বিনোদন

ভাওয়াল রাজার জীবন কিংবা সৃজিতের প্রত্যাবর্তন

মাহমুদুর রহমান : এক যে ছিল রাজা। যেমন তার রূপ, তেমনই তার গুণ। তিনি উদার, তিনি প্রজা দরদী। কখনও তিনি কঠোর। স্ত্রীর প্রতি তার প্রেম আছে, আবার বাইজীর বাড়িতেও কাটিয়ে দেন বহু রাত। তারপর একদিন রাজার হলো অসুখ। ডাক্তার দিলেন বায়ু পরিবর্তনের নির্দেশ। স্ত্রীকে নিয়ে হাওয়া বদলে গেলেন রাজা, সেখানেই মৃত্যু। অথচ, তিনি ফিরে এলেন আবার তবে সন্ন্যাসী হয়ে।
এটি কোন গল্পের কাহিনী নয়। ভাওয়াল এস্টেটের রাজা রমেন্দ্র নারায়ণের  জীবনের সত্য ঘটনা। এ ঘটনা নিয়ে বহু কাহিনী রচিত হয়েছে। নাটক হয়েছে, সিনেমা হয়েছে। রমেন্দ্রনারায়ণের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার। সেই কাহিনী আবার পর্দায় নিয়ে হাজির হয়েছেন সৃজিত মুখার্জি।
পরিচালক হিসেবে সৃজিতের আগমন ২০১০ সালে, ‘অটোগ্রাফ’ সিনেমার মাধ্যমে। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ থেকে অনুপ্রাণিত এ সিনেমাটি দর্শকরা গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে ‘বাইশে শ্রাবণ’ সাড়া ফেলে দেয় কলকাতা, এমনকি বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে। এরপর উত্তম কুমারের ‘এন্টনি ফিরিঙ্গী’ থেকে অনুপ্রাণিত ‘জাতিস্মর’ সিনেমায় সৃজিতের প্রতিভা প্রকাশ পায়। এবং সম্ভবত তার সবচেয়ে ভালো কাজটির নাম ‘রাজকাহিনী’।
কিন্তু সৃজিত যে প্রতিভার পরিচয় রেখেছিলেন, পরবর্তীতে তা যেন ধরে রাখতে পারলেন না। ‘কাকাবাবু’ সিরিজের সিনেমায় হতাশ দর্শকেরা। এরপর বহুল আকাঙ্ক্ষিত ‘জুলফিকার’-এর ভরাডুবি। এই বছরে মুক্তি পাওয়া ‘উমা’-ও সিনেমাপ্রেমী কিংবা বোদ্ধা, কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
পূজা উপলক্ষে সৃজিত ফিরছেন তার নতুন সিনেমা ‘এক যে ছিল রাজা’ নিয়ে। ঠিক যেমন ফিরেছিলেন রমেন্দ্রনারায়ণ।
১৯০৯ সালে মৃত্যু হয়েছিল রমেন্দ্রনারায়ণের। দার্জিলিঙে, এক বর্ষণমুখর রাতে তার শবদাহ অসম্পূর্ণ রেখে ধরে নেওয়া হয়, তিনি মারা গেছেন এবং দাহ সম্পন্ন। পরবর্তীতে ১৯২০/২১ সালে ঢাকার বকল্যান্ড বাঁধে এক নাগা সন্ন্যাসীর দেখা পাওয়া যায়, পরবর্তীতে যিনি নিজেকে রমেন্দ্রনারায়ণ বলে দাবি করেন। এবং এ নিয়ে মামলা হয়, যা ‘ভাওয়াল এস্টেট মামলা’ বা ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা’ নামে পরিচিত।
পাঁচ লাখ প্রজা নিয়ে জমিদারী ছিল ভাওয়াল এস্টেটের। তিন ভাইয়ের মধ্যে রমেন্দ্রনারায়ণ রায় ছিলেন মেজো। তাই তিনি মেজকুমার নামেও পরিচিত। প্রচলিত কাহিনী এবং সুত্র অনুযায়ী, তিনি ছিলেন প্রতিভাবান এবং প্রজাবৎসল। কিন্তু মদ্যপান এবং পরনারীতে আসক্ত।
এই ঘটনাকে সেলুলয়েডে আনছেন সৃজিত। মুখ্য চরিত্রে যীশু সেনগুপ্ত। রমেন্দ্রর স্ত্রী বিভাবতী দেবীর চরিত্রে জয়া আহসান। আছেন দুই প্রবীণ এবং গুণী শিল্পী অঞ্জন দত্ত ও অপর্ণা সেন। তরুণ অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য।
ভাওয়াল সন্ন্যাসীকে নিয়ে ইতঃপূর্বে আরও অনেক সিনেমা হয়েছে এবং সম্প্রতি স্টার জলসায় একটি ডেইলি সোপও তৈরি হয়েছে। সে সবের বেশীরভাগই আবেগময়, প্রেম-কাহিনী। উত্তম কুমার অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ও মূল কাহিনী থেকে সরে গিয়েছিল অনেক।
সৃজিতের কাছে প্রধান আশা, সিনেম্যাটিক আবেগ বাদ দিয়ে চাঁছাচোলা প্রেজেন্টেশন। মূলত রমেন্দ্রনারায়ণেরর যে ‘সিফিলিস’ হয়েছিলো সেটা কোন সিনেমায়/সিরিয়ালে দেখানো হয় না। সৃজিত দেখাবে আশা করি। রমেন্দ্রর পুনরাভির্ভাব হয়েছিল ‘নাগা সন্ন্যাসী’ (এরা নগ্ন থাকে) হিসেবে, যেটা উত্তমের সিনেমায় দেখানো সম্ভব ছিল না। সৃজিতের সন্ন্যাসী যে নগ্ন, সেটা সৃজিতের সিনেমার ট্রেলারে স্পষ্ট। সিনেমার ট্রেলারও আশা জাগানিয়া।
সৃজিত বানিজ্যিক সিনেমার দিকে ঝুঁকে গেছেন অনেক আগেই। এই সিনেমাও তার ব্যতিক্রম হয়। কিন্তু ‘ভালো সিনেমা’ নিয়ে দর্শকের কাছে তার ফিরে আসা প্রয়োজন। তাই ভাওয়াল রাজার সাথে সাথে এই সিনেমার মাধ্যমে সৃজিতও স্বরুপে ফিরে আসবেন আশা করি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker