লাইফস্টাইলসাহিত্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

পরম সুখ কিংবা জীবন বাস্তবতার আখ্যান

মাহমুদুর রহমান: মোগল আমলে রাজকীয় হারেমে (বিশেষত) হিজরাদের বিশেষ কদর ছিল। ‘হিজরা’ শব্দটায় আজকাল অনেকে আপত্তি জ্ঞাপন করেন, তবু এখানে এই শব্দটাই ব্যবহার উপযুক্ত। এই গল্পের শুরুটাও একজন হিজরাকে নিয়ে। জন্মগতভাবে নারী পুরুষের প্রভেদ চিহ্নতে সে না পুরুষ, না নারী। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেলো, পুরুষের চেয়ে নারীর বেশ, ভঙ্গী তার পছন্দ। দিল্লীতে নিজ বাড়ি থেকে একটু দূরে হিজরাদের ঠেকে সময় কাটাতেই তার আগ্রহ। অস্ত্রোপচার করেও তাকে পুরুষ করা গেলো না। শেষতক একদিন সে খুঁজে পেলো নিজের ঠিকানা।

কিন্তু এ পর্যন্তই কি গল্প? একদম না। অরুন্ধতীর এ উপন্যাসের কেবল একটা অংশ। আনজুমের চরিত্র দিয়ে লেখিকা আমাদের মনের দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্তের দোলাচালের দিকে আঙুল তুললেন। তারপর দাঙ্গা, যুদ্ধ, প্রতিবাদ।
গেরুয়া পোষাক জড়িয়ে একবার ভারতে ঘটে গেলো দাঙ্গা। অথচ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন ‘কবি’। উপন্যাসে লেখিকা তাকে বারবার কবি বলে সম্বোধন কিংবা বিদ্রুপ করলেন। রক্তে ভাসা গুজরাত উঠে এলো চোখের সামনে।

প্রতিবাদ চলে লালকেল্লা, দিল্লী দরওয়াজার কাছে। কিন্তু সে আন্দোলনের স্বরুপ কি? খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে ভেতরে অন্তঃসারশূন্য। কখনও হাস্যকর। তিলোত্তমা চরিত্রটি লেখিকার এক দারুন সংযোজন। নারী স্বাধীনতার এক প্রতিনিধি বলা যায় তাকে। অথচ কোথাও কোথাও সে নিজের কাছেই পরাধীন। নিজেকে স্বাধীন করতে চেয়ে পরাধীনতার জালে জড়িয়ে এক জটিল ঘুর্নাবর্তে আছে তিলোত্তমা, যেমন কাশ্মীর।

কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন, সেখানকার ইতিহাস, সংগ্রামের কথা এমন দৃঢ়ভাবে কেউ তুলে ধরেছেন কিনা জানা নেই। ভারত, পাকিস্তান কিংবা যে কোন দেশই তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু তাদের মহত্ত্বের মুখোশের তলায় নির্মম নির্দয় চরিত্র সহজে কেউ প্রকাশ করে না। অরুন্ধতী এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন সেকথা। কাশ্মীর নিয়ে মানুষের আবেগের পাশাপাশি রাজনীতি, সেনাবাহিনীর দৌরাত্ম্যের গল্প লিখেছেন। ভারতের মানুষের মনের মধ্যে গেঁড়ে বসা নানা সংস্কারের কথা তিনি তুলে ধরেছেন, কখনও সরল কথায়, কখনও হাস্যরসের মাধ্যমে। ধর্ম নিয়ে ভারতে বহুদিন ধরে চলে আসা দন্দ্ব এবং তা নিয়ে মানুষের ভেদ-বিভেদকে তীক্ষ্ণ বাণে গেঁথেছেন।

অরুন্ধতীর গল্প কখনও সরল পথে চলে, কখনও জটিল। কখনও সোজাসাপ্টা বক্তব্য, কখনও উদাহরণ উপমা দিয়ে প্রকাশ করেছেন। বর্তমান কিংবা কাছাকাছি সময়ের গল্প বলতে বলতে দুই তিনশো বছর পেছনে গিয়ে ইতিহাসের সাথে বর্তমানের মিল খুঁজেছেন। তিনি যখন ’৯২ এর দাঙ্গার কথা বলেছেন, তখন তাঁর লেখনীতে সেই সময় স্পষ্ট। আবার যখন ২০০৫/০৬ এর কথা লিখেছেন, সেই সময়ে চলমান অনুষঙ্গ দিয়ে তাকেও স্পষ্ট করেছেন।

অরুন্ধতী এই উপন্যাসে কেবল শাসক শ্রেণী কিংবা ক্ষমতাধরের ধূতি খুলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি ভারতের সাধারণ মানুষের ত্রুটিও তুলে ধরেছেন।  সেই সঙ্গে দেখিয়েছেন সেই সত্য যে, মানুষ এখন নিজেকে জানে না। সে বোঝে না তার স্থান কোথায়, কি তার করনীয়। যেদিন খুঁজে পাবে, বুঝবে সেদিন সে মুক্তি পাবে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker