বিনোদন

বাংলা সিনেমায় নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে ‘কমলা রকেট’

সম্প্রতি বাংলা সিনেমায় নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। বেশির ভাগ মানুষের অগোচরে সিনেমা হলে এসেছিলো অসাধারন এক মৌলিক গল্পের সিনেমা
‘ কমলা রকেট’।

‘কমলা রকেট’ একটি স্টিমারের গল্প, ইংরেজিতে এর নাম দেয়া হয়েছে ‘দ্য অরেঞ্জ শিপ’। ঢাকা থেকে খুলনাগামী স্টিমারটির যাত্রী যে মানুষ, তাদের কাহিনী হলো কমলা রকেট। তবে এ কেবল স্টিমারে থাকা অনেক মানুষের আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত গল্প নয়, এটি হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক বাংলাদেশেরই গল্প।

চলচ্চিত্রের অন্যতম চরিত্র আতিক হলো উচ্চবিত্তের প্রতিনিধি, ফার্স্টক্লাস কেবিনে ভ্রমণ করছে,তার ‘মাল্টিপল বিজনেস আছে’ বলে । মনসুর হলো নিম্নবিত্তের প্রতিনিধি, যে নিজের স্ত্রীর মরদেহ নিয়ে একই স্টিমারে ভ্রমণ করছে। এদের মধ্যে যোগ হলো, কারখানায় আগুন লেগে গেলে মনসুরের গার্মেন্টসকর্মী স্ত্রী মারা গেছে, আর সেই কারখানার মালিক হলো আতিক, পুরানা ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগিয়ে ইন্স্যুরেন্স থেকে টাকা বাগাবার জন্য আত্মগোপন করতে মংলায় বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছে। উঠতি এক ধনিক পরিবারও ফার্স্ট ক্লাসে রয়েছে, যার কর্তার রয়েছে গাড়ি বিক্রির ব্যবসা, যে সপরিবারে কানাডায় অভিবাসন করার ধান্দায় আছে, যার স্ত্রী গতানুগতিকভাবে কলহ ও সন্দেহপ্রবণ, শিশুসন্তানের পরীক্ষা নিয়ে অকারণে উদ্বিগ্ন। এই পরিবারের সঙ্গে রয়েছে স্ত্রীটির বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বোন যে বর্তমান ‘কনফিউজড’ তারুণ্যের প্রতিনিধি — দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চায় আবার বিদেশেও যেতে চায়, টিপিকাল চাকরি-বাকরিতে আগ্রহ নেই আবার বিসিএসের রেজাল্টে টিকলে খুশি হয়, অন্যদিকে যে আবার প্রেম-যৌনতা বিষয়ে অ্যাডভেঞ্চারাস, রাতে চুপিসারে ছেলেবন্ধুকে কেবিনে এনে তোলে। এদের সবার সঙ্গে যোগসূত্র হয়ে ওঠে এক বর্ণিল ও বহুমুখী চরিত্র মফিজ। সব চরিত্র আমাদের মোটামুটি চেনা হলেও মফিজ আমাদের জানাশোনা মানুষজনের বাইরের এক চরিত্র — স্টিমারের ইঞ্জিনরুম থেকে ফার্স্টক্লাস কেবিন পর্যন্ত তার অবাধ যাতায়ত; একদিকে সে নানান ‘শাস্ত্রীয়’ বাণীসমৃদ্ধ বইয়ের লেখক, অন্যদিকে স্টিমারের লোকজনের মনোরঞ্জনের জন্য যৌনকর্মী সরবরাহকারীও বটে। উচ্চবিত্তের আতিকের সঙ্গে সে গায়ে পড়ে আলাপ করে, আবার নিম্নবিত্তের মনসুর তার পরিচিত-আত্মীয়র মতো। স্টিমারের যে ছোট সার্কাস পার্টি, সারাক্ষণ খেলা দেখিয়ে চলেছে, তারও কো-অর্ডিনেটর সে। তার শাস্ত্রীয় বাণীসমৃদ্ধ বইগুলোকে মনে হবে অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কারে পরিপূর্ণ — যেমন কোন রাতের কোন সময়ে স্ত্রী সহবাস করলে সন্তান চোর হবে ইত্যাদি ধরনের প্রশ্নের উত্তর তার বইতে লেখা থাকে। তবে এইসব জ্ঞান সে অর্জন করেছে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে, মানুষের মুখের কথা ও বিশ্বাসকে লিপিবদ্ধ করে চলেছে সে। সে হিসেবে তার বই হলো মিথ ও সংস্কারের ভাণ্ডার, অজান্তেই সে নৃবৈজ্ঞানিক মাঠগবেষণার কাজ করে চলেছে। তার কথাবার্তায় অনেক সময় বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার ছাপ পাওয়া যায় — চেহারা দেখে সে বলে দিতে পারে মানুষের ভেতরটা, কপাল চওড়া ও ছোট হবার মধ্যেই নাকি লুকিয়ে থাকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই ধারণাকে আতিক চ্যালেঞ্জ করলে, সে স্বীকার করে বলে মানুষের মনটা তো পড়া যায় না, চেহারাই মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। চরিত্র হিসেবে আতিক, মনসুর, স্বামী-স্ত্রী ‘ফ্ল্যাট’ (অনুমানযোগ্য), আর মফিজ হলো ‘রাউন্ড’ (অনুমান অযোগ্য) চরিত্র। তরুণী চরিত্রটিকেও রাউন্ড চরিত্র বলা যায়।
উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, সব শ্রেণির মানুষই আছে এখানে, এরা পরস্পর অপরিচিত হলেও, এদের মধ্যে পারস্পরিক যোগও রয়েছে।

কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের ‘মৌলিক’ ও ‘সাইপ্রাস’ নামের দুই ছোটগল্পকে এক জায়গায় এনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন নূর ইমরান মিঠু। কাহিনীকার ও পরিচালক দু’জন মিলেই চিত্রনাট্য চূড়ান্ত করেছেন। এক স্টিমার যাত্রার মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের একটি বড় চিত্রই উঠে এসেছে। স্টিমারের সীমিত পরিসর এবং পুরো দেশের বৃহৎ পরিসরের মধ্যে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট যথেষ্ট হয়েছে। তৈরীপোশাক শিল্পে যে শ্রমশোষণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি, এবং মুনাফালোভী মালিকশ্রেণির যে দুর্বৃত্তায়ন তা ঠিকই চলচ্চিত্রে ধরা পড়েছে।
এই চলচ্চিত্রের সেরা দৃশ্য হলো আতিকের দুঃস্বপ্ন দৃশ্যটি, পানিতে ডুবে যাচ্ছে আতিক, একটি সাপ তার গলা পেচিয়ে ধরেছে, আর তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তৈরীপোশাকের সব গ্লোবাল ব্র্যান্ডের লোগো। এক্ষেত্রে সাপটা প্লাস্টিকের না হয়ে আরও বাস্তবানুগ হলে ভালো হতো। শোকগ্রস্ত মনসুর স্থির বসে আছে আর পশ্চাতে সার্কাস খেলা চলছে এরকম ফ্রেমিং জীবনের বৈপরীত্যকে ভালোভাবে তুলে ধরেছে। মফিজের চরিত্রে মোশাররফ করিম ভালো করেছেন, তবে আতিকের চরিত্রে তৌকীর আহমেদের আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। তুলনায় তরুণীর চরিত্রে সামিয়া সাঈদ ভালো করেছেন। মনসুরের চরিত্রে জয়রাজ মানানসই ছিলেন। চিত্রগ্রাহক গোলাম মাওলা নবীরের ড্রোন শটগুলো নদীবক্ষে কমলা রঙের স্টিমারকে ভালোভাবে তুলে এনেছে। তবে চরে আটকে পড়া স্টিমারকে যখন দেখানো হয়, তখন যে পূর্ণ-নদীকে আমরা দেখি, তা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। লাশ ক্রমশ পঁচছে, আর পোকা-মাছির ভনভনানি বাড়ছে, শৈব তালুকদারের শব্দগ্রহণের এই কাজটি ভালো হয়েছে। তবে মফিজের গুরুর ভোকাল সঙ্গীতটির মিক্সিং ঠিক হয় নি, দৃশ্যান্তরে গেলেও গানের শাব্দিক মাত্রা একই থেকে গেছে। কিছু কিছু অতি হ্রস্ব দৃশ্য স্টিমার ও চলচ্চিত্রের ধীর ছন্দের সঙ্গে মানানসই হয় নি পাভেল আরিনের নেপথ্য সঙ্গীত মানানসই হয়েছে। কমলা রকেট দেখে
সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে শুধু আপনার মনে হবে আমাদের নিজস্ব গল্পের একটি মৌলিক সিনেমা দেখলাম। বাংলা সিনেমার এই নবীন নির্মাতার জয় গান ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker