বই Talkহোমপেজ স্লাইড ছবি

কালকূটের গল্প

মাহমুদুর রহমান: হেয় আছিল এক বাঙাল। বিক্রমপুরের পোলা। হেরপর যা হয়। পূবের বাঙাল দেশান্তরী হইলো পশ্চিম বাংলায়। সেইখানে গিয়া পরথমে ‘কমিনিস্ট’ হইল। কিন্তু মতে বনলো না। হেরপর হগল ছাইড়া শুরু করলো ল্যাখা। ‘নিষিদ্ধ’ ট্যাগ আর আমাদের নীলক্ষেতের সস্তা দামের জন্য আজকের বাংলাদেশী পাঠকদের কাছে সমরেশ বসুর বইয়ের মধ্যে পরিচিতি কেবল ‘প্রজাপতি’। এর বাইরে সমরেশ বসু আজকের, আমাদের পাঠকদের প্রায় অচেনা।

পূব বাংলা থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া এই ছেলেটি অল্প বয়সেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বিক্ষুব্ধ সময়ে যা হয় আরকি। রাজনীতি করে জেল খেটেছিলেন। বিয়ে করেছিলেন অল্প বয়সেই। যখন দেখলেন তিনি যে কারণে রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন, রাজনীতি তা থেকে বহু দূরে তখন অস্ত্র কারখানার চাকরী ছেড়ে দিয়ে সাহিত্য সাধানার শুরু করেন। এরপর প্রথাগত চাকরী কখনও তিনি করেননি। বলা চলে তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম ‘প্রফেশনাল লেখক’, যিনি লেখাকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেম। নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তবু লেখালেখি ছাড়েন নি। তার লেখার বিষয় ছিল খেটে খাওয়া মানুষের কথা। তাদের ক্ষুধা, দারিদ্র্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে মানুষের ভেতরে থাকা মমতা।

তাঁর উপন্যাসগুলোতে সেইসব মানুষের কথা উঠে আসে। পাশাপাশি মানব মনের জটিল, অন্ধকার দিক, কামনার নগ্ন রূপ একেকবারে কোন আড়াল ছাড়া দেখিয়েছেন সমরেশ। সেখান থেকে আবার ফিরে গেছেন মানুষের জয়গানে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ নয়, আমি সমরেশের মতো করে বলি ‘যুগ যুগ জীয়ে’। সমরেশ বসুর মনটা ছিল বিবাগী। ঘর ছেড়ে ছুটে গেছেন এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। কখনও সহজিয়া বৈষ্ণবদের সাথে, কখনও পূণ্যার্থীদের সাথে কুম্ভমেলায়। মানুষকে বড্ড ভালোবাসতেন তিনি। তাই পথের মানুষকে আপন করে নিয়েছেন। তাদের সুখে হেসেছেন, দুঃখে কেঁদেছেন। অথচ থিতু হননি কোথাও। লালনের মত তিনিও খুঁজতেন মনের মানুষকে। তাই লিখেছেন ‘কোথায় পাবো তারে?’

নিজের ভেতরে একটা নরম মন ছিল, তাই মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার প্রস্রবণটাও দেখতে পারতেন। লিখেছেনও তাই। তাঁর ‘ভ্রমণ উপন্যাস’গুলো বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অমূল্য সংযোজন। যুগ যুগ জীয়ে, বিবর, অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, কোথায় পাবো তারে, মন ভাসির টানে, আরব সাগরের জল লোনা, পৃথা, শাম্ব, গঙ্গা, প্রভৃতি তার অবশ্যপাঠ্য লেখা। উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনীর পাশাপাশি পুরাণে তাঁর দখল ছিল দারুণ। মহাভারত ভিত্তিক বিশ্লেষণী উপন্যাস ‘পৃথা’, ‘শাম্ব’ সে পরিচয় বহন করে।

১৯২৪ এর ১১ ডিসেম্বর বিক্রমপুরে জন্ম সমরেশের। বারবার শিকড় উপড়ে ফেলা মানুষটার শেষ উপন্যাসের নাম ‘দেখি নাই ফিরে’। ১৯৮৮ সালে যখন তিনি মারা যান তখন তাঁর লেখার টেবিলে ছিল এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি। শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের জীবনী ভিত্তিক এ উপন্যাসের নাম যেন সমরেশেরই পরিচয়। ‘কালকূট’ ছদ্মনামধারী সমরেশ বসু সম্পর্কে বলতে গেলে একটা আলাদা উপন্যাস লিখতে হবে। কিংবা পাওয়া যাবে রহস্য, মমতা, দ্রোহে ভরা এক মানুষের জীবনকথা।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker