বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

মানসা মুসা : বিশ্বের সর্বকালের সেরা ধনী!

আরিফুল আলম জুয়েল: আপনাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি কে? তাহলে অবশ্যই বলবেন বিল গেটস কিংবা ওয়ারেন বাফেটের কথা। কিন্তু আমরা অনেকেই ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির নাম জানি না। কিছুদিন আগে প্রকাশিত ফোর্বস বিলিয়নিয়ারের তালিকায় সেরা ধনী হয়েছেন আমাজোনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। ১৩১ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক জেফ বোজোস আধুনিক সময়ের সেরা ধনী।

যার কথা বলবো, সে অনেক আগের কথা, মূল্যস্ফীতি হিসেব করে তার তৎকালীন সম্পত্তিকে বর্তমান মুদ্রায় রূপান্তর করলে সেটার পরিমাণ হবে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে রথসচাইল্ড ফ্যামিলির সম্পত্তির মূল্য ৩৫০ বিলিয়ন ডলার, আর বিল গেটসের সম্পত্তির পরিমাণ মাত্র ৯০ বিলিয়ন ডলার! সেই খেতাবের মালিক ‘মানসা মুসা’- ১৪ শতকে পশ্চিম আফ্রিকার এই মুসলিম শাসক এতটাই ধনী ছিলেন যে তার দানশীলতার কারণে একটি পুরো দেশের অর্থনীতিতে পর্যন্ত ধস নেমেছিল।

ঠিক কতটা ধনী ছিলেন মুসা? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তা আর বলা সম্ভব না। কেউ কেউ বলে বটে যে মানসা মুসার সম্পদের পরিমাণ হয়তো ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আশেপাশে। কিন্তু অন্য অধিকাংশ ইতিহাসবিদেরই দৃঢ় বিশ্বাস, মানসা মুসার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। এত বেশি যে তা অঙ্কে প্রকাশ করা অসম্ভব।

মানসা মুসার প্রকৃত নাম প্রথম মুসা কেইতা। মানসা হচ্ছে সে সময়ের মালির রাজাদের উপাধি, যার অর্থ হচ্ছে রাজা বা সম্রাট। মুসা ছিলেন দশম মানসা অর্থাৎ মালি সাম্রাজ্যের দশম সম্রাট। মুসার জন্ম ১২৮০ সালে। ১৩১২ সালে, মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি ক্ষমতায় আরোহণ করেন।

২০১৫ সালে প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী টাইম বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ১০ ব্যক্তির একটি তালিকা প্রকাশ করে।
সেখানে মানসা মুসার নামটি ছিল সবার প্রথমে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, তার সম্পত্তির পরিমান কেউ জানে না, সবই ধারণা করে বলা! উত্তরাধিকার সূত্রে ভাইয়ের ফেলে যাওয়া রাজত্বের শাসনভার নেয়ার পর মানসা মুসার শাসনামলে মালি রাজত্বের আকার বাড়তে থাকে। তিনি তার রাজত্বে আরো ২৪ টি শহর যুক্ত করেন, যার একটি ছিল টিম্বাকটু।

তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত ছিল ২,০০০ মাইলজুড়ে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে বর্তমান নিজার, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া, মালি, বুর্কিনা ফাসো, গাম্বিয়া, গিনি-বিসাউ, গিনি এবং আইভোরি কোস্টের বড় অংশ ছিল তার রাজত্বে। এই বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর আয়ত্ত্বে আসে মূল্যবান খনিজ সম্পদ- বিশেষ করে স্বর্ণ এবং লবণ। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের হিসেবে মানসা মুসার শাসনামলে তৎকালীন বিশ্বে যে পরিমাণ স্বর্ণের মজুত ছিল তার অর্ধেকই ছিল মালিতে।

আর তার সবটারই মালিক ছিলেন মানসা মুসা। মালি সাম্রাজ্যে স্বর্ণের বিশাল মজুত থাকলেও, এই রাজত্ব বহির্বিশ্বে অতটা পরিচিত ছিল না। তবে ধর্মপ্রাণ মুসলিম মানসা মুসা যখন সাহারা মরুভূমি এবং মিশর পার হয়ে মক্কায় হ্জ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখনি সেই অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করলো।

এই হজ্বযাত্রায় মুসার সাথে ছিল প্রায় ৬০,০০০ মানুষের এক বিশাল বহর, যাদের মধ্যে প্রায় ১২,০০০ ছিল সৈন্য এবং দাস।
দাসদের প্রত্যেকের কাছে ছিল ৪ পাউন্ড করে সোনার বার। এছাড়াও তার সাথে ছিল ৮০টি উট, যাদের প্রত্যেকের পিঠে ৫০ থেকে ৩০০ পাউন্ড করে সোনা ছিল। এই যাত্রায় মুসার সাথে তার স্ত্রী ইনারি কোঁতেও শামিল ছিলেন, যার সেবার জন্য ৫০০ দাসী নিযুক্ত ছিল। একইসাথে খাবারের জন্য ছিলো ছাগল এবং ভেড়ার এক বিশাল বহর। মরুভূমি যখন পার হচ্ছিলেন তখন মরুর বুক দিয়ে যেন একটি শহর চলছিল!

