শিক্ষাঙ্গনসাহিত্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

রুশোর স্বীকারোক্তি

নাসরিন জাহান লুনা: ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আধুনিক সমাজকাঠামোর ভিত্তি গড়ে ওঠে। ‘স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব’- ফরাসি বিপ্লবের এই তিনটি মূলমন্ত্র আজ আমাদের আধুনিক সমাজ কাঠামোর মৌলিক শর্ত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। শুধু সমাজ কাঠামোর ক্ষেত্রেই না আধুনিককালের গনতন্ত্রাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সমতা এমনকি মানুষের মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রগুলোতেও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধেও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এমন কি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে কয়েকটি জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলন হয়েছে বা হচ্ছে সেখানেও ফরাসি বিপ্লবের  একটি ছায়া দেখা যায়। আগামীতেও হয়তো এই বিপ্লবের প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব না।

ফরাসি বিপ্লবের সাথে যাঁর নামটি ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তিনি হলেন- ‘জ্যাঁ জ্যাক রুশো’ সংক্ষেপে শুধু ‘রুশো’। রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের প্রাণ পুরুষ বলা হয়। রুশোর মৃত্যুর দশ বছর পরে ফরাসি বিপ্লব সংগঠিত হয় কিন্তু তাঁর স্বাধীনতা ও সাম্যের দর্শনই ছিল ফরাসিদের মুক্তিসংগ্রামের মূল অনুপ্রেরণা। তাই ফরাসি বিপ্লবের তাৎপর্য বুঝতে হলে অবশ্যই আগে রুশোকে বুঝতে হবে; জানতে হবে তাঁর জীবনচরিত, দর্শন, দেশ-সমাজ-জাতি এবং সর্বোপরি বিশ্ব মানবতা নিয়ে তঁর নিজস্ব মূল্যবোধ।

রুশো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন সমাজ-সংস্কারক, সমাজতন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, যুক্তিবিদ তেমনই অন্যদিকে ছিলেন দার্শনিক, লেখক ও সঙ্গীতজ্ঞ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি এবং সংস্কৃতির একাধিক ক্ষেত্রে পদচারণা ছিল তাঁর। ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক। প্রেম আর দ্রোহের বিরল সংমিশ্রণ ঘটেছিল তাঁর মননে; যে কারণে একই রুশোর মধ্যে কখনও দেখতে পাওয়া যায় প্রেমিক-পুরুষ আবার কখনও বা বিপ্লবী বীর।

বিস্ময়কর ব্যাপরটি হচ্ছে, বহুমুখী প্রতিভার এই ব্যাক্তিত্ব ছিলেন অশিক্ষিত! জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর যে গভীর ও সুদৃঢ় জ্ঞান তা তিনি অর্জন করেছিলেন প্রখর অনুভূতি শক্তি দিয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। মেধা আর মননের অবিরাম চর্চায় তাঁর প্রতিভা বিকশিত হয় এবং শেষে মানবিক শুদ্ধতার একটি আদর্শিক মানদন্ড হয়ে আমাদের দিক নির্দেশনা দেন।
রুশোর একমাত্র আত্মজীবনী গ্রন্থ The Confessions পাঠ করলে আমরা তাঁর কিছুটা পরিচয় লাভ করতে পারব। কিছুটা বললাম কারণ এই গ্রন্থে আমরা যে রুশোকে দেখি সেটা রুশোর একটা অংশবিশেষ মাত্র; পূর্ণাঙ্গ রুশো নন। তবে এই সময়টাই রুশোর জীবনকালের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সময়- জীবনের একটা ক্রান্তিলগ্ন। এটা এমন একটা সময় যখন সুইজারল্যান্ডের এক হতদরিদ্র ঘড়ি নির্মাতার ছেলে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মহাকালের ছন্দ নিয়ন্ত্রক; ফরাসিবাসীর অন্যতম ভাগ্য নিয়ন্তা এবং সর্বোপরি বিশ্ব মানতবাদের অগ্রগামী পথ প্রদর্শক।

মানব ইতিহাসে এমন বৈপ্লবিক সত্ত্বা খুবই বিরল যাঁরা একটি দাবীর জন্য পুরো একটা জাতিকে একত্রে একটা মঞ্চে এনে ঠাই দিতে পেরেছেন। রুশো তাঁদের একজন। তাঁর মৃত্যুর ১০ বছর পরে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হলেও তার বুনিয়াদ রুশোই প্রথম স্থাপন করে দিয়েছিলেন। The Confessions গ্রন্থটিতে আমরা সেইসব নিধির উৎসেরই সন্ধান খুঁজে পাবো। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে এই গ্রন্থটি শুধুমাত্র রুশোর জীবনের একটি কালিক পর্যায় উপস্থাপন করে মাত্র। পুরো রুশোকে জানতে হলে আমাদের তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ যেমন Du contrat social ou principles du droitpolitique(ইংরেজীতে The Social Contract), Emilie(ইংরেজীতে On Education)ইত্যাদি পাঠ করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। কিন্তু প্রারম্ভিক পর্যায়ে এই গ্রন্থটাই আমাদের রুশোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।

মূল গ্রন্থ (ফরাসি ভাষায় Les Confessions) রুশো কবে লিখেছেন তা নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে তবে মূল গ্রন্থটির The Confessions নামে প্রথম ইংরেজী অনুবাদ হয় ১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দে; তাঁর মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর পর- কোন এক নামহীন অনুবাদকের স্বাক্ষরে। পুরো গ্রন্থটি সর্বমোট দু’টি খন্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খন্ড আবার ছয়টি আলাদা পুস্তকের সন্নিবেশন কিন্তু দ্বিতীয় খন্ডে শুধুমাত্র একটি পুস্তক (সপ্তম পুস্তক) রয়েছে। এই আলাদা আলাদা পুস্তকগুলো প্রকৃতপক্ষে রুশোর জীবনের এক একটা সময়ের বর্ণনা। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন স্মরণীয় ও বিস্মৃত ঘটনাসমূহ, তাঁর পারিবারিক বিবরণী, তাঁর ভয়-দুঃসাহস, দুঃখ-আনন্দ, প্রেম-অপ্রেম, প্রাপ্তি-ব্যর্থতাসহ জীবনের বিভিন্ন উজ্জ্বল ও অন্ধকার দিকসমূহ উঠে এসেছে গ্রন্থের খন্ডিত পুস্তকগুলোতে। তবে গন্থটির সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো রুশোর আত্ন-স্বীকারোক্তি। এই আত্ম-স্বীকারক্তিগুলোই পরবর্তীকালে রুশোকে মানব থেকে দেবতার স্থানে এগিয়ে দেয়।

The Confessions গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেন প্রখ্যাত বিশ্লেষক, সমালোচক, গবেষক ও লেখক সরদার ফজলুল করিম। আমাদের দুর্ভাগ্য ছিল ইতিপূর্বে বইটির কোন বঙ্গানুবাদ হয় নি। সরদার ফজলুল করিমই সর্বপ্রথম আমি রুশো বলছিঃ দি কনফেশানস নামে রুশোর এই আত্মজীবনীটি বাংলা অনুবাদ করার মতো দুঃসাধ্য কাজ সম্পন্ন করেছেন। অনুবাদ গ্রন্থটিকে মূল গ্রন্থের অনুকরণেই বিন্যাস করা হয়েছে। তবে তাঁর সাবলীল ভাষা ও নিরপেক্ষ উপস্থাপনা যে অনুবাদটিকে মূল গ্রন্থের সম পর্যায়ে স্থান করে দিয়েছে তা নিয়ে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। সরদার ফজলুল করিমের এই অনুবাদ একদিকে যেমন মহামতি রুশোর সাথে আমাদের সরাসরি পরিচিত হবার সুযোগ করে দেয় তেমনই অন্যদিকে বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাই স্বীকার করতেই হবে, উভয় দিক থেকেই আমরা সরদার ফজলুল করিমের নিকট ঋণী।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker