চলতি হাওয়াবাক্যসাহিত্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

করোনাময় পৃথিবীর বাস্তবতা এবং স্বপ্ন

নভেম্বর, ২০১৯ – করোনার আগের পৃথিবী

বেকার জীবন কাটাচ্ছি। গত মাসে রিয়ার সাথে কথা হচ্ছিল। বয়ফ্রেন্ড ৮ বছর প্রেম করার পর বিয়ে করবে না, অখুশী।রিয়ার বয়ফ্রেন্ড সুমন ভাই আমার পাড়াতো বড় ভাই। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম। চাকরি পাচ্ছেন না, বিয়ে তো দূরের কথা, রাস্তায় বের হবার পয়সা নাই। বিষণ্ণ! সুমন ভাইর আম্মা রাতে আমার আম্মার সাথে হাঁটতে যান। আন্টির বড় ভাই খুরশীদ মামার কিডনির সমস্যা। উনার মন খারাপ। মাগরেবের পর মসজিদে দেখা হলো রিয়ার ছোট মামা শিহাব আংকেলের সাথে। উনার মন মেজাজ তিরিক্ষি, একমাত্র ছেলে শিপন অষ্ট্রেলিয়ায় বিবিএ পাশ করেও চাকরি পাচ্ছে না।

শিপনের সাথে ফোনে কথা হলো। দুই মাস ধরে ডিপ্রেসনে আছে। লিথিয়াম খাচ্ছে। সিচুয়েশন ভালো না। চায়ের দোকানে ইউসুফ ভাইয়ের সাথে গল্প করলাম। সব জিনিসের দাম বাড়তি, কাস্টমারের ব্যবহার খারাপ। বেচারা দিশেহারা। ইউসুফ ভাইয়ের দূর সম্পর্কের চাচী আমাদের বাসায় কাজ করে। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে সবাইকে গালাগালি করেন। জামাই পঙ্গু, ছেলে নেশাখোর। বুড়া বয়সে উনার একার আয়ে সংসারে চালাইতে হয়। খাবার আগে দেখলাম আম্মা ফোনে বড় চাচীর সাথে কথা বলতেছে। বেচারি কাঁদতেছে। মেয়ের জামাই ভাল না। মদ খেয়ে বাসায় ফেরে। ছোট খালার টেনশন অন্য। মেজো ছেলের ৩টা বিয়েই ভেঙে গেছে। কোন মেয়েই থাকতে চায় না। জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না। বাজারে অনেক কথা চালু আছে।

পাশের বাসার সালাহউদ্দিন ভাইয়ের চেহারা সবসময় বাংলা পাঁচের মতো। বিএনপির ধানমন্ডি এলাকার বিরাট নেতা ছিলেন, এখন ছাত্রলীগের ইয়াং পোলাপানের দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর টিকে থাকতে হয়। সিড়ি দিয়ে নেমেই সকাল বিকেল কেয়ারটেকার ইউসুফকে অকারণে ঝাড়ি দেন। ইউসুফের বেঁচে থাকতে ভালো লাগে না। একমাত্র মেয়েটার বয়স ৩ বছর। যখন তখন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। রাতে ঘুম হয় না।

সমীরণ ভৌমিক খুব টেনশনে আছেন। সারাজীবনের কষ্টের টাকা একটা ব্যাংকে রেখেছিলেন। এমডি নাকি সব টাকা মেরে ক্যানাডায় চলে গেছে। সমীরণ সাহেবের ছেলে জোসেফ আমার ছোটবেলার বন্ধু। লন্ডনে পড়তে গিয়ে আর ফেরে নাই।ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করে, বাসায় জানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের প্রস্তাব আসলে নিজেই ফিরিয়ে দেয়। ভালো লাগে না।

এপ্রিল, ২০২০ – করোনাময় পৃথিবী

আমি এখনও বেকার জীবন কাটাচ্ছি। করোনায় আক্রান্ত সারা বিশ্ব। সবাই গৃহবন্দি। সময় নিয়ে সবার খবরাখবর নিলাম।রিয়া এখন আর বিয়ের চিন্তা করছে না। সুমন ভাই বাসায় বসে আন্টির সাথে সবজি কাটাকুটি করছেন। আন্টি আল্লাহর কাছে হাজার শোকর। ছেলে সংসার নিয়ে ভালো আছেন। শিহার আংকেল ফোন করে শিপনকে বলেছেন নেক্সট যেদিন প্লেন চলাচল শুরু হবে, সেদিনই যাতে দেশে ফিরে আসে। একমাত্র ছেলের অষ্ট্রেলিয়ায় বসে মানসিক রোগী হবার মতো খারাপ অবস্থা তার না। শিপন আংকেলের কল পেয়ে খুশী। দেশে এসে নিজের মতো কাজ করবে। বহুদিন পর দেখা হবে তুলির সাথে।

ইউসুফ ভাই ঘরে আছেন। নিজে রান্না করে বউ বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছেন। টাকার একটু টানাটানি। কিন্তু আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। চাচীর মন আগের চাইতে ভালো। আম্মা তাকে পুরো দুই মাসের বেতনসহ ছুটি দিয়েছেন। ছেলেকে বলেছেন ড্রাইভারের চাকরি দিবেন করোনা শেষ হবার পরেই। বড় চাচী মেয়ের জামাইকে ফোন করে বলছেন আরেকদিন মদ খেয়ে বাসায় ফিরলে পুলিশে দেবেন। গুলশান থানার ওসিও ফোন করে তাকে হালকা সান্টিং দিয়েছে। জামাই এখন ফেরেশতার মতো। সকাল বিকাল স্বাশুড়ির সাথে বসে গিটার বাজায় আর নেহেস্তার হালুয়া খায়।

ছোট খালার সমস্যা অবশ্য মেটেনি। তবে মেজো ছেলে বলেছে আর বিয়ে করবে না। সারাদিন এখন টিভিতে করন জোহরের মুভি দেখে। সালাহউদ্দিন ভাই ফোন ধরেই বিরাট সালাম দিলেন। বললেন জীবনে তো খাম্বা বেঁচে কম পয়সা কামান নাই। ঠিক করেছেন ইউসুফের পরিবারকে নিজ খরচে ঢাকায় এনে রাখবেন। কিছু টাকা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে চান।

সমীরণ সাহেব মাথা থেকে জমানো টাকার চিন্তা কমিয়ে এনেছেন। দুইদিনের দুনিয়া। এত চিন্তা করে কী হবে? তাছাড়া ক্যানাডায় ভেগে যাওয়া ব্যাংকের এমডির বউয়ের নাকি করোনা ধরা পড়েছে। উনি সব টাকা ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জোসেফ তার পাশের সুপারস্টোরের এক মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছে। ক্রিস্টিনও তাকে ভালোবাসে। আগামী মাসে মুভ-ইন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খুরশীদ মামা অবশ্য মারা গেছেন। করোনায় না। কিডনি ফেইলিওরে। পৃথিবীর সবকিছু সবসময় শত চেষ্টাতেও ভালো হয় না।

ডিসেম্বর, ২০২২ – করোনা-উত্তর পৃথিবী

করোনার শেষ রোগী ভ্যাক্সিন নিয়ে সুস্থ হয়েছে গতমাসে। সারা পৃথিবীর সব সরকার মিলে জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সপ্তাহে কর্মদিবস এখন থেকে ৪ দিন। তারমধ্যে একদিন বাসা থেকে, ৩ দিন অফিস আসতে হবে। বছরে একমাস সব দেশ সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকবে। মানুষ পরিবারকে গুরুত্ব দেবে। পরিবেশকে বিশ্রাম নেবার সুযোগ দেবে। এই সময় বিমান চলবে না। রাস্তায় গাড়ি চলবে না, সব রাস্তা উন্মুক্ত থাকবে পায়ে হাঁটার জন্য। মানুষ বাসায় বসে কাজ করবে। সরকার সবার দেখ ভালের ব্যবস্থা করবে।

আর ফেইসবুক সাবস্ক্রিপসান ফি চালু করেছে। কেউ দিনে ২ ঘন্টার বেশী ফেইসবুকে থাকলে তাকে মান্থলি চার্জ দিতে হবে। রাত ১০টার পর মেসেঞ্জার অটো সাট-ডাউন। পৃথিবীর সব ফোন কোম্পানী আবার ইনকামিং চার্জ চালু করেছে। ৫ মিনিটের বেশী ইনকামিং হলে হাই চার্জ। আউটগোয়িং কলে কোন ফ্রি সার্ভিস নেই। বিকেল ৫টার পর কেউ অফিসিয়াল কল করলে দন্ডবিধির ৭৭৫ এর ঘ ধারায় তিনমাস পর্যন্ত জেল হতে পারে।

একজনকে ফোনে প্রশংসা এবং তার বন্ধুদের সামনে সমালোচনা করলে ৩ মাসের কমিউনিটি সার্ভিস বাধ্যতামূলক।মানুষজন অবশ্য তাতে বেজায় খুশী। পৃথিবীর আকাশ এখন অনেক নীল। নদীতে মাছ, সমুদ্রে ডলফিন। ইঞ্জিনচালিত নৌকা বেশীরভাগ জায়গায় নিষিদ্ধ। রাস্তায় কেউ হর্ণ বাজায় না। সমালোচনা, গীবত আর নেগেটিভিটির শব্দ দূষণ থেকে মুক্ত পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই মানুষের কাছে এখন বিরাট আনন্দের বিষয়।

আমি অবশ্য এখনো বেকার আছি। তবে আগের মতোই হাসিখুশি আছি। রাস্তা দিয়ে বাসায় ফেরার সময় গভীর রাতে মিসির আলীর সাথে দেখা হলো। লম্বা সালাম দিয়ে কাছে যেতেই মিসির আলী দুই হাতের ছয় আঙুল মিলিয়ে আমাকে ২ মিটার দূরত্বে থাকতে বললেন। এই লোকটার সাথে দুইটা কথা বলার শখ আজও মিটল না।

ওদিকে মিসির আলী মহা বিরক্ত এই বুড়া ধামড়া বেকার ছেলেটার উপর। দেখা হলেই কেন জানি তার সাথে কথা বলতে চায়। এই দুনিয়ায় মানুষ এত কথা কেন বলতে চায় উনি বোঝেন না। তবে করোনার অজুহাতে একে অন্তত ৬ ফিট দূরে রাখা যাচ্ছে, এইটাও খারাপ না। মিসির আলীর কেন জানি মনে হয়, করোনা ব্যাপারটা ঠিক অহেতুক ছিল না।

লেখক: শামীম আহমেদ
সোশাল এন্ড বিহেভিয়ারাল হেলথ সায়েন্টিস্ট,
ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টো

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker