শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
webmail
Thu, 26 Jan, 2017 07:16:55 PM
নতুন বার্তা ডেস্ক

ঢাকা: বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমদিন থেকে শুরু হবে মাসব্যাপী অমর একুশে বই মেলা। একে বলা হয় বাঙ্গালীর চেতনা এবং সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বই এর উৎসবে প্রকাশিত হবে হাজারো নতুন বই।

কিন্তু তার মধ্যে নারী লেখকদের বই থাকে কতগুলো? কেমন প্রকাশ ও বিক্রি হয় তাদের লেখা? প্রকাশকদের কাছ থেকে কতটা পৃষ্ঠপোষকতা পান তারা?

নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের প্রিয় সাহিত্যিক কারা তা জানতে গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানকার একদল শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কি ধরণের বই পড়তে পছন্দ তারা।

দেখা গেল, উপন্যাস ও নানারকম গদ্যই রয়েছে বেশিরভাগের পছন্দ তালিকায়। তাতে বাংলাদেশী, ভারতীয় এবং অন্যান্য ভাষার লেখকদের প্রাধান্য প্রবল।

তবে, কেউই শুরুতে নারী লেখকের নাম করলেন না। প্রশ্ন করার পর যে নামগুলো বললেন তাতে তারা খুব যে স্বচ্ছন্দ নন, বোঝা গেল। কয়েকজনকে পাওয়া গেল যারা কোন নারী লেখকের লেখার সঙ্গে আদৌ পরিচিত নন।

প্রতি বছর বইমেলার প্রকাশিত বই এর মধ্যে নারী লেখকদের বই থাকে সর্বোচ্চ কুড়ি শতাংশ। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, প্রতিবছর বই মেলায় যত বই ছাপা হয়, তার কত শতাংশ নারী লেখকদের রচনা?

বাংলাদেশ সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বছরে বাংলাদেশে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজারের মত বই প্রকাশিত হয়।

এর মধ্যে কেবল বইমেলার সময়ই প্রকাশিত হয় চার হাজার বই। বলা যায় বাংলাদেশের প্রকাশনা খাতটি মূলত বইমেলা কেন্দ্রিক।

সমিতির নেতা এবং আগামী প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী ওসমান গনি বলছেন, "বইমেলায় ছাপা হওয়া বই এর মধ্যে সবোর্চ্চ বিশ শতাংশ হবে নারী লেখকদের বই। আর তার সবাই প্রতিষ্ঠিত বা জনপ্রিয় সাহিত্যিক নন, নতুন বা সিরিয়াস লেখকও আছে তারমধ্যে।"


বইমেলায় নারী লেখকদের বই বিক্রির নির্দিষ্ট হিসেব তিনি বলতে চাননি। তবে, মি. গনি বলছেন, নারী লেখকদের বই এর সংখ্যা কম হবার একটি বড় কারণ অনেক কম সংখ্যক নারীই এই মূহুর্তে লেখালেখি করছেন।

ঢাকার শাহবাগ ও নীলক্ষেতের বই বিক্রেতাদের আনুমানিক হিসেবে, বছর জুড়ে রিপ্রিন্ট এবং আমদানিকৃতসহ প্রায় এক লক্ষ নতুন বই বিক্রি হয়।

এর মধ্যে, নারী লেখকদের বই এর বিক্রি সর্বোচ্চ ত্রিশ শতাংশের বেশি নয়। সেটি বাংলাদেশ এবং ভারতীয় লেখকদের বই এর যৌথ বিক্রির হিসাব। কিন্তু যখন সমাজে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে, সেখানে নারীদের লেখক হিসেবে সংখ্যা কম হবার কারণ কি? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলাম প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কাছে।

তিনি বললেন, "মেয়েরা যে কম লিখছে, তার দায় তো মেয়েদের কেবল নয়। এর সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অনেক কারণ থাকে। এর দায় রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থারও রয়েছে। অনেক সময় তাদের আড়াল করে রাখা হয়।"

তবে, মিসেস হোসেনের পরের প্রজন্মের লেখকেরা এজন্য আরো বিভিন্ন কারণ যেমন লেখালেখির যথেষ্ট পরিবেশ না থাকা এবং প্রকাশকদের আগ্রহের অভাবকে দায়ী করলেন। সেই সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অসহযোগিতাকেও দায়ী করে থাকেন।

সাহিত্যিক নাসরীন জাহান বলছেন, "বাংলাদেশে তো লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়া যায় না, সেটা একটা বিরাট সমস্যা। তার বাইরে একজন পুরুষ যখন লেখেন, তাকে পরিবার অবসর তৈরি করে দেয়। কিন্তু মেয়েদের জন্য তা হয় না।"

এদিকে, বয়সে তরুণ এবং নতুন লেখকদের মধ্যে আলোচিত লেখক অদিতি ফাল্গুনী বলছেন, পরিবারের বাধার পাশাপাশি এক্ষেত্রে অন্যান্য আরো অনেক কারণ রয়েছে। আর টিকে থাকাটা এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

"আমার নারী লেখক জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি জানি যে, অনেক বছর সংগ্রাম করেও পরিবারে সমাজে এত 'জেন্ডার নর্মস' এবং 'ব্যারিয়ার' যে আমি আমার প্রতিভার, ক্ষমতার এবং আইডিয়ার এক হাজার ভাগের একভাগও আমি ব্যবহার করতে পারিনি।"

লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকেই অভিযোগ করেছেন, অনেক সময় নতুন লেখকদের লেখা ছাপানোর জন্য প্রকাশক পাওয়া যায় না। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকেরা পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত লেখকদেরই প্রাধান্য দেন।

এক্ষেত্রে মি. গনির যুক্তি হলো, মুনাফা না হলেও, অন্তত যেন নিজেদের লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত আসে, সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হয় প্রকাশকদের।

"প্রকাশক তো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বই প্রকাশ করেনা। সেক্ষেত্রে আপনি একজনকে প্রমোট করবেন, আপনার লাভ না হোক, আসলটা তো আসতে হবে।"

কিন্তু অদিতি ফাল্গুনী বলছেন, নারী লেখকদের বই এর ডিসপ্লে যেমন হওয়া দরকার, অর্থাৎ বইগুলোকে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেয়া বা নির্দিষ্ট ক্রেতাশ্রেনীকে লক্ষ্য করে কৌশল তৈরি করার বিষয়টি প্রায় কখনোই ভাবা হয়না।

সেক্ষেত্রে তিনি বলছেন, এরফলে নারী লেখদেরই ভুগতে হয় বেশি।

নারী লেখকদের অনেকেই আমাকে বলছিলেন, নারী লেখক তৈরিতে অমর একুশে বইমেলার আয়োজক, এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর ভূমিকা রাখা উচিত।

নব্বই এর দশকে বাংলা একাডেমিতে তরুণ লেখক প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প চালু ছিল, যার মাধ্যমে অনেক নতুন লেখক তৈরিও হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরণের কোন প্রকল্প এখন আর কেউ চালাচ্ছেন না।

জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানালেন, লেখক তৈরির কোন উদ্যোগ এই মূহুর্তে না থাকলেও, ভালো লেখার স্বীকৃতি তারা দিচ্ছেন।

"আমাদের একটি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার আছে, এ বছরে যে দুইজন এই পুরষ্কার পেয়েছেন দুইজনই নারী। পুরষ্কার প্রদান কিংবা ফেলো নির্বাচন উভয় ক্ষেত্রেই আমরা চেষ্টা করি নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে।"

বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে আমি ভাবছিলাম সেলিনা হোসেনের কথা। তিনি বলছিলেন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ'র অমর সৃষ্টি লালসালু কিংবা উনিশ শতকের গোঁড়ার দিকে লেখা বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন কোনদিন বেষ্ট সেলার ছিল না।

সৃষ্টির অনেক বছর পরে এগুলো স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে সেই পথ ধরে লেখক হয়ে ওঠার পথে একজন লেখককে ধৈর্য হয়তো কিছুটা ধরতে হবে।

আর সেই অবসরে ফুলবাড়ির ছাপাখানায় ফি বছরই হয়ত একটু একটু করে বাড়বে নারী লেখকদের লেখা।- বিবিসি।
 
নতুন বার্তা/এইচএস


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top
    close