যে শহরের এমনকি একজন দাসের গায়েও স্বর্ণখচিত পারস্যের সিল্কের জামা। শহরের সাথে চলছিল শত-শত উটের আরেকটি বহর, যার প্রতিটির পিঠে শত-শত সের খাঁটি স্বর্ণ। আহ্! দেখার মত দৃশ্য ছিল সেটি! এই প্রবল ঐশ্বর্যশালী কাফেলা নিয়ে মুসা মিশরের কায়রো শহরে পৌঁছান, এবং স্বভাবতই চোখ ধাঁধিয়ে যায় সেখানকার স্থানীয়দের।

তাদের উপর মুসা এমন অবিশ্বাস্য রকমের মুগ্ধতার পরশ ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন যে, চতুর্দশ শতকের সিরীয় ইতিহাসবিদ শিবাব আল উমারির যখন ১২ বছর পর ওই শহরে পা রাখেন, তখনো সবার মুখে মুখে ঘুরে ফিরছিল মুসার নামে জয়ধ্বনি।

কি বিশ্বাস হয়, অবিশ্বাস্য! কেন মুসার জন্য কায়রোর অধিবাসীদের এত ভালোবাসা? কারণ কায়রোতে মুসার স্থায়িত্বকাল মাত্র তিন মাস হলেও, এই তিন মাসেই তিনি চারিদিকে যেভাবে উদারহস্তে সোনা বিলিয়েছিলেন যে, ওই অঞ্চলে পরের ১০ বছর ধরে জলের দরে পাওয়া গিয়েছিল সোনা। ফলে গোটা অঞ্চলের অর্থনীতিও রীতিমতো ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি আর অতশত বোঝে!মুসার দানশীলতাই মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রেখেছিল তাদের।

ফেরার পথে আবারো মিশর হয়ে গিয়েছিলেন মুসা। অনেকের মতে, তখন তিনি চেষ্টা করেছিলেন দেশটির ভগ্ন অর্থনীতির চাকাকে কিছুটা হলেও সচল করে দেয়ার। এজন্য তিনি সেখানকার মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে সোনা কিনতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারপরেও মিসরের স্বর্ণের বাজার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল।

যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন শহরে প্রচুর মসজিদ নির্মাণ করেন। কথিত আছে, তিনি প্রতি শুক্রবারে একটি করে মসজিদ নির্মাণ করতেন। তিনি গরীবদেরকে মুক্তহস্তে দান করেন এবং শহরগুলোর শাসকদেরকেও প্রচুর স্বর্ণ উপহার দেন। এছাড়াও তিনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বিভিন্ন স্যুভেনিয়ার ক্রয় করেন।

মক্কা থেকে ফেরার সময় বেশ কয়েকজন স্কলার, ইসলামী চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, স্থপতিদের সাথে নিয়ে আসেন মানসা মুসা।মুসার সাথে মালীতে আসা স্থপতিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইসহাক আল-তেউজিন। তিনি ২০০ কেজি স্বর্ণমুদ্রা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মালির সর্ববৃহৎ শহর তিম্বাকতুতে “দ্য গ্রেট মস্ক অফ তিম্বাকতু (Djinguereber Mosque)” নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেটি আজও অক্ষত আছে। সম্রাট মুসা পুরো মুসলিম বিশ্ব থেকে ইসলামিক স্কলার, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য তিম্বাকতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সে সময়ের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র সানকোর বিশ্ববিদ্যালয়ও (Sankoré University) প্রতিষ্ঠা করেন।

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এই সানকোর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতেই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইয়ের সংগ্রহ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৫,০০০ শিক্ষার্থী এবং এক লক্ষ পান্ডুলিপি ছিল। দীর্ঘ ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৩৩৭ সালে সম্রাট মুসা মৃত্যুবরণ করেন। তবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত অক্ষত এবং প্রতিষ্ঠিত থাকে তার সময়ে তৈরি হওয়া মসজিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ভাল থাকুন মানসা মুসা, বিশ্বের সর্বকালের সেরা ধনী!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker