আর্টস

ঠিকানা

“তোমার মায়ের এতো স্মার্টনেস আমার ভালো লাগেনা, বয়স হইছে এখনো বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈ-হুল্লুড় করে বেড়ান ”
“আস্তে কথা বলো, মা শুনলে কষ্ট পাবেন সোনিয়া “”
“আমি সত্যি বলতে ভয় পাইনা ”
“মায়ের খুঁত ধরা ভিন্ন অন্যকিছু কি তুমি পারো? বিয়ের আগেতো মাকে স্যালুট করতে।”
ডাইনিংয়ে পানি খেতে এসে ছেলে আর ছেলে বউয়ের কথোপকথন শুনে রুমে চলে গেলাম, তৃষা চলে গেছে। আমার ছেলের বউ বিয়ের আগে থেকেই আমায় চিনে। এই মেয়ে তখন স্যালুট দিয়েছিলো সিংগেল মাদার হয়ে দুই বাচ্চা নিয়ে ফাইট করেছি বলে, সময়ে সব বদলে গেছে। ঈর্ষার জন্ম নাকি অভাবে, আমার কিন্তু মনে হয় স্বভাবে। যে পরিবেশে মানুষ বড় হয় –সেই শিক্ষাই আসল শিক্ষা।
“”সোনিয়া আমি বাহিরে যাচ্ছি, ফিরতে দেরী হবে তোমরা খেয়ে নিও ”
“আপনার ছেলে ঘরে ঢুকেই আপনাকে খুঁজবে, আপনি না আসা পর্যন্ত না খেয়েই বসে থাকবে।”
“ওকে বলো বিয়ের পর মাকে খুঁজতে নেই, বউদের সময় দিতে হয়।”
ইচ্ছে করেই কথাটা বললাম। অফিস ফেরত ছেলে ঘরে ঢুকেই মাকে ডাকে, মায়ের রুমে আসে—-সোনিয়ার পছন্দ হয়না। গাধা ছেলে বোঝেনা, নাস্তা দিলে হাতে নাস্তা নিয়ে মায়ের সাথে খাওয়ার জন্য রুমে চলে আসে, বউকেও ডাকে।
ব্যস্ততা দেখিয়ে বউ আসেনা, রান্নাঘরের ঝনঝন শব্দে আমি সব বুঝি। বেকুব ছেলেই শুধু বউয়ের উষ্মা বোঝেনা নাকি ইচ্ছে করেই এমন করে?
দুই ছেলেই মা ন্যাওটা, আমিই ওদের বাবা, আমিই মা তাই আমার সাথেই ওদের যতো আবদার আর গল্প। সোনিয়া এসব পছন্দ করেনা হয়তো, স্বামীকে চায় ষোলআনা কিন্তু আরমান অবুঝ। কোথাও ঘুরতে বের হলেই বেকুবের মতো বলে বসে —–“মা একা বাসায় থেকে কি করবে? তুমিও চলো আমাদের সাথে ”
“নারে বাবা তোরা দুইজন যা, আমি এখন বের হবোনা ”
“”প্লিজ মা তোমাকে বাসায় একা রেখে যেতে ইচ্ছে করেনা ”
“”একটু পর জি-সিনেমায় আমার প্রিয় মুভি দেখাবে, তুই আর সোনিয়া যা।”
“উঁহু তোমাকে যেতেই হবে মা, প্লিজ মা প্লিজ “”
আগে বুঝতামনা, ছেলের আবদারে যেতাম। সোনিয়ার চোখের ভাষা বোঝার পর আর যেতে ইচ্ছে হয়না। আমিও আজকাল অজুহাত খুঁজে বেড়াই আর আগে থেকে টের পেলে বন্ধুদের বাসায় চলে যাই। আমার জন্য ওদের রিলেশন খারাপ হোক আমি চাইনা। ছেলে বিয়ের পরেও বেতনের টাকা মায়ের হাতেই দেয়। সোনিয়া মুখে কিছু না বললেও আমি বুঝি। মেয়ে হয়ে মেয়েদের চিনতে কারো ভূল হয়না।
“আরমান আমাকে ছুটি দে, সংসারের খরচ সোনিয়াকে দিবি। আমি আর সংসার দেখবো না।”
“ঠিক আছে সংসার আমরা দুইজনেই দেখবো, টাকা তোমার কাছেই থাকবে, যার যখন দরকার তোমার কাছ থেকেই নিবো ”
আমি বলি কি আর আমার সারিন্দা বাজায় কি!!!
পিঠাপিঠি দুই ছেলে আরমান আর অর্ণব । ওরা ছোট থাকতেই খবর পেলাম ওদের বাবা ফয়সাল আবারো বিবাহ করেছে, বিশ্বাস করিনি। আসলে ফয়সালকে আমি চিনতেই পারিনি। অফিসের এক বিধবা সহকর্মীর সাথে অবৈধ রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে এই বিয়ে। তীব্র ঘৃণা আর অভিমানে দুই বাচ্চা নিয়ে এক বান্ধবীর বাসায় চলে গেলাম। ওরা এক কিন্ডারগার্টেনে চাকুরী জুটিয়ে দিলো, এক রুমের বাসা নিয়ে আমার নতুন জীবন শুরু করলাম। সবাই বলেছিল কেস করে ফয়সালকে জেলের ভাত খাওয়াও। ভয়াবহ দিন পার করেছি তবুও ফয়সালের মুখ দেখিনি —দুই ছেলেই মায়ের যুদ্ধরূপ দেখেছে। তারপর একটা হাইস্কুলে চাকুরীর ব্যবস্থাও বন্ধুরাই করেছিল। মাঝেমধ্যে সবাই একত্রিত হই।
“”মা কেন পর্দাপুষিদা করেননা? ”
“মাকে সারাজীবন আমরা এভাবেই দেখে এসছি, উনি উনার মতো ”
“একেক বয়সের একেক ধর্ম, এই বয়সে মানুষ বদলায় ”
“প্রতিটি মানুষের চিন্তার জগত আলাদা ”
“আমার মা এমন নয়, উনার কাছে সংসার সবকিছু ”
“মা সারাজীবন খেটেছেন, এখন যা করে আনন্দ পাবেন তাই করবেন ”
“তুমি ছেলেমানুষ, অনেককিছু বোঝো না ”
“মা বিষয়ে আমি কিছুই শুনতে চাইনা,তোমার মানুষিকতা বুঝতে বাকি নেই আমার।”
পাশের রুম থেকে আমি সবই শুনলাম। হায় মেয়ে নেই বলে সোনিয়াকে মেয়েই ভাবছিলাম আর ও আমাকে এই চোখে দেখে!!!মা হয়ে নিজের ছেলের অশান্তির কারণ হলাম! ছোট ছেলে অর্ণব মালয়েশিয়া পড়ে, ওকেও কিচ্ছুই বলতে পারছিনা । গত এক বছরে আমি কতো কি দেখেছি আর শুনেছি!”
“আপনি বড় ভাগ্যবতী বেয়াইন, ছেলেরা আপনাকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা, আমাদেরগুলা বউয়ের কথায় উঠে আর বসে ”
খোঁচাটা আমি বুঝি। মেয়ে বাসায় গিয়ে বলে বলেইতো মা এসব শোনায়।
গত এক বছরে আমি অনেক পরিণত হয়েছি, কাউকে দোষ দেইনা। সোনিয়া আরমানের মা প্রীতি পছন্দ করেনা। সে চায় স্বামী তার কথামত চলুক, আইনের দাবি তার।
সেদিন আরমান হঠাৎ বলে বসলো —-“”মা মেহমানদারী কমাও, সোনিয়া একা সামলাতে পারেনা ”
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া লাগলো, সত্যি টা জানলে আবারো অশান্তি শুরু হবে দুজনের মাঝে। খালাতো বোন ডাক্তার দেখাতে এসেছিলো,সোনিয়ার কষ্ট হবে বলে রান্নাবান্না নিজেই করেছি। আমি আবারো কঠিন হলাম। অনেকদিন আগে গ্রাম্য এক দাদী বলেছিলেন ——“নাতিন মেয়েগো ভালবাসা সারাজীবন একই থাকে, ছেলেদের ভালবাসা টের পাবি ছেলেদের বিয়ার পর, ছেলে তখন আর মায়ের উপর নির্ভরশীল থাকেনা ”
জীবনে অনেক ধাক্কা খেয়েছি, ঠেকে আর ঠকেই অনেককিছু শিখেছি। আগামী মাসে অর্ণব দেশে ফিরলেই আরমান আর সোনিয়াকে আলাদা হয়ে যেতে বলবো। দূরে থেকে যদি সম্পর্ক ভালো থাকে —-সেটাই ভালো। হয়ত ছেলে মনে কষ্ট পাবে তবে দিনের পর তিক্ততা বাড়বেই। বোকা মেয়ে এটুকু বুঝলো না, একদিন সেও মা হবে। মায়ের কাছ থেকে সন্তান কেড়ে নেবার কষ্ট তাকেও পেতে হবে —সময়ের বিচার এটা।
আজকের দুনিয়াটাই হয়ে গেছে আমি, তুমিময়। মহীয়সীরা বিয়ে করেই স্বামীর উপরে একচ্ছত্র অধিকার চায় —–আইনের দাবি তাদের!!

আচ্ছা অর্ণবের বউও যদি আমায় সহ্য করতে না পারে!!হয়তো আমাদের জন্যই নচিকেতা গেয়েছি ——–
“ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম” ঠিকানাহীনদের ঠিকানা।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker