বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

চেরনোবিল বিপর্যয়: আধুনিক সভ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

মৃন্ময়ী মোহনা: তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান ইউক্রেনের একটি শহরের নাম চেরনোবিল। যার নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় এক বিপর্যয়ের নাম। আরও স্পষ্ট করে বললে পারমাণবিক বিপর্যয়ের নাম। যা গ্রাস করেছিলো ২৬০০ ব.কিমি  এলাকা। এই বিস্ফোরণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা।

কেন ঘটেছিলো এ দুর্ঘটনা 

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিল শহরে একটি পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি চুল্লির মধ্যে চতুর্থ চুল্লিটি বিস্ফোরিত হয়। বলা হয়ে থাকে, মধ্যরাতে কর্মচারীদের উদাসীনতায় ত্রুটিপূর্ণ কাজের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার ভয়ঙ্কর প্রভাব 

এ দুর্ঘটনার ফলে তেজস্ক্রিয়তা  ছড়িয়ে পড়ে রাশিয়া,ইউক্রেন ও বেলারুশে। এ ঘটনায় হিরোশিম ও নাগাসাকি থেকে পাঁচশ গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। এই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসেবে মারা যায় ৩১ জন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় প্রায় ৩০০০-৮০০০ মানুষ। প্রায় ১ লক্ষ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। চেরনোবিলকে ২০০০০ বছরের জন্য বসবাসের অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়।

চেরনোবিলের বুকে প্রকৃতির গান 

আজ পর্যন্ত চেরনোবিলে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও হঠাৎই একদিন এখানে দেখা যায় প্রকৃতির স্পন্দন।  দুর্ঘটনার তিন বছরের মাথায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায়ও গাছের নতুন চারা গজাতে দেখা যায়। সময়ের সাথে  চেরনোবিলের ২৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক বন এবং বন্য প্রাণীদের আবাসস্থল। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে গড়ে তোলা মানবসভ্যতার মূলে চপেটাঘাত প্রকৃতির এই পরিবর্তন। নবীন জঙ্গলটি এখন ছেয়ে আছে হাজারো ছোটবড় গাছপালায়। কারো চাষাবাদে নয়, কারো রক্ষণাবেক্ষণে নয়, প্রকৃতি নিজেই নিজেকে পূর্ণ করে তুলেছে এখানে। শুধু কি গাছপালা, হাজারো বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হয়ে গড়ে উঠেছে এটি। বর্তমানে, ইউরোপের সব’চে বেশি ঘনত্বের বন্যপ্রাণীর বাস চেরনোবিল। বিলুপ্তপ্রায় কিছু প্রাণীর অস্তিত্বের খোঁজও পাওয়া গেছে এখানে।

 

কীভাবে সম্ভব হলো 

তেজস্ক্রিয়তা যদি  মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয় তাহলে কীভাবে  সেখানে বন্যপ্রাণী এবং গাছপালা টিকে আছে, এমন প্রশ্ন মনে জাগাটা স্বাভাবিক। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ কোষের মূল কাঠামো ধ্বংস করে ফেলে। আমরা জানি, কোষের যে কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা প্রতিস্থাপন করা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ডিএনএ ব্যতিক্রম কারন বিকিরণের ফলে এটি গলে যায়। বিকিরণের মাত্রা যত বেশি হয় কোষ তত দ্রুত গলতে থাকে। দীর্ঘদিনের বিকিরণ ক্যান্সার কোষ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, প্রাণীদেহে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ব্যাপক। কিন্তু গাছের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্নভাবে কাজ করে। গাছ জৈবিকভাবে বেঁচে থাকে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানি থেকে সংগ্রহ করে। গাছ নিজের প্রয়োজনে যে কোনো অংশে নিজের মতো করে কোষ বা টিস্যু গঠন করতে পারে। অর্থাৎ গাছ যত দ্রুত তার ক্ষতিগ্রস্ত কোষ প্রতিস্থাপন করতে পারে, আর  কোনো প্রাণী তা পারে না। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ক্ষেত্রেও গাছ একই প্রতিক্রিয়া দেখায়। এ কারনেই প্রকৃতি নিজেই নিজের উত্থান ঘটাতে পারে। আর যেখানে গাছপালার আধিক্য থাকে প্রাণীকূল সেখানেই ভীড় জমায়।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয় আধুনিক সভ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয় বরং প্রকৃতির ক্ষতি না করে সকলকে সভ্যতার চাকা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রকৃতি অফুরন্ত প্রাণশক্তির উৎস। প্রকৃতিকে তার মতো থাকতে দেওয়াই তাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker