সাহিত্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

জীবন অন্য কোথাও

নাসরিন জাহান লুনা: প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চেক কথা সাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরার Life Is Elsewhere (জীবন অন্য কোথাও) বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ এর বসন্তকালে, আর আমি যখন বইটি পড়ি তখন ২০১৮ এর শীত। অনিচ্ছাকৃতভাবে এতো দেরিতে বইটি পড়ার অপরাধ বোধ করি লেখক মার্জনা করে দেবেন। যাই হোক এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক,  উপন্যাসটি মূলত একটি বিশেষ চরিত্রকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যায়। চরিত্রটির জন্ম, শৈশব, কৈশোর, ও মৃত্যু উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ। আপনাদের মনে হতে পারে এটা কোন জীবনীমূলক উপন্যাস। আসলে সেটা পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া যায় না। তবে উপন্যাসটি সম্পূর্ণ শেষ করার পর আমার মনে হয়েছে গল্পকার সব দিকে না বরং একজন মানুষের জীবনের কোন একটা বিশেষ দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন- কোন একটা বিশেষ সময়ের প্রতি।

উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট হচ্ছে ‘একটি বিপ্লবী সময়ে জন্ম নেয়া কোন এক কবি ও তার যৌবন’। কবি আর যৌবনকে গল্পকার এক সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন এখানে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যৌবন হচ্ছে কবিতা তৈরির সময়, কবি হওয়ার সময়। আর কবিতা তরুণদের ন্যায় সদা জাগ্রত, সদা চঞ্চল। একজন কবির জীবনকে ঘিরে  (বিশেষত জন্ম, যৌবন, মৃত্যু) তার পরিবার, তার সমসাময়িক সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী, ইতিহাস এমনকি দর্শন ও সাহিত্য কিভাবে আবর্তিত হয় সেটাই এখানে গল্পকার তুলে ধরেছেন। তবে লেখক এখানে জীবনের ঘটনাবলীর তুলে ধরেন নি। তিনি তুলে ধরছেন জীবনের সে সকল ঘটনাবলী  ‘যা না হতে পারতো’ । সহজ করে বলতে গেলে গল্পকার এখানে জীবনের এমন সব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন যেগুলো হয়তো প্রত্যেকের জীবনেই ঘটার সম্ভবনা আছে- কিন্তু ঘটে না। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন কাটে কিছু শর্তের মধ্যে থেকে। শর্তধীন জীবন কাটাতে কাটাতে আমরা যখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি তখন আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা আরেকটি সত্তা আমাদের আরেক ধরণের জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখায়- কিন্তু সে স্বপ্ন নিছকই স্বপ্নই রয়ে যায়।

বিভিন্ন কারণে গতানুগতিক জীবন ধারায় পুনরায় ফিরে আসতে বাধ্য হই আমরা। কিন্তু এখানে লেখক সেই স্বপ্নটিকেই বাস্তব করে তুলে ধরেছেন- প্রকাশ করেছেন এমন একটা জীবনের কথা যা হয়তো কখনওই ঘটবে না। এমন জীবনের কথা এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য যা বাস্তবে দেখা যায় না কিন্তু কোথাও না কোথাও, কোন না কোনভাবে আছে। আর এটাতেই উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা লুকিয়ে আছে ‘Life is Elsewhere’ মানে ‘জীবন অন্য কোথাও‘।

এবার আসি কুন্ডেরার লেখনীর কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে। প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হচ্ছে কুন্ডেরার সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর  বর্ণনা কৌশল। আসলে অনেকেই গল্প বলে কিন্তু খুব কমই আছেন যারা প্রত্যেক পাঠককে হাতে ধরে তার গল্পের জগতে নিয়ে যেতে পারেন। যেখানে গল্পের চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে আমাদের সাথে আলাপকরে। এই গুণটি কুন্ডেরার মধ্যে রয়েছে। আমাদের এই উপন্যাসে আমরা আমাদের মূল চরিত্রটিকে জন্ম নিতে দেখি, তার বেড়ে ওঠা, তার শিক্ষা, সময়ের সাথ সাথে জীবন দর্শন পাল্টে যাওয়া, তার যৌবনের অবাধ্যতা, চঞ্চলতা, একান্ত ব্যক্তিগত মূহুর্তগুলো- প্রেম-ভালোবাসা, স্বমেহন-যৌনতা, তার বিপ্লবী হয়ে ওঠার চেষ্টা, তার ভন্ডামী, এমনকি তার কবিতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুখ, দু:খ, যন্ত্রণা, প্রতারণা, ব্যথা ও মৃত্যুক্ষুধা পর্যন্ত  আমরা পাশে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পাই। আমাদের মনে হয় এই তো আমাদের ঘরেরই কোন এক কোনায় এভাবে কেউ একজন জীবন পেরুচ্ছে। যৌবনের চিরায়ত সব গুণ আর দোষগুলো চরিত্রের মধ্যে ফুটে ওঠে। তাই কদাচিৎ হয়তো মনেই হতে পারে এতো আমাদেরই গল্প। এগুলো ছাড়াও কুন্ডেরা আমাদের স্কুল-কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত  ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, দর্শন ও সাহিত্যকে অথবা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করা কবিতাগুলোকে জীবনের সাথে এতো চমৎকারভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যেন আমাদের মনে হবে নির্জীব ওই বইগুলো শুধুমাত্র পরীক্ষা পাশের জন্য শেখা ওই প্রশ্নের উত্তর গুলোও আমাদের জীবনে ব্যবহার করা সম্ভব। সেগুলো নিছকই কোন তত্ত্ব না বরং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার উদাহরণ।

বইটি লেখা হয়েছিলো চেক ভাষায় যার নাম Život je jinde। একে ইংরেজিতে Life is Elswhere নামে অনুবাদ করেছেন পিটার কুসি।  আমাদের সৌভাগ্য এই যে এমন চমৎকার একটি বইকে বাংলা ভাষায়ও অনুবাদ করা হয়েছে- সংস্করণটির নাম জীবন অন্য কোথাও। এই মহৎ দায়িত্বটি পালন করেছে সন্দেশ প্রকাশনা এবং অনুবাদ করে ধন্য করেছে  মোরশেদুর রহমান। যে কোনো বুক শপে বা রকমারি ডট কমে বইটি পাওয়া যাবে।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker