বাক্যসাহিত্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

লিও তলস্তয়ের জীবনের অজানা অধ্যায়

আহমেদ ইশতিয়াক: তাঁর জীবন ছিলো রোমাঞ্চের। ভালো শিকারী ছিলেন এবং ভয়ংকর একগুয়ে স্বভাবের ছিলেন। একবার ভালুক শিকারে গিয়েছিলেন, একটা ভালুক থাবা মেরে চোখের নিচে থেকে বাঁদিকের গাল ছিড়ে নামিয়ে দেয়; দুই সপ্তাহ পরে ভালো হয়ে তিনি ফের শিকারে যান এবং ঐ ভালুকটিকে শিকার করেন।তিনি তাকাননি জীবনে সমাজের দিকে। বলতেন আমি কি করবো তা সমাজ ঠিক করে দিতে পারেনা। বন্ধু-বান্ধব বা সমাজ কী বলবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজে যা উচিত এবং ন্যায্য বলে ভেবেছেন তাই করেছেন সবসময়।

পাদ্রী ও ধর্ম যাজকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাদের প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন, এবং তার শাস্তি স্বরূপ যাজক সম্প্রদায় ঘোষণা দিয়েছিলো “তলস্তয় কে খ্রিস্ট ধর্ম থেকে বহিষ্কার করা হল, তিনি আর খ্রিস্টান বলে গণ্য হবেন না।” এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে যারা ঈশ্বর ও যীশুকে নিয়ে ব্যবসা করে তাদের চেয়ে তিনি সহস্র গুণ বেশি ধার্মিক খ্রিস্টান।

তিনি যখন মারা যান তখন পাদ্রীরা ভিড় করে এসেছিলো, কিন্তু কাউকেই তাঁর কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় নি; এবং দেশের ও বিদেশের হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াই তাঁর শবযাত্রায় শামিল হয়ে তাকে সমাহিত করে।তলস্তয় জন্ম রুশ সাম্রাজের তুলা প্রদেশের ইয়াস্নায়া পলিয়ানায়। মাত্র ২ বছর বয়সেই মাকে হারান তলস্তয়। এরপরই দুঃসম্পর্কের ফুফুর কাছে চলে যান রাশিয়ার কাজানে। সেখানেই শুরু তাঁর শৈশব ও কৈশোর। যদিও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি কোন আগ্রহই ছিলোনা।

স্কুল শেষ করতে বয়স ১৮ হয়ে গেল, বাবা নেই। কিন্তু বাবার ইয়াসনা পলিয়ানায় বিশাল জমিদারি আছে। সেই জমিদারি পেলেন তিনি। সমস্যা হলো তাঁর ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল জীবন। এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে গেলেন। তাঁকে ভর্তি করা হলো হাসপাতালে। হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে এক রাতে একজনকে পড়তে দেখেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের জীবনী। সেই বই পড়ে স্থির করেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন যেমন দিনের শেষে তার দোষগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতেন ঠিক তেমনই তিনিও লিখবেন। লিখতে লিখতে তাঁর মধ্যে এক ধরনের অনুশোচনাবোধ কাজ করতো, অথচ বিলাসী জীবনের জন্যও ছিলেন আকুল।

পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়বার সময় একদিন পত্রিকা পড়তে গিয়ে চোখে পড়ে চার্লস ডিকেন্সের ক্লাসিক ডেভিড কপারফিল্ড। তলস্তয়ের মনে হলো, এই রকম একটা উপন্যাস তো তিনিও লিখতে পারেন। জীবনকে যতখানি কাছ থেকে দেখেছেন তা নিয়ে তো লেখাই যায়। উপন্যাস লিখবেন বলে মনস্থির করলেও এরই মধ্যে বড় ভাই .তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন সেনাবাহিনীতে। সেনা বাহিনীতে দেয়ার সুবাদে চলে গেলেন ককেশাসে। ককেশাসে অবস্থানরত সেনাবাহিনী স্থানীয় উপজাতিদের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য দায়িত্বরত ছিলো। ককেশাসের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরে লিখেছিলেন তার বিখ্যাত বড় গল্প ‘ককেশাসের বন্দী’। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন সময়েই লিখে শেষ করলেন নিজের জীবনের আত্মজীবনী মূলক উপন্যাসের প্রথম পর্ব ‘Childhood’। স্থানীয় এক পত্রিকায় ১৮৫২ সালে লেখাটি ছাপা হলো। পত্রিকার সম্পাদক আরেক বিখ্যাত রাশিয়ান সাহিত্যিক নিকোলাই নেক্রাসভ বেশ প্রশংসা করলেন লেখাটির।

১৮৫৭ সালে প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক নেক্রাসভ ও তুর্গেনেভের সঙ্গে প্যারিস যান তলস্তয়। যাওয়ার আগে তলস্তয়ের বোনকে চিঠি লিখেছিলেন তুর্গেনেভ। যার পুরোটা তলস্তয়ের প্রশংসা। লিখেছেন দেখে নিবেন তলস্তয় একদিন পুরো বিশ্বসাহিত্যে সাড়া ফেলবে। কিন্তু ওর লেখা ছাপা হওয়া দরকার। নিজ উদ্যোগেই লেখা ছাপালেন তলস্তয়ের লেখা। তলস্তয় যা আজীবন কৃতজ্ঞ চিত্তে স্বীকার করে গেছেন।

অথচ প্যারিস ভ্রমণের ডায়েরীতে তলস্তয় তুর্গেনেভ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, লোকটা অযথাই বকবক করে আমার সঙ্গে, খুব বিরক্তকর। উৎসাহিত হয়ে উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব ‘বাল্যকাল’ও ১৮৫৪ সালের মধ্যে লিখে ফেললেন। মোটামুটিভাবে লেখায় মনোনিবেশ করতে না করতেই ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হলো। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা তলস্তয়কে এতটাই আহত করেছিলো যে তিনি যুদ্ধ শেষে সৈনিক পদ থেকে ইস্তফা দেন।

এর কিছুদিন পর তলস্তয় পাড়ি জমালেন জেনেভায়। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছিলো। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘কসাক’ লেখার কাজ শুরু করেছিলেন এখানেই। কিছুদিন পর ফিরে এলেন মস্কোতে। ‘কসাক’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৩ সালে। ‘কসাক’ই প্রথম তাকে রাশিয়ার জনপ্রিয় লেখকদের একজন করে দেয়।

পাঠকদের এই অভাবিত সাড়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা শুরু করলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘ওয়ার এন্ড পিস’। ‘ওয়ার এন্ড পিস’ রচনায় তার সময় লেগেছিলো দীর্ঘ পাঁচ বছর। ধারণা করা হয়, উপন্যাসের ‘নাতাশা রোস্তভ’ চরিত্রটি তার স্ত্রী সোফিয়ার ছোটবোন তাতিয়ানা বেহর্সের চরিত্রের আদলে লেখা হয়েছে। ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এর বিশালত্ব নিয়ে একটি মজার মিথ প্রচলিত আছে। তলস্তয়ের হাতের লেখা নাকি একমাত্র তার স্ত্রী সোফিয়াই পড়তে পারতেন। তাই সোফিয়াকেই তলস্তয়ের পান্ডুলিপি থেকে লেখা উদ্ধার করতে হতো। ধারণা করা হয়, সোফিয়া উপন্যাসটির সাতটি খসড়া তৈরি করেছিলেন। আবার অনেক পরিচিতজনের অভিযোগ ছিলো যে, সোফিয়া নাকি উপন্যাসটির ২১টি খসড়া করেছিলেন!

দস্তয়ভস্কি, তুর্গেনেভ তখন পৃথিবী ছেড়েছেন, অন্যদিকে গোর্কি কিংবা চেকভ তখনো তেমনভাবে পরিচিতি পাননি। সেই সময়টায় সমগ্র রুশ সাহিত্যের তিনি একাই কান্ডারী। মানুষজন তার লেখা পড়তে চাইতো। তাই আবার মন দিলেন লেখায়। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তার সবচেয়ে বিতর্কিত উপন্যাস ‘ক্রয়োজার সোনাটা’।

তলস্তয় শেষ বয়সে প্রায় সন্তের জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন। নিজের কাজ তিনি নিজে হাতে করতেন, এমনকি নিজে জুতো তৈরি করে পরতেন, চাষাভুষোর মতো সাধারণ ও অল্প আহার করতেন, খেতমজুরের পোশাক। শেষ বয়সে তিনি কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পথিমধ্যে ঠাণ্ডা লেগে নিউমোনিয়া হয়।

মৃতুর শেষ কয়েকদিন তিনি যা বলেছেন তাই লেখা হয়েছিলো। তিনি তার অভিজাত জীবনধারাকে ত্যাগ করে সাধারণ জীবন-যাপন করতে চেয়েছিলেন। তাই স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বাদ দিয়ে শীতের রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং অসুস্থ হয়ে বাড়ি থেকে দূরে এক রেলস্টেশনে বিশ্রাম নেওয়ার সময় মারা যান।

লিও তলস্তয় এক অবিশ্রান্ত জীবন সৈনিকের নাম। জীবনকে এতো দারুণ ভাবে উপলব্ধি খুব কম সাহিত্যিকই পেরেছিলেন। লিও তলস্তয় জীবন ও সাহিত্যে ঘুচে দিয়েছেন কল্পনা নামক এক আজন্ম দুরত্বের।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker