়ে ১৯০৫ সালে সুইডেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে নরওয়ে। তখন থেকেই নরওয়ে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও পদক্ষেপ তাদের সুখী রাষ্ট্র তৈরির অন্যতম হাতিয়ার।

এবার আসা যাক নরওয়েজিয়ানদের জীবনযাত্রার মানের কথায়। নিরাপদ আবাসস্থল, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পর্যাপ্ত খাদ্য ও স্বাস্থ্য সবকিছুই রয়েছে এখানে। পৃথিবীর যেকোন দেশের মানুষের জন্যও রয়েছে সমান সুযোগ। এ দেশে রয়েছে উচ্চশিক্ষার সুব্যবস্থা। তাও সম্পূর্ণ স্কলারশিপের মাধ্যমে। আছে নাগরিকত্ব লাভের সুযোগও। এ দেশের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় নিরাপত্তা। ঘরে-বাইরে নিশ্চিন্ত চলাফেরার অধিকার রয়েছে সবার। এদেশের অর্থনীতিও স্বনির্ভর। দেশটির মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি ৫৭ হাজার ডলার। ৯৫ শতাংশ মানুষ তাদের স্বাধীনতা এবং জীবনপ্রবাহ নিয়ে সন্তুষ্ট। এদেশের জনগণ একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও বিশ্বাসী। এ দেশ আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল।

এ দেশে একমাত্র আপেলের রস থেকে তৈরি এক প্রকার মাদক ছাড়া অন্য কোন আ্যালকোহল জাতীয় জিনিস সহজলভ্য নয়। অ্যালকোহল কিনতে হলে নানারকম শর্ত ও অনুমতি নিতে হয়। এ দেশে গাড়ির গতিবেগও নির্দিষ্ট। সামান্য ব্যবধানের জন্যও গুণতে হয় শাস্তি। এ দেশে অপরাধের হার এতই কম যে, ১৯৭১ সাল থেকে এ দেশে মৃত্যদন্ড নিষিদ্ধ। নরওয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি ২১ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক দিয়েও পিছিয়ে নেই দেশটি। এ দেশে রয়েছে অনেক সুন্দর পর্যটন স্পট। যা বিশ্ববাসীর কাছে তাদের ভাবমূর্তিকে করেছে উজ্জ্বল। উন্নত পরিবেশ, জীবনব্যবস্থা সর্বোপরি জনগণ ও সরকারের সদিচ্ছাই নরওয়েকে দিয়েছে পৃথিবীর সুখী দেশের মর্যাদা।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker