বিনোদন

সত্যিকারের ‘ঠগী’ এবং বলিউডের ঠকবাজি!

মাহমুদুর রহমান:  ভারতবর্ষের বৈচিত্র্য, আর অগুণতি রহস্যের একটির নাম ‘ঠগী’। এরা ‘ঠগ’ নামেও পরিচিত। আজকাল ঠগ বলতে যে দুর্নীতিপরায়ণ বা জোচ্চুরি বোঝায়, ‘ঠগ’ কিন্তু তা ছিল না। এরা ছিল একটি সঙ্ঘবদ্ধ গোষ্ঠী, যাদের পেশা ছিল পথিকদের হত্যা করে তাদের সর্বস্ব লুঠ করা। ব্যবসা কিংবা অন্য প্রয়োজনে পথ চলা পথিকদের হত্যা করে তাদের সর্বস্ব লুঠ করাই ছিল এদের পেশা.

চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন কিছু না। কিন্তু ঠগী, ব্যতিক্রম। তাদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা রেশমী রুমালের ফাঁসে মানুষ হত্যা করতো। হত্যার পরে লাশ গুম করা তাদের অন্যতম কৃতিত্ব। ঠগরা যাদের হত্যা করতো, তাদের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।
ঠগী এক ভিন্ন ধর্ম। সেখানে তাদের দেবী ভবানী, কিংবা কালী। কিন্তু অদ্ভূত বিষয় হলো, ঠগী মুসলিমও হতে পারে। হিন্দু মুসলিম যে কেউই ঠগী হতো, সে হতো ভবানী তথা কালীর উপাসক। মুসলিম ঠগী নামায পড়তো, আবার ভবানীকে দেবী মনে করতো। মুসলিম আচার পালন করতো তারা, বিয়ে শাদি হতো ইসলামি রীতিতে। তারা মনে করতো যেসব মানুষকে তারা হত্যা করছে তা করছে তারা দেবীর আদেশে। ঠগীদের ভাষাও ছিল আলাদা। নিজেদের মাঝে তারা সেই ভাষায় কথা বলতো।
ঠগিদের উত্থান সেই সময়ে যখন মোগলদের শক্তি শেষ, টিকে আছে শুধু নাম। নাদির শাহ্, আহমদ শাহ্ আবদালীদের লুন্ঠনে ভারত তখন ধুকছে। আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে কোম্পানীর শাসন। সেই সময়ে ঠগীদের হাতে বেমালুম নিখোঁজ হয়ে যেতো অনেক মানুষ।

ইংরেজ পুলিশ স্লীম্যান সেই ঠগী দমনে নামেন। আঁটঘাট বেঁধে প্রচুর গবেষণা, আর বিস্তর পরিশ্রমে সমূলে উৎখাত করেন ঠগী। তাদের পরিবারের জন্য পূনর্বাসনের ব্যবস্থাও করেন। আর তাই তার নামে হয়ে যায় ‘ঠগী স্লীম্যান’।এই ঠগিদের মধ্যে একজন ছিলেন আমীর আলি। তার বাবা মা ছেলেবেলায় ঠগদের হাতে খুণ হয়। অতঃপর ঠগী ইসমাইল তাকে ছেলে বলে বড় করে তোলে। দিনে দিনেনে আমীর একজন তুখোর ঠগীতে পরিণত হয়। পুরো ঠগী জীবনে সে প্রায় ৭০০ মানুষ হত্যা করে যার বর্ণণা সে দিয়েছে ইংরেজ অফিসারের কাছে। আমীরের জীবন নিয়ে পরবর্তীতে ফিলিপ মিডো টেইলর একটি বই লেখেন, ‘কনফেশন্স অফ আ থাগ’।

সেই বইয়ের কাহিনী নিয়েই বলিউডে সিনেমা তৈরির কথা ছিল। আমীর আলির চরিত্রে আমির খান, আমীরের পালক পিতা ইসমাইলের চরিত্রে অমিতাভ বচ্চন। কিন্তু বহুদিনের আরাধ্য সেই সিনেমার ইদানীং প্রকাশিত পোস্টার দেখে মনে হচ্ছিলো, ঠগি কাহিনী থেকে অনেক দূরে সরে গেছে সিনেমার কাহিনী। সিনেমার ট্রেইলার বের হওয়ার পর সব সন্দেহের অবসান।

মূলত ভারতবর্ষে ‘ঠগ’ নামে যে বর্বর দস্যু সম্প্রদায় ছিল, তাদের নিয়ে মোটেও এই সিনেমা তৈরি হয়নি। কেবল ‘ঠগ’ শব্দটি ব্যবহার করে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। বলিউডের বর্তমান সময়ে এমন ‘আই ওয়াশ’ হরহামেশাই দেখা যায়। সিনেমার ট্রেইলারে স্পষ্ট যে এটি হলিউডের পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান থেকে ‘অনুপ্রাণিত’।

ভারতের বুন্দেলখন্ড, রাজস্থানের মতো জায়গায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গড়ে ওঠা ঠগ সম্প্রদায় কখনই ‘ব্রিটিশ’ বিরোধী শক্তি ছিল না। অন্তত সিনেমায় যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবাস্তব। আসলে ‘ব্রিটিশ বিরোধী’ হিসেবে দাড় করালে সিনেমা ভালো বিক্রি হয়। ঠিক এই কাজই করা হয়েছিল ২০১০ সালে সালমান খানের ‘ভীর’ সিনেমায়। সেখানে দেখানো ‘পিণ্ডারি’ সম্প্রদায়ও আসলে ছিল স্রেফ দস্যু।

পরিচালক হিসেবে বিজয়কৃষ্ণ আচার্য আহামরি কিছু তো ননই, বরং তার ‘ধুম ৩’ রীতিমত সমালোচিত। ‘থাগস অফ হিন্দুস্তান’-এর বিজ্ঞাপনও হাস্যকর। কিন্তু মজার ব্যপার এই যে, প্রথম যখন বছর দেড়-দুই আগে সিনেমার পাত্রপাত্রীদের সম্ভাব্য ‘লুক’ দেখানো হয়েছিল, সেখানে পাগড়ী মাথার আমির-অমিতাভ এবং ট্রেডিশনাল রাজস্থানি পোষাকে ক্যাটরিনাকে দেখে মনে হয়েছিল ভালো কিছু আসছে। তখন বলাও হয়েছিল টেইলরের বই থেকে এই সিনেমা, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে কাহিনীকার স্বয়ং বিজয়কৃষ্ণ আচার্য। সম্ভবত পরবর্তীতে, ‘বাজার’ ধরার জন্য পরিচালক পথ বদলেছেন।

‘ঠগ’ কারা ছিল, আর সিনেমায় কি দেখানো হচ্ছে? বর্তমান সময়ে সিনেমা গণমানুষের কাছে পৌঁছনোর সহজ মাধ্যম। আর সে মাধ্যম ব্যবহার করে বলিউড কখনও বুঝে কখনও না বুঝে ইতিহাস বিকৃত করেই চলেছে। ‘থাগস অফ হিন্দুস্তান’ সেই যাত্রায় আরেকটি সংযোজন হতে যাচ্ছে কি?

Thugs of Hindostan সিনেমার অফিসিয়াল ট্রেইলার লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=zI-Pux4uaqM

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker