বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

বিদায় সুপার হিরো!

হলিউডর সিনেমার প্রতি ভালোবাসা আছে এমন প্রত্যক মানুষের জন্য এই ১২ নভেম্বর অত্যন্ত শোকের। কারন স্পাইডারম্যান, এক্স ম্যান, হাল্ক, আয়রনম্যান, ডক্টর স্ট্রেঞ্জের মতো চরিত্রগুলো আর সাজাবেন না স্ট্যান লি । নতুন আর কোনো চরিত্র হয়ত আর কখনও দেখা হয়ে উঠবে না আমাদের। বিশ্ব- কাঁপানো এই চরিত্রগুলোর যিনি স্রষ্টা সেই মার্কিন কমিক্স বই লেখক ও মার্ভেল কমিক্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট স্ট্যান লি আর নেই। সোমবার (১২ নভেম্বর) সায়দার-সিনাই মেডিক্যাল সেন্টারে ৯৫ বছর বয়সী স্ট্যান লি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্ট্যান লি’র মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে লি’র মেয়ে জেসি বলেন, ‘বাবা তার সব ভক্তদের ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। আর তিনি ছিলেন সবচেয়ে শালীন একজন মানুষ।

যেভাবে আজকের স্ট্যান লি

স্ট্যান লি মার্টিন লিয়েবার । ১৯২২ সালে নিউ ইয়র্ক শহরের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় তাঁর । বাবা জ্যাক লিয়েবার ছিলেন সামান্য দর্জি । মন্দার বাজারে পরিবারের পাশে দাড়াতে লি স্কুলে পড়ার সাথে সাথে যোগ দিলেন টুকি টাকি নানা কাজে – যেগুলোর মধ্যে খবরের কাগজের হয়ে “Obituary Column” লেখাও বাদ থাকেনি ।

কাকার সুপারিশে ১৭ বছর বয়েসে লি যোগ দেয় ‘Times Comics’- এর অফিসে । কাজ? কমিকস্‌ লেখা বা আঁকা সংক্রান্ত কিছু ভাবলে খুব ভুল করবেন । প্রথম দুবছর স্ট্যান লির ডিউটির অন্তর্ভুক্ত ছিল কর্মচারীদের লাঞ্চ এনে দেওয়া, তাদের টেবিল পরিষ্কার রাখা, দোয়াত-কলম গুছিয়ে রাখা, ইত্যাদি । অবশেষে, ১৯৪১ সালে বেশ সাহস করেই স্ট্যান লি নামে লি ‘Times Comics‘ – এর হয়ে লিখে ফেললেন নিজের প্রথম কমিকস্‌-কীর্তি – ‘Captain America Foils the Traitor’s Revenge’ । কমিকস্‌টি প্রশংসনীয়ভাবে উতরেও যায় । প্রসঙ্গত বলা যায়, Captain America-র সুবিখ্যাত ঢালের ব্যুমেরাং সুলভ ব্যবহারটি সর্বপ্রথম এই কমিক্সেই পাওয়া যায় ।

প্রত্যাশিতভাবেই কোম্পানির প্রকাশক মার্টিন গুডম্যানের সুনজরে এসে এরপর লি উন্নীত হন কোম্পানির অন্তর্বতী সম্পাদকের পদে । ১৯৭২ সাল পর্যন্ত স্ট্যান লি ‘Times Comics’, যা বর্তমানে ‘Marvel Comics’ নামে শুধু কমিকস্‌ই নয়, সারা দুনিয়ার বিনোদন জগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তার প্রকাশকের পদ অলংকৃত করে রেখেছিলেন এবং তারপরে অবতীর্ন হয়েছেন স্বয়ং প্রকাশকের ভূমিকায় ।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে স্ট্যান লি আমেরিকার সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন । আট বছর সৈন্যবাহিনীতে থেকে ১৯৫০ সালে লি আবার ফিরে যান পুরোনো কোম্পানিতে, যা ইতিমধ্যে নাম পাল্টে ‘Atlas Comics’ হিসাবে পরিচিত ।

পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ‘Atlas Comics’ এর চিরপ্রতিদ্বন্ধী DC Comics এর ‘Justice League of America’ নামক কমিক-স্ট্রিপটির প্রভূত সাফল্য লক্ষ্য করে মার্টিন গুডম্যান, স্ট্যান লি কে বলেন কমিক্সের বাজারে নতুন কিছু জবরদস্ত চরিত্রের আমদানি করতে । এই সময়ই বলা যেতে পারে স্ট্যান লি-র হাত ধরে সুপারহিরো কমিক্সের ঘরানায় এক বিপ্লব আসে। জ্যাক কার্বি, জো সাইমন ও অন্যান্য লেখক চিত্রশিল্পীদের কালি-কলমের রেখায় আবির্ভাব হতে থাকে Fantastic Four, Hulk, Thor, Iron-Man, X-Men, Daredevil – এবং অবশ্যই Spider-man এর।

এখানেই শেষ নয়, স্ট্যান লির নির্দেশনায় প্রতিটি চরিত্র হয়ে ওঠে বাস্তবতায় পরিপূর্ণ । তারাও কলেজে সিলেবাসের চাপ, প্রেমিকার সাথে ঝগড়া, মাসের শেষে পকেটে টান, বেকারত্ব, এমনকি সর্দিকাশিরও সম্মুখীন হয় প্রায়ই । স্বভাবতই আমজনতা এদের লুফে নেয় ।

তাছারা বইয়ের কাটতি বাড়াতে, লি আরেক স্ট্র্যাটেজি নেন, যাকে বলা যায় flexibility of characters, অর্থাৎ কোন চরিত্রকে নির্দিষ্টভাবে নায়ক বা খলনায়ক- এর তকমা এঁটে দেওয়া যাবে না। যাকে দেখলে হয়তো মনে হবে যে এর থেকে জঘন্য দুশমান আর হতে পারে না, আরেকটা সিরিজের পাতা উল্টে দেখলেন সেই সেখানে পরিত্রাতার জুতোয় পা গলিয়েছেন। এছারা আরেকটা trend দেখা গেল যে চরিত্ররা শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব সিরিজেই আবদ্ধ থাকছে না – Spiderman এর গল্পে অনায়াসে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলো ক্রোড়পতি Tony Stark ওরফে Iron-man কে, আবার হয়ত X-men এর ম্যানসনে শোনা গেলো Hulk এর হুঙ্কার । এরকম আগ্রহী পাঠককে পুরো গল্পের খেই ধরতে হলে একসাথে সমস্ত সিরিজের বই জোগাড় করা ছাড়া অন্য উপায় রইল না। স্বাভাবিকভাবেই Atlas Comics এবং পরবর্তীকালের Marvel Comics অর্থনৈতিক দিক থেকে সাফল্যের শিখরে উঠে যায়।

ইতিমধ্যেই একবার তার বাইপাস সার্জারি হয়েছিলো। তবুও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন Marvel Comics ও Marvel Studios এর সাথে। বর্তমানে হলিউডের অন্যতম সফল media franchise Marvel Cinematic Universe এর উত্থানের পিছনে লি এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্ট্যান লি প্রায়ই বলতেন,
ভালো আর খারাপের যুদ্ধ—এই গল্প মানুষের সব সময় প্রিয়। গল্পের শেষে তারা সব সময় ‘ভালো’র জয় দেখতে চায়। আমি মনে করি, পৃথিবীর এখন একজন নায়ক প্রয়োজন। ‘সুপারহিরো’ হতে হবে, সেটা বলছি না। ‘হিরো’ হলেই চলবে। যদি ইতিহাস দেখেন, দেখবেন মন্দ শক্তিটার সব সময় ‘সুপার পাওয়ার’ ছিল। সাধারণ মানুষই ‘সুপার পাওয়ার’কে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে।
তিনি কি জানতেন? তিনিই ছিলেন সারা পৃথিবীর সেই নায়ক?

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker