আর্টস

অচেনা

আংকেল আজ কি খাবেন?
খুব শাক খেতে ইচ্ছে করছে।
রাতের বেলায় শাক খেতে নেই, অন্যকিছু খান। কাল দুপুরবেলা আপনাকে শাকভাজি দেয়া হবে।
শরীরটা ভালো লাগছে না শুধু এক বাটি স্যুপ দাও।
এখন ৭:৩০ বাজে, একবাটি স্যুপ খেয়ে সারারাত থাকতে পারবেননা, সাথে হাল্কা অন্যকিছু নিন।
ইয়্যাংম্যান তুমি সবসময় দাঁড়িয়ে কথা বলো কেন? সামনের চেয়ারটা টেনে বসো।
ওয়েটারদের বসবার নিয়ম নেই এখানে।
ও হ্যাঁ এই কথাটা আগেও বলেছিলে মনে হয়, বয়স হয়েছে কিছু মনে করো না বাবা।
চোখে আসা পানি যাতে কেউ না দেখে চট করে মুছে নিলাম। গত ৩ বছর এই রেস্টুরেন্ট এ কাজ করছি, প্রথম থেকেই দেখে আসছি উনি আমাদের এখানে রেগুলার আসেন। আগে দুজন আসতেন, একসাথে খেতেন, গল্প করতেন। আমরা ওয়েটাররা দূর থেকে দেখতাম আর বলতাম ‘রোম্যান্টিক কাপল’। হায় কিছুদিন পর আংকেল একা হয়ে গেলেন! যেদিন একা খেতে এসেছিলেন বারবার রুমালে চোখ মুছছিলেন। কেন জানি খারাপ লেগেছিলো আমার তাই উনার কাছে গিয়েছিলাম। পাশে যেতেই ঝরঝর করে কেঁদে সঙ্গী হারানোর কষ্ট বলেছিলেন। সরকারী অফিসের বড় আমলা এখন রিটায়ারে আছেন। দুই ছেলেমেয়ে বিদেশে পড়তে গিয়ে আর দেশমুখী হয়নি, দুজনে সেখানে বিয়ে করে ভালোই আছে। ছেলে বাবামাকে নিজের কাছে রাখার চেষ্টা করেছে কিন্তু উনাদের মন বসেনি। একজন না ফেরার দেশে গিয়ে উনাকে বড় বেশী একা করে গেছেন। ভয়াবহ একাকীত্বকে সঙ্গী করে উনি একাই বাসায় থাকেন, স্মৃতিরক্ষা করেন।
রেজা গত দুইদিন আংকেল আসেননি, খাবার অডার্র দেননি । আমি ফোন করেছিলাম ধরেননি, তুমি কি একটু উনার বাসায় যেতে পারবে?
স্যার আমিতো ঠিকানা জানি না।
যাবার পথে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে।
আমাদের ম্যানেজার এতো কঠিন স্বভাবের যে, আড়ালে আমরা সবাই তাকে খড়ুশ ডাকি। সামান্য ভুল-ভ্রান্ত্রি হলে গালিগালাজ সাধারণ ব্যাপার। মাঝেমধ্যে ভুলের জন্য টাকা পর্যন্ত কেটে রাখেন। তবে আমাদের কেউ বিপদে পড়লে সাহায্যার্থে এগিয়েও আসেন। সবাই উনাকে প্রচন্ড ভয় পায়। ম্যানেজার সময় পেলে আংকেলের সাথে গল্প করেন তবে সেভাবে সময় পাননা কারণ এটা খুব চালু রেস্টুরেন্ট আর পাশেই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, সারাদিন ভীড় লেগেই থাকে। আমাদের কিছু রেগুলার কাস্টমারের মাঝে আংকেল একজন।
ঠিকানা নিতে গিয়ে দেখি কিছু টাকাও দিয়েছেন ম্যানেজার স্যার। বিশাল এপার্টমেন্ট এর দারোয়ান অনুমতি দিলো না হয়ত আমার পোশাকাদি পছন্দ হয়নি। রেস্টুরেন্ট এর ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দেবার পর অনুমতি পেলাম। বেল বাজানোর পর বয়স্ক একজন গেট খুলে জিজ্ঞেস করলো —-“কারে চান?”
আমি রেস্টুরেন্ট থেকে এসছি, আংকেল বাসায় নেই?
দুইদিন ধইরা অনেক জ্বর, আসেন ভিতরে আসেন।
আংকেলের কপালে হাত রাখামাত্রই বললেন —-“রিজভী এসেছিস বাপ?”
আংকেল আমি রেস্টুরেন্ট থেকে এসছি।
বৌমা আর নাতিকে আনিসনি? নাতিকে দেখতে মন চায়।
আমি বুড়ো মানুষ টাকে জিজ্ঞেস করলাম- উনার আত্মীয় স্বজনকে খবর দিয়েছেন?
“বাজান আমি বাগানের মালী, মাঝেমধ্যে ঘর পরিষ্কার করতে উনি ডাকেন তাই আসি। গত দুইদিন জ্বর দেখে বাড়ি যাইনি।”
উনার পরিচিত কেউ কি আছেন আশেপাশে?
বাজান আমি কিচ্ছু জানি না, ফোন বাজলে না হয় কইতাম কাউরে।
আংকেলের মোবাইল বাজেনি একবারো?
আমি শুনি নাই, আমনে কি হন? আইজ রাইত একটু থাকতে পারবেন? দুই রাইত জাইগা আমার খারাপ লাগতাছে।
আমি থাকতে পারবো তবে আপনাকে সকালেই আসতে হবে।
আইজকাল কাউরে বিশ্বাস করন যায়না তাই জিগাইলাম। মনে কিছু নিয়েন না।
“আংকেল ঠিক আছেন?”- ম্যানেজারের ম্যাসেজ।
উনি অনেক সিক, প্রায় অচেতন।
“তুমি সেখানে থাকো, আমি আসতেছি।”
আংকেলের দিকে তাকালাম। সময় কতো নির্মম! এক সময়ে দাপটে চলা মানুষটার পাশে কেউ নেই। বাবার কথা মনে পড়ে অজান্তেই চোখে পানি চলে এলো। বিদেশ গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়ে টাকা পাইনি বলেই রাগ করে বাসা ছেড়েছি আজ তিন বছর। স্কুল শিক্ষক বাবা অসহায়ভাবে বলেছিলেন সামর্থ্য নাইরে বাপ। পাঁচভাইবোনকে পড়াতে গিয়ে বাবা নিজেও হিমসিম খাচ্ছেন। বাবার অক্ষমতা বুঝিনি বলে বুকের ভিতর কষ্ট হচ্ছে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker