ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

ঘুরে আসুন সোমপুর বিহার

শামিম ইমতিয়াজ: বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জড়িত যে সকল স্থান অবশ্য দর্শনীয়, তার মাঝে সোমপুর মহাবিহার অন্যতম। এটি পাহাড়পুর বিহার নামেও পরিচিত। নওগাঁ জেলার এই স্থাপত্য, যেখানে শ্রী অতীশ দীপঙ্কর বহুদিন ছিলেন, তার সাথে জড়িয়ে আছে আরও অনেক ইতিহাস।

হেমন্তের এক সকালে আমি এবং আমার দুই বন্ধু সজীব আর রাতুল গিয়ে পৌঁছেছিলাম পাহাড়পুরে। সকাল তখন আনুমানিক নয়টা। আগেই উঠেছিলাম নওগাঁয় সজীবের বোনের বাসায়। সেখান থেকেই যাত্রা। রাতুল ইতিহাসের ছাত্র, প্রত্নতত্ত্বে তার আগ্রহ। সে যাত্রায় সেই ছিল আমাদের গাইড। কারন সোমপুর সে ঘুরেছে অন্তত চারবার। সোমপুরের ইতিহাস শুনলাম তারই মুখে।

অনে করা হয় অষ্টম শতাব্দীর রাজা ধর্মপাল এ মহাবিহারের নির্মাণ করেন। বাংলায় তখন বৌদ্ধ ধর্মের জয়জয়কার। বর্তমান নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে এর অবস্থান। প্রায় ১০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিহারের অবস্থিতি যাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা যেতে পারে। সময়ের অতলে চাপা পড়া এ কীর্তি ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম আবিস্কার করেন।

বৌদ্ধ বিহারটির ভূমি-পরিকল্পনা চতুষ্কোনাকার। উত্তর ও দক্ষিণ বাহুদ্বয় প্রতিটি ২৭৩.৭ মি এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাহুদ্বয় ২৭৪.১৫ মি। এর চারদিক চওড়া সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। সীমানা দেয়াল বরাবর অভ্যন্তর ভাগে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কক্ষ ছিল। উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। বিহারের অন্তর্বর্তী স্থানের উন্মুক্ত চত্বরের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ধ্বংশাবশেষ। এখন এটি ২১মি উঁচু হলেও মূল মন্দিরটি কমপক্ষে ৩০ মি উঁচু ছিল। তিনটি ক্রমহ্রাসমান ধাপে ঊর্ধ্বগামী এ মন্দিরের ভূমি-পরিকল্পনা ক্রুশাকার। প্রতিটি ক্রুশবাহুর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১০৮.৩ মি ও ৯৫.৪৫মি। এ ছাড়াও রয়েছে বিস্তৃত উন্মুক্ত স্থান, দীঘি, স্নানাগার এবং শৌচাগার।

দূর থেকে বিহারটিকে দেখতে একটা পাহাড় বলেই মনে হয়। যেন পাহাড়ের গায়ে সবুজের সমারোহ। কাছে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মনে হয় এখানেই কোথাও আমারই মতো এক ছাত্র হয়ত এক হেমন্তের সকালে পুঁথি পড়তো। পোড়ামাটির যে শিল্পকর্মে আমি দেখছিলাম গ্রীক দেবতা অ্যাটলাসকে, সেটি কোন শিল্পীর তৈরি তা আজ জানার উপায় নেই। কিন্তু মুগ্ধ হতে সময় লাগে না।

সোমপুর বিহার এখানে আসা দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করবে। ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে করবে কৌতূহলী। আর যদি কারও মন কল্পনাপ্রবণ হয় তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে কল্পনা করে নিতে পারে তিন হাজার বছর আগের সোমপুরের কথা। আর যদি কল্পনার দৌড় ততো না হয় তাহলে বিহার সংলগ্ন জাদুঘরে গিয়ে দেখে আসতে পারেন নানা প্রাচীন নিদর্শন।

পাহাড়পুর বিহার দেখতে যেতে চাইলে যেতে হবে নওগাঁ তবে জামালপুর হয়ে যাওয়া সহজ। পরিদর্শনের সময় গ্রীষ্মকালে (১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা, এবং শীতকালে (১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ) সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা। শুক্র এবং মঙ্গলবারের সূচী কিছু ভিন্ন। আগে থেকে জেনে যাওয়া ভালো।

পাহাড়পুর ছাড়াও নওগাঁ গেলে জগদ্দল বিহার, পতিসরে রবি ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, কুসুম্বা মসজিদ, বালিহার রাজবাড়ি দেখে আসা উচিত। সাথে নওগাঁর বিখ্যাত প্যারা সন্দেশ খেতে ভুলবেন না। যাপিত জীবনের প্যারা থেকে মুক্তি দিতে এই সন্দেশের জুড়ি মেলা ভার।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker