আর্টস

ব্যাখ্যা

প্রায় প্রতিটি মানুষের বুকের ভেতর অচেনা কেউ একজন একান্তে লুকিয়ে থাকে, সময় হলেই সেই অচেনা, অবিশ্বাসের পোকা বেরিয়ে আসে।”তুমি চাকুরী ছাড়বে অথবা আমাকে, ডিসিশন তোমার হাতে লিয়া।”
“যেটার সমাধান আছে, সেটার জন্য চাকুরী ছাড়তে কেন হবে? আর তুমিতো বিয়ের আগে থেকেই জানো আমি জব করি, জেনেশুনে বিয়ে করে এখন কেন এই প্রশ্ন আসছে?”

“প্রেক্ষাপট বদলে গেছে বলে, আমার পরিবার চাইছে না বলে ”
“সংসারের এই সমস্যার সমাধান কিন্তু আছে, আমাকেই চাকুরী ছাড়তে হবে কেন? ”
“সবাই চায় বলে।”
“আমাদের চাওয়া এক হতে পারছেনা শাওন ”
“মা ঠিকই বলে চাকুরী করা মেয়েরা ঠোঁটকাটা হয় ”
অবাক হবার কথা থাকলেও আমি অবাক হইনি। বিয়ের পর থেকেই আমার স্বপ্নময় জগত ভেংগে গেছে। ধাক্কা খাবার পর ভালবাসার মানুষের উপরের খোলস বেরিয়ে সত্যিকার চেহারা বেরিয়েছে তাই অবাক বা বিষ্ময় হইনি এই কথায়।
“লিয়া মেয়েদের কাছে সংসারজীবন আসল, তুই চাকুরীটা ছেড়েই দে ”
“মা টাকা দিয়ে বুয়া রেখেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব, আমি কেন চাকুরী ছাড়বো? ”
“জামাই তোকে ডিভোর্স দিলে আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখাবো কেমন করে? সবাই বলবে তোর মাঝেই সমস্যা ছিলো। ”
“কে কি ভাববে এইজন্য আমি অন্যায়ের কাছে মাথা পেতে দিবো মা! ”
“কিছুই করার নেই মা, মেয়েমানুষ হলেই পদেপদে মেনে নিতে হয় ”
“আমি যে নিজেকে মানুষ ভাবি মা ”
“কিছু হলে আমাদের কাছে আশ্রয় নেই লিয়া, মনে রেখো ”
“ভয় দেখাচ্ছো মা! তুমি কি জানো পৃথিবীটা কতো বড়? পরিবার সংগ দিলে কতো মেয়েদের জীবন যে বদলে যেতো! একটু চিন্তা করে দেখো”
“পড়ালেখা করে চাকুরী করাই কি সব? মেয়েদের আসল জায়গা হলো সংসার —মেয়েরা ত্যাগ করবে এটাই দুনিয়ার নিয়ম ”
“কেন সবার মন যুগিয়ে চলার দায়িত্ব একার নারীর? কে তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে? কেন সবার প্রত্যাশার দাবি নারীকেই দিতে হবে? “
“সংসার বাঁচানোর জন্যই তুই চাকুরী ছাড়বি ”
“দিনশেষে তোমার মতো যাতে আমাকেও শুনতে হয় ঘরের কাজ আবার কোন কাজ নাকি? “
“তোর জেদ তোকে ডোবাবে লিয়া ”
বাবা নামাজ সেরে ঘরে ফিরে আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো —“ব্যাটা তুমি কি অফিস থেকে সরাসরি এসছো? ”
“এতো দেরী করলে কেন বাবা? কাল বিকালবেলা তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো, রেড়ি থেকো ”
“রাতে আমাদের সাথে খেয়ে যাও “
“আজ না বাবা আরেকদিন, শ্বাশুড়িমায়ের জ্বর “
রাস্তায় আসতে আসতে ভাবলাম মানুষ কতো বিচিত্র! সব মানুষের ভিতরেই দুই সত্ত্বা বাস করে। মানুষ ভাবে কেউ টের পাবেনা। আমরা সব বুঝেও মুখ ফুটে বলতে পারিনা, চক্ষুলজ্জা আছে যে! বাবা আজীবন মায়ের কাঁধে সংসার দিয়ে নিজের ভুবনে থেকেছে আর মায়ের ভুল খুঁজে বেড়িয়েছে। আমার অতি সাধারণ মা দুই মেয়ের পিছনে অমানুষিক পরিশ্রম দিয়েছেন যাতে আমরা নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারি। বাবা দুই মেয়ে নিয়ে অনেক গর্ব করেন —আমিতো বুঝি মায়ের কষ্ট কতোখানি! সেই ভোরে নাস্তা টেবিলে দিয়েই আমাদের নিয়ে কোচিং এ ছুটেছেন, ফিরেই আবার রান্নাবান্না করতে বসেছেন। মাকে শুতে দেখিনি, গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের সাথে জেগে থাকতেন। মায়ের কোন জগত ছিলো না।
“মায়ের জ্বর জানা সত্ত্বেও কোথায় গিয়েছিলে?”
“বাসায় একটু কাজ ছিলো”
“কি মহান কাজ ছিলো? টাকা দেয়া না এই ঘরের কথা সেখানে পৌঁছানো?”
“আমার কাছে দুই পরিবার সমান সম্মানীয় শাওন ”
“বিয়ের পর মেয়েদের এক্টাই জীবন ——-শ্বশুর-শ্বাশুড়ির খেদমতগারি করা, স্বামীর মন যুগিয়ে চলা, এর বাহিরে কিছুই না”
“যাদের জন্য আজকের আমি তাদের বেমালুম ভূলে গিয়ে! সন্তান হিসাবে তাদের প্রতিও আমার দায়িত্ব আছে।”
“সবার আগে শ্বশুরালয় লিয়া।”
আচ্ছা কিছু চাওয়ার পাওয়াটা কিভাবে বদলে যায়! সব আঘাতের চিহৃ থাকেনা, বিদীর্ণ শব্দ থাকে —-সেটা বোঝার ক্ষমতাও সবার থাকেনা। নিজেদের পছন্দেই বিয়ে, এখনো এক বছরই হয়নি। চাকুরীসুত্রে পরিচয়, পছন্দ, বিয়ে। বিয়ের আগের শাওনকে আমি আর খুঁজেই পাচ্ছিনা আর। শ্বশুর -শ্বাশুড়ি ছেলের পছন্দকে সানন্দে মেনে নিয়ে উদারতার প্রমাণ দিলেও চাকুরীজীবী বউকে এখন সহ্য করতে পারছেনা। সারাজীবন সংসারে শ্রম দিয়ে এখন চান বউয়ের হাতে সব দায়িত্ব তুলে দিয়ে —–আরাম করতে। আমার কাছে এই চাওয়াটা স্বাভাবিক মনে হয়। শাওনের উচিত ছিলো বাবামায়ের পছন্দের এমন বউ পছন্দ করা। আমি একদম বুঝিনি।
“তুলিকার শ্বশুর হাসপাতালে, মা চাইছেন এই বাসা থেকেই তিনবেলা খাবার যাবে।তুলিকা নিজেও হাসপাতালে।”
“মায়ের চাওয়া ঠিক আছে তবে দুই,একদিন হলে আমি পারবো, আমার অফিস আছে।”
“মা সিক, সংসারে হাজারো ঝামেলা, মা আর কতো দেখবেন?”
“আমি বউ হয়ে আসার আগেও নিশ্চয় অনেক সমস্যা এসেছে, তখন কি তোমরা সামাল দাওনি? ”
“তখন আর এখনের মাঝে পার্থক্য আছে লিয়া।”
“পার্থক্য শুধু এক্টাই আমি বউ হয়ে এসেছি আর তোমরা আমার কাঁধে সব দিয়ে মুক্ত হতে চাইছো, আমি কি চাই সেটা জানতেও চাওনি কেউ।”
“সংসারের স্বার্থে তুমি ছাড় দিলেই সমাধান হয়ে যায়
“বিয়ে হয়েছে বলে সবার প্রত্যাশা আর মনের দাবী আমি মেটাবো কেন?”
“তুমি কি সংসার করতে চাওনা? ”
“সংসার করতে গেলে ছাড় দিতে হয় শাওন, একটা পার্মানেন্ট বুয়া রাখলেই কিন্তু সমস্যার সমাধান করা যায় কিন্তু তোমাদের দাবী আমাকেই চাকুরী ছাড়তে হবে।”
“তুমি নিজের জেদে সব হারাবে লিয়া।”
“আজ বাসায় কেন গেছি, একবারো জিজ্ঞেস করেছো তুমি? না জেনেই আঘাত করেছো। বড় আপু বাহিরে, বাবার ব্লক ধরা পড়েছে, ৭৫% ব্লক। আমার কি কোন দায়িত্ব নেই? তোমার বাবামায়ের জন্য তোমার যে অনুভুতি আমারো একই অনুভূতি শাওন। বিয়ে হয়েছে বলেই কি আমার দায়িত্ব শেষ? ”
“তোমাদের মতো মেয়েদের কাছে স্বামী, সংসারের চেয়েও ক্যারিয়ার বড়।”
“বিয়ে হলেই যদি তোমরা ভাবো সব দায়িত্ব শুধুমাত্র বউয়ের —–আমার কি করার আছে?”সংসার আসলেই আজব জায়গা। যতোই নারী স্বাধীনতার কথা বলা হোক না কেনো আজো চাপে পড়ে মেয়েরাই সব ছাড়তে বাধ্য হয়। ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে ভিতরে, ভিতরে ক্ষয়ে যায়, বুড়িয়ে যায়, খিটখিটে হয়ে যায় ———-বাহির থেকে কিচ্ছু বোঝা যায়না।

আমার আশ্রয়ের জায়গা সঠিক না —-বিরাট ফাঁকি মাত্র। অকারণ ভয়ের কাছে আমি মাথা নোয়াবো না আর কারো কাছেই নিজেকে ব্যাখাও দিবো না আমি লিয়া।নতুনবার্তা/কিউএমএইচ

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker