বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

“In The Fade”- এক বেদনাদায়ক রাজনৈতিক আখ্যান

মাসুম শাহরিয়ার: নয়া-নাৎসি বনাম মুসলিম অভিবাসী, ব্যর্থ বিচারনীতি, প্রতিশোধ, সুইসাইড বোম্বিং নিয়ে গড়ে উঠেছে পরিচালক ফাতেহ আকিনের নতুন সিনেমা “In The Fade”, যা গত বছর কান চলচিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করে।

নয়া-নাৎসিদের আক্রমণে স্বামী-সন্তান মারা যায় গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের। পুলিশ আসে, তল্লাশি চলে, কোর্ট-কাচারি হয়। কিন্তু ন্যায়বিচার মিলে না। তারপর প্রতিশোধের বান আসে। সেই বন্যায় ভেসে যায় মনুষ্যত্ব। ফাতেহ আকিন পরিচালিত “In The Fade” সিনেমার গল্পের উপজীব্য বিষয় এইরকম। বস্তুত, জার্মান দেশে বসবাস করা অভিবাসী নাগরিকদের সাথে নয়া-নাৎসিদের কোন্দলকে এক জার্মান মহিলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে; যার পরিণতি হয় একান্ত ব্যক্তিগতভাবে। কুরদিশ-মুসলিমসহ জার্মান দেশে বাসকারী সমগ্র অভিবাসীদের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি সুইসাইড বোম্বিং নিয়ে প্রচলিত গ্র্যান্ড ন্যারেটিভকে ভেঙে ফেলেছেন পরিচালক ফাতেহ আকিন।

“ন্যাশনাল সোশালিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড” নামক দলের বোমাবাজির কারণে জার্মানে ইংরেজি ২০০০ হতে ২০০৭ সালের মধ্যে অন্তত তিনজন অভিবাসী ও একজন পুলিশ অফিসার মারা যায়। গল্পের এই প্রধান সূত্র পরিচালক সিনেমার শেষে টেক্সট আর সঙ্গীতের সমন্বয়ে জানান দেন। আর এই “ন্যাশনাল সোশালিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড”-ই হল নয়া-নাৎসি।
আর নয়া-নাৎসিদের এই উৎপাত জার্মানিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের চিন্তার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত আগস্ট মাসে নয় বছরের এক সিরিয়ান শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। কিন্তু কিছু দিনপর বুঝা যায় আসল চিত্র। ঘটনা স্থানের দেয়ালে নয়া-নাৎসিরা লিখে দিয়ে যায় ‘ফলাফলঃ ১-০’। আর এই রকম হরেক উৎপাতের ঘটনা ঘটেই চলেছে। সমাজ সচেতনতা ছাড়াও এইসব ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ পরিচালক রয়েছে। আকিনের বাব-মাও অভিবাসী হয়ে তুরস্ক থেকে জার্মানিতে পাড়ি জমান। তাই জার্মানিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের তথা টার্কিশদের জীবনযাপন ফাতেহ আকিনকে এতো ভাবায় এবং বার বার উঠে আসে তার সিনেমায়। “Edge of the Heaven” নামক তাঁর বিখ্যাত সিনেমা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রতিশোধের নেশা দিয়ে তাড়িত “In The Fade” সিনেমা শেষ হয় ধ্বংসাত্মক উপায়ে। নিজের শরীরে বোমা লাগিয়ে স্বামী আর সন্তানের হত্যাকারীদের সাথে মারা যায় গল্পের নায়িকা। লক্ষ্য করার বিষয় হল, নায়িকার এই পরিণতির মধ্যে দিয়ে পরিচালক সুইসাইড বোম্বিং নিয়ে প্রচলিত গ্র্যান্ড ন্যারেটিভকে ভেঙে দেন। সিনেমার শুরুতে যার ইশারা বর্তমান আছে। বোম্বিং-এর পর যখন মৃতদের তল্লাশি শুরু হয়, তখন নায়িকার কাছে তাঁর স্বামীর ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়। ‘তার ধর্মীয় আচরণ কি ছিল, রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন কিনা কিংবা কুর্দিশ?’। এই সকল প্রশ্ন মুসলিম সম্পর্কিত, যা সুইসাইড বোম্বিং নিয়ে প্রচলিত ধারণা পরিপন্থী। কিন্তু ন্যায়বিচার পেতে ব্যর্থ জার্মান,নন-মুসলিম নায়িকা যখন ধ্বংসাত্মক দিয়ে নয়া-নাৎসিদের বিরুদ্ধে তাঁর হাতিয়ার হিসেবে সুইসাইড বোম্বিংকে বেছে নেয়, তখন সাথে নিজেও গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

                    

১৯৯২ সালের দিকে মাত্র ২০ বছর বয়েসই এই গল্প বানানোর ইচ্ছা জন্মায় পরিচালকের; যা শেষ হয় “In The Fade” -এর মাধ্যমে। কিন্তু এই গল্পের জরুরত এখনো আছে। কারণ, তাঁর মতে ‘বাস্তবতা একটু বদলায়নি, ঠিক আগের মতই আছে’। নিজের সিনেমাকে প্রতিশোধমূলক আখ্যা দিয়ে বাইবেলের সাহায্য নিয়ে আকিন বলেন ‘প্রতিশোধ মানুষের চিরায়ত চারিত্রিক গুণাবলি; যেমন চোখের বদলে চোখ’। গল্পের প্রধান চরিত্রের এই আইনবিরোধী, ধ্বংসাত্মক- প্রতিশোধমূলক মনোভাবের ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিচালক তাঁর দর্শকদের “বুদ্ধিমান” আখ্যা দিয়ে বলেন – ‘তিনি নিজেও চান না তাঁর গল্পের চরিত্রকে কেউ মডেল হিসেবে গ্রহণ করুক’। বিখ্যাত ফরাসি পরিচালক রবার্ট ব্রেসোর একক দৃষ্টিভঙ্গি্মূলক গল্প বলার ধরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফাতেহ আকিনও এই সিনেমায় শুধু কেন্দ্রীয় চরিত্রকে অনুসরণ করে, তার একক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্প বলেছেন।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